উত্তপ্ত শাহবাগ সংঘর্ষ শেকৃবি-কুমিল্লায়

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৪, ০৫:২২ এএম

সরকারি চাকরির সব গ্রেডে কোটা সংস্কারের দাবিতে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে দেশব্যাপী চতুর্থ দিনের মতো ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। এর ফলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শাহবাগ এলাকা। এদিকে ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছেড়ে ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। এ ছাড়া মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, ডিএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ইউজিসিও একই আহ্বান জানিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীরা সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে ৫ শতাংশ কোটা রেখে আইন করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

গতকাল শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে নির্বাহী বিভাগ থেকে পরিপত্র জারি করতে হবে। এ দাবিতে আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায় ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করবেন তারা। এদিকে যৌক্তিক উপায়ে কোটা সমস্যার সমাধানের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ করেছে ছাত্রলীগ।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে মিছিল নিয়ে শাহবাগে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ ব্যানারে মিছিল বের করেন। শাহবাগ মোড়ে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। তবে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগে অবস্থান নেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘পুলিশ দিয়ে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’, ‘ভয় দেখিয়ে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’, ‘হামলা করে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’ ইত্যাদি স্লোগানও দেন। গরমের কারণে তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের পানি এগিয়ে দিচ্ছেন অনেক আন্দোলনকারী। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে যাত্রীদের হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। গত কয়েক দিন আন্দোলনে শাহবাগের চিত্র এক ধরনের হলেও গতকাল থমথমে অবস্থা বিরাজ করেছে।

রাত ৯টার পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শাহবাগ ছাড়েন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে ৫ শতাংশ কোটা রেখে আইন করতে হবে। অন্যথায় আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমাদের এক দফা এবং পুলিশের হামলার বিচার দাবিতে আমরা শুক্রবার সারা দেশে বিকেল ৪টায় বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশ করব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লাগাতার আন্দোলন চলবে।’

দুপুর থেকেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনের কাছে অবস্থান নেন। ঢাবি ছাত্রলীগের পাশাপাশি ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা দলে দলে এসে মধুর ক্যান্টিনের সামনে জড়ো হন। পরে তারা মধুর ক্যান্টিন থেকে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমবেশ করেন। মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ছাত্রলীগ। তা না করে আন্দোলনের নামে শিক্ষাব্যবস্থাকে জিম্মি করলে রুখে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। একই সঙ্গে সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোটাব্যবস্থার একটি যৌক্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কোটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কোটা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে কোনো মহল যদি দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে সরকারকে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

শেকৃবির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে আহত ১০ : কোটা সংস্কারের দাবিতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মিছিলে গতকাল বাধা দিয়েছে পুলিশ। এ সময় এক পুলিশ ও ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আগারগাঁও মোড়ে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটেই পুলিশ বাধা দেয়। শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা অতিক্রম করে বের হতে গেলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রথমে ধস্তাধস্তি হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।

পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গেটের পাশে এলে দ্বিতীয় দফায় পুলিশের বাধার মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এরপর সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে স্লোগান দিতে দেখা যায় তাদের। ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলনে আরও শিক্ষার্থী যুক্ত হলে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে আন্দোলনকারীরা আগারগাঁও সেকেন্ড গেট সড়ক অবরোধ করে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অবস্থান করেন।

আহত একজন পুলিশ সদস্য স্পটেই হাতে ব্যান্ডেজ করে নিতে দেখা যায় আর আন্দোলনরত বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাস্পাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

কুবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলা, আহত ২০ : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কারপন্থি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে পুলিশ। এতে একাধিক গণমাধ্যমকর্মীসহ গুরুতর আহত অন্তত ২০ শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন আনসার ক্যাম্পের সামনে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করার উদ্দেশ্যে বের হলে পুলিশের বাধায় এ ঘটনা ঘটে।

সরেজমিন দেখা যায়, পুলিশ ও ডিবির প্রায় শতাধিক সদস্য শিক্ষার্থীদের বাধা দিতে গেলে প্রথমে ধস্তাধস্তি হয়। এরপর আবাসিক হল ও মেসের প্রায় ৭০০-৮০০ শিক্ষার্থী এসে যুক্ত হয়ে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হতে চাইলে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করে। এরপর শটগান দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলির পাশাপাশি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে, যা কিছু সময় পর তুমুল সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ও পাথর নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। পরে পুলিশের আঘাতে আমাদের সময়ের সংবাদদাতা অনন মজুমদার, দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদদাতা মানছুর আলম অন্তরসহ অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লা মেডিকেলে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের অতিরিক্ত এএসপি এমরানুল হক মারুফ বলেন, ‘প্রতিদিন এভাবে রাস্তা ব্লক করে রাখা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তাই আমরা আজ (গতকাল) শিক্ষার্থীদের বাধা দিতে আমরা এখানে এসেছি।’ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অনাকাক্সিক্ষত। এ বিষয়ে আমরা পরে ব্যবস্থা নেব।’

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ড. রনি বলেন, ‘আমাদের এখানে নয়জন আহত অবস্থায় এসেছে। এর মধ্যে সাতজনকে অ্যাডমিশন এবং দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। সাতজনের অবস্থাও অতটা খারাপ নয়, তারাও মোটামুটি ভালো আছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা আমাদের পর্যবেক্ষণে থাকবে।’

প্রক্টর ভারপ্রাপ্ত কাজী ওমর সিদ্দিকী বলেন, ‘পুলিশের যারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলব। এখানে আমার কোনো ইন্ধন নেই।’

পুলিশের বাধা পেরিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ : পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে নবম দিনের মতো ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বিকাল পৌনে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সড়ক ঘুরে প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ফটক পার হয়ে মহাসড়কে অবস্থান নিতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে ১০ মিনিট বাগ্বিতন্ডার পর শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা কর মহাড়কে অবস্থান নেন। এতে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি পরিষেবার গাড়িগুলো ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধের আগে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মহাসড়ক অবরোধ করলে অসুস্থ মানুষ, রোগী ছাড়াও উত্তরবঙ্গগামী মানুষের ব্যাপক ভোগান্তি হয়। এসব ভোগন্তি এড়াতে মহাসড়ক অবরোধ না করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে চাই না আমরা।’

পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই ষোলশহরে অবস্থান : চট্টগ্রাম নগরে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বটতলী রেলস্টেশনের জড়ো হতে থাকেন। এরপর মিছিল নিয়ে তারা আসেন নগরের টাইগারপাস মোড়ে। এ সময় তাদের দুদিক থেকে ঘিরে রাখে পুলিশ। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে লালখান বাজার হয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় অবস্থান নেন। টাইগারপাস এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থীর হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।

আন্দোলনকারীকে পেটালেন ছাত্রলীগ নেতা : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও তার কয়েকজন অনুসারীর বিরুদ্ধে। গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের ২৩০ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের পর তাকে হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে নিরাপত্তা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।

তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, রাবি ছাত্রলীগের সভাপতির ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে হেয়প্রতিপন্নমূলক মন্তব্য করায় সভাপতির অনুসারীরা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে তুলে নিয়ে আসে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. মোস্তফা মিয়া। তিনি সমাজকর্ম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতারা হলেন রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু, সৈয়দ আমীর আলী হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফরহাদ হোসেন খান ও নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম রেজা।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘এ ঘটনার পর আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। হল থেকে নামিয়ে দিলে আমি আবাসন সংকটে পড়ে যাই। ফলে বাধ্য হয়ে আমি বাড়ি চলে এসেছি। বর্তমানে আমি বাড়িতে অবস্থান করছি।’

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ফরহাদ হোসেন খান বলেন, ‘মোস্তফা মিয়া নামের কোনো শিক্ষার্থীকে আমি চিনি না, এমনকি অতীতেও তার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সাক্ষাৎ হয়নি। আর এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই।’ আরেক অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা শামীম রেজাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত নই। কিছুক্ষণ আগেই শুনলাম। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তারপর বলতে পারব।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীর হয়ে তিনজন আমাকে অভিযোগপত্র দিয়েছে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ভোলায় কলেজের শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে : ভোলা সরকারি কলেজে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রস্তুতিকালে শিক্ষার্থীদের মারধর ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল দুপুর ১২টায় কলেজের ১ নম্বর গেট থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ও ভেতরে দুই দফা মারধর করা হয়। এতে আহত হয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হাবিবুর রহমান, ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মো. সোহানকে ভোলা জেলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি দুজনই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী। তবে মারধরের কথা অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ।

জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক হাসিব মাহমুদ হিমেল জানান, কলেজে ছাত্রশিবিরের কমিটি গঠন খবর পেয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ক্যাম্পসে যান। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের যেন কোনো দুর্ভোগ না হয়, সে কারণে ছাত্রলীগ কলেজে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

শিক্ষার্থীরা মনে হয় লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে : আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের সীমা লঙ্ঘন (লিমিট ক্রস) করছে বলে মনে করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘মাদকের অপব্যবহার ও পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আদালতের যে নির্দেশনাটা এসেছিল, শিক্ষার্থীরা মনে করেছে তাদের যে চিন্তাভাবনা, সেটা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেজন্য তারা রাস্তায় চলে এসেছিল। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশকে আমরা বলেছি, তাদের ডিমান্ড যেটা আছে, সেটা আমরা শুনব। কিন্তু শোনারও একটা লিমিট বোধহয় থাকে। তারা বোধহয় এগুলো ক্রস করে যাচ্ছে।’

মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ‘যে নির্দেশনা হাইকোর্ট দিয়েছেন, সেটি স্থগিত। যে মামলাটি চলছে, সেটির রায় না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। তাই হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটি অচল, সেটি এখন নেই। আমার মনে হয়, ছাত্রদের এ ক্ষেত্রে বোঝা উচিত, জানা উচিত। রায় যখন নেই তাহলে আন্দোলন করছে কেন? তাদেরও আত্মীয়স্বজনকে বিভিন্ন কাজে ছুটতে হয়, হাসপাতালে যেতে হয়, চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। রাস্তা বন্ধ করে দিলে কীভাবে চলবে?’

শিক্ষার্থীরা অনুরোধ না রাখলে আপনারা অ্যাকশনে যাবেন কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম কথা হলো তারা শিক্ষিত, মেধাবী। তারা কেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে? তারা এসব কিছু পর্যবেক্ষণ করে ফিরে যাবে। পুলিশের অ্যাকশনটা কখন আসে? যখন অপারগ হয়ে যায়।’

রাস্তায় না থেকে আদালতে গিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে : জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সরকারও চায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক, তবে আদালতকে আমরা সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। আদালতের বিষয়টি আদালতের গিয়েই সমাধান করতে হয়। শিক্ষার্থীদের রাস্তায় না থেকে এ বিষয়টি আদালতে গিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।’ তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বলব বিষয়টি নিয়ে রাস্তায় না থেকে আদালতে গিয়ে নিষ্পত্তি করা। ২০১৮ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেই আলোকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা অন্যরা মনে করেছেন তারা বঞ্চিত হয়েছেন। এরপর তারা ২০২১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। সেই চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গত ৫ জুন একটা রায় দিয়েছেন আদালত। তারই পরিপ্রেক্ষিতে গতকালও (বুধবার) শুনানির পর আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আমি বলতে চাই, যেটি যেখানে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন, সেটি সেখানেই নিষ্পত্তি করতে হবে। আমরাও চাই বিষয়টি সুন্দরভাবে নিষ্পত্তি হোক।’

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না করার অনুরোধ পুলিশের : শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না করার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের পক্ষে রয়েছে। কাজেই আন্দোলন যদি যৌক্তিকতা না থাকে তবে আন্দোলনে আসা উচিত নয়। আন্দোলন না করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ রইল।’

গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, ‘যারা আন্দোলন করছেন তাদের প্রতি পুলিশের অবশ্যই ভালোবাসা, সহমর্মিতা আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দেশের প্রচলিত আইন ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে আমরা বাধ্য। সেই জায়গা থেকে যেহেতু শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত, সেহেতু ডিএমপির পক্ষ থেকে আমি বিনীত অনুরোধ করছি, তারা যেন মানুষের কোনো দুর্ভোগ দিয়ে কর্মসূচি না দেয়। ১০ দিন ধরে শাহবাগ, সায়েন্সল্যাবসহ ঢাকার শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের গাড়ি, চলাফেরা ব্যাহত হয়েছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছে মানুষ যেন নিরাপদে চলাচল করতে পারে।’

কোটা নিয়ে মানবাধিকার কমিশন : সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। একই সঙ্গে কোটা নিয়ে যৌক্তিক সমন্বয় ও সামঞ্জস্য বিধানের দাবি জানিয়েছে কমিশন। গতকাল এ বিষয়ে বিবৃতি দেন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ। এতে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের চলমান কোটাবিষয়ক আন্দোলন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সহিংসতামুক্ত ও শান্তিপূর্ণ হওয়ায় কমিশন সাধুবাদ জানায় এবং একই সঙ্গে কোটাবিষয়ক সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে শিক্ষার্থীদের আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছে কমিশন।’

শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে ইউজিসির চিঠি : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়েছে, তা প্রতিপালনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। গতকাল দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে এ চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে নিজ নিজ কাজে অর্থাৎ পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বলা হলো।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো, শেকৃবি সংবাদদাতা, জাবি প্রতিনিধি, রাবি প্রতিনিধি, কুবি প্রতিনিধি ও ভোলা প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত