রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পড়ার চাপে ও পারিবারিক শাসনে ঘরছাড়া হয় শিশুরা

  • শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণ পাল্টাতে হবে
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ১১:৫৩ এএম

সাম্প্রতিক শিশু নিখোঁজের ঘটনা বেশ আলোচিত হচ্ছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। জানা গেছে, পরিবারের অতিরিক্ত চাপে বা লেখাপড়ার জন্য অতিরিক্ত শাসনের কারণেই ঘরছাড়া হয় শিশুরা। শিশুদের এমন আচরণে আতঙ্কিত হয় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো।

ইদানীং ফেসবুক বা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে শিশুনিখোঁজের সংবাদবিষয়ক পোস্ট দেওয়া হয়। এক-দুদিন পরে নিখোঁজ শিশু ফিরে এলেও মুছে ফেলা হয় না নিখোঁজ সংবাদের পোস্ট। ফলে নিখোঁজ-সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পোস্টে অভিভাবকরা আতঙ্কিত হন।

ফেসবুকে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ১০-১২ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নিখোঁজ হওয়া শিশুরা ফিরে এসেছে। কেউ রাগ করে, কেউ পরিবারের অতিরিক্ত শাসনে ঘর থেকে বেরিয়ে বন্ধুর বাসায় ছিল। আবার কেউ টাকা নিয়ে তিন-চার দিনের জন্য কক্সবাজারে ঘুরতে গেছে। তারা আবার বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নিখোঁজের পোস্টটি ডিলিট করা হয় না বলে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ফেসবুকে ‘নিখোঁজ সংবাদ’ পরিবেশনের অনেকগুলো গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপ প্রতিদিন ৮-১০টি নিখোঁজ ব্যক্তির সংবাদ জানিয়ে পোস্ট দেয়। তাদের অনেকে ফিরে এলেও পোস্ট কিন্তু থেকেই যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির ৫০টি থানায় ছয় মাসে নিখোঁজের ঘটনার ১ হাজার ৩২০টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জানুয়ারিতে ২১০, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭, মার্চে ২১৩, এপ্রিলে ২২১, মেতে ১৯৯ ও জুন মাসে ২৬০টি জিডি করা হয়। আর জুলাই মাসের এক সপ্তাহে ৭৬টি জিডি করা হয়েছে।

নিখোঁজদের অনেকে ফিরলেও এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ১০-১৫টি নিখোঁজের জিডি হয়। এসবের মধ্যে মালামাল নিখোঁজের ঘটনা বেশি থাকে। মানুষ নিখোঁজের ঘটনাও থাকে। কেউ হারিয়ে গেলে, শিশুদের খুঁজে না পাওয়া গেলে জিডি হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের কেউ হয়তো রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছে, আর ফেরেনি।

নিখোঁজের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন শিশুনিখোঁজের মিথ্যা তথ্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব গুজব বলে পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি মানুষকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।’ তিনি বলেন, নিখোঁজের জিডি নিয়মিতই হয়। নিখোঁজদের অনেকে ফিরেও আসে।

কয়েকটি নিখোঁজের ঘটনা

গত ২৯ জুন নিখোঁজ হয় বরিশালের বাকেরগঞ্জের মাদ্রাসাছাত্র ইউসুফ হাওলাদার। এক সপ্তাহ পর অভিভাবকেরা তার সন্ধান পান। ১৩ বছরের শিশুটির বাবা আবু জাফর হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লেখাপড়ার চাপে ও বন্ধুর বাসায় গিয়া পলাইছিল।’ ইউসুফ ঘরে ফিরলেও তার নিখোঁজের সংবাদটি এখনো ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে ঘুরছে। ১ জুলাই নোয়াখালীর সোনাবাগ এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ১১ বছরের মো. রায়হান। তার ভাই রকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পড়তে ভালো লাগে না বলে স্কুল থেকে বের হয়ে সে আর বাসায় ফেরেনি। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় জিডি করি ও ফেসবুকে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দিই।’ দুদিন পরে রায়হান ঘরে ফিরলেও নিখোঁজের সংবাদটি এখনো ফেসবুকে  রয়ে গেছে। ৩ জুলাই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিয়াম ও রিয়ান নিখোঁজের পরে জানা যায় তারা কক্সবাজার ঘুরতে গেছে। তাদের নিখোঁজের সংবাদটিও ফেসবুকে রয়েছে। এমন ১০-১২ জনের নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তিদাতা জানিয়েছেন, তারা ফিরে এলেও পোস্ট এখনো ডিলিট করা হয়নি।

এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজকে অস্থিশীল রাখতেই এমন নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে শিশুরা যে নিখোঁজ হচ্ছে না তা-ও বলা যাবে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আর সামাজিক মাধ্যমে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট জনকে খুঁজে পাওয়া গেলে সে বিষয়ক মেসেজও দেওয়া উচিত। মানুষকে জানানো উচিত।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত