এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা চলছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং দেশে। প্রত্যয় পেনশন স্কিম বাতিলের দাবিতে ১২ দিন ধরে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে আছেন, আর কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতির নানা তথ্য উদ্ঘাটনে চমকে উঠছে মানুষ, বন্যার তাণ্ডবে দিশেহারা নদী অববাহিকার জনপদের অধিবাসীরা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হাঁসফাঁস অবস্থা ক্রেতাদের, রপ্তানি আয়ের বিশাল গরমিল, দেশের জনগণ কোন সমস্যাকে গুরুত্বহীন ভাববেন? পেনশন মানুষের কর্মজীবনের অর্জন আর অবসর জীবনের নিরাপত্তা, এভাবেই ভেবে আসছেন এতকাল। সে কারণেই দাবি উঠেছে, শুধু সরকারি চাকরিজীবী নয়, সব পেশার মানুষকে পেনশনের আওতায় আনতে হবে। সর্বজনীন পেনশন সবার বৃদ্ধ বয়সের নিশ্চয়তা দেবে এই তো হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে কেন ‘প্রত্যয় পেনশন স্কিম’ ঘোষণার পর প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা? যদিও এ স্কিমে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মরতরা অন্তর্ভুক্ত হবেন, কিন্তু আন্দোলনে নেমে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা। শিক্ষকরা ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন, তাদের মতামত না নিয়ে আমলাতান্ত্রিকভাবে প্রণীত এ স্কিম বৈষম্যমূলক শুধু নয়, অপমানজনকও বটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তো আমলাদের মতো গাড়ি, বাড়ি, পাচক, প্রহরী পান না, চাকরি অবসানে পেনশন তাদের প্রধান আর্থিক নিরাপত্তা। সেই পেনশন নিয়ে তারা আতঙ্কিত হলেন কেন, বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গেই ভাবতে হবে।
শিক্ষকরা ধর্মঘট করছেন কিন্তু তার আগে হিসাব-নিকাশ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রত্যয় স্কিমে তারা বঞ্চিত হবেন। আর অর্থমন্ত্রী তাদের আবেগ ও উদ্বেগকে উপেক্ষা করে বলেছেন, শিক্ষকদের এ ধর্মঘট অযৌক্তিক। তাহলে কি প্রশ্ন উঠে না, সব কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক হয়ে গেলেন কেন এবং কীভাবে? তারা কি এ ধরনের স্কিম চেয়েছিলেন? তাহলে, কেন সরকার তাদের মাসে মাসে লক্ষাধিক টাকা পেনশন নেওয়ার জন্য বাধ্য করতে চাইছেন? নানা ধরনের কথা এবং ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বুঝতে পেরেছেন যে, রাষ্ট্রীয় সুবিধা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক দায়িত্ব কমানোর পথে হাঁটছে সরকার। বলা হয়েছে, ‘আনফান্ডেড ডিফাইন্ড বেনিফিট পদ্ধতির পেনশনব্যবস্থায় সরকারের আর্থিক দায় ক্রমাগত বাড়ছে।’ সরকার আর কত দেবে? সাধারণ মানুষও ভাবতে পারেন, তাই তো? শিক্ষকদের এত চাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারের আর্থিক দায় অন্য ক্ষেত্রে তো বিপুল পরিমাণ এবং তা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন ঋণের সুদ, আমলাদের জন্য সর্বাধিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের সীমাহীন অপচয়ের কারণে। এসব মেটাতে দেশের জনগণ নিত্যনতুন ট্যাক্স বা ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছে! এমন কোনো আর্থিক বিষয় কি আছে, যেখানে ট্যাক্স বা ভ্যাট নেই? মানুষ কেন ট্যাক্স বা ভ্যাট দিচ্ছে? মানুষ ট্যাক্স বা ভ্যাট দেয় শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দেশের উন্নয়নের জন্য। প্রতি বছর বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। কিন্তু মানুষের কষ্টের টাকার এ বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হচ্ছে তিনটি খাতে, যা হলো ঋণের সুদ, বিলাসিতা ও অপচয়। দেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি এবং দেশি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদ প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করার জন্য জনগণ আর কত ট্যাক্স বা ভ্যাট দেবে? ডলার সংকট মেটানোর জন্য বৈদেশিক ঋণ নেওয়া ছাড়া সরকারের আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশের শ্রমিকরা বছরে ২২ বিলিয়ন ডলার পাঠায়, সে দেশে ডলার সংকট হয় কী করে? পাট, চামড়া, চিংড়ি, কাঁকড়া রপ্তানি বা গার্মেন্ট থেকে অর্জিত ডলার যাচ্ছে কোথায়? সরকার সবই জানে, কিন্তু নির্বিকার। অন্যদিকে ডলার সংকট মেটাতে একের পর এক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে দেশ।
গরিব দেশে আমলাদের বিলাসবহুল জীবন চোখের সামনে সবাই দেখছে। গাড়ি, গাড়ি পরিচালনা খরচ, পিওন, নিরাপত্তা প্রহরী, পাচক, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, সিটিং অ্যালাউন্স, ট্রাভেল অ্যালাউন্স আরও কত কী তার ইয়ত্তা নেই। বাজেটে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য আছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মচারীদের বেতনের জন্য আছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। আর তাদের ভাতার জন্য বরাদ্দ আছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই অঙ্কের টাকার সিংহভাগই তো কর্মকর্তাদের ভাতার জন্য ব্যয় হবে। মাঠ পর্যায়ে ইউএনওদের জন্যও কোটি টাকার গাড়ি প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর যেন ঝাঁ চকচকে গাড়ির শোরুম। এসব গাড়ি দেখলে মনেই হয় না, আমরা একটি ঋণগ্রস্ত গরিব দেশের নাগরিক। আমলাদের ট্রাভেল অ্যালাউন্সের ক্ষেত্রেও অনেক সুবিধা আছে, যা সরকার বহন করে থাকে। এসব টাকা তো দেশের মানুষই জোগান দিচ্ছে। কিন্তু সেই টাকার সঠিক ব্যবহার কি হয়? সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির যে ফিরিস্তি বেরিয়ে আসছে তা দেখে মনে হওয়া তো স্বাভাবিক, এসব বন্ধ করতে পারলে শিক্ষকদের জন্য শুধু নয়, সবার জন্যই পেনশন এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ মাধ্যমিকের যেসব শিক্ষক দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন তাদের জন্য বাড়ি ভাড়া, ঈদ বোনাস দেওয়া সম্ভব। শিক্ষকরা তো মানুষ গড়ার কারিগর, তাদের কি অধিকার নেই ভালোভাবে জীবনযাপন করার? সমাজের বাকি মানুষদের কথা না হয় বাদই দেওয়া যাক! অবসর জীবনটা যেন একটু স্বস্তিতে কাটাতে পারেন সে কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনে আছেন। কিন্তু তাদের হিসাব মিলছে না।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বর্তমানে প্রাপ্ত পেনশন-সুবিধা এবং প্রত্যয় স্কিমের পেনশন সুবিধা নিয়ে তুলনা করতে গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান যে পেনশন-সুবিধা, তাতে যদি কোনো অধ্যাপক ১৫ বছর ধরে পেনশন পান, তাহলে তিনি পাবেন ১ কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার ৩০০ টাকা। আর যদি প্রত্যয় স্কিমের পেনশন সুবিধা পান, তাহলে ১৫ বছরে মোট পাবেন ২ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে যে, ‘প্রত্যয়’ স্কিমে সুবিধা বেশি। কিন্তু শিক্ষকরা বলেছেন, এই হিসাব সমস্যাজনক। হিসাবটা দেওয়া হচ্ছে ২০২৪ সালে আর পেনশন পাবেন ২০৫৪ সালে। ফলে এই হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের একটা ফাঁকি আছে। এই ফাঁকিটার নাম ‘টাইম ভ্যালু অব মানি’ বা টাকার সময়মূল্য। টাকার সময়মূল্য অনুযায়ী ১০০ টাকা দিয়ে আজকে যে পরিমাণ পণ্য কেনা যায়, ৫ বছর বা ১০ বছর পরে সেই সমপরিমাণ পণ্য কিনতে পারা যায় না। সময়মূল্য দিয়ে বোঝা যায় যে, টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে নাকি কমছে? মূল্যস্ফীতি এবং অন্যান্য কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা প্রতি বছরই কমতে থাকে। তাহলে ফাঁকির জায়গা কোথায়? প্রত্যয় স্কিমের যে হিসাবটা দেওয়া হচ্ছে, তা হবে ৩০ বছর পরের প্রাপ্য। কারণ ধরে নেওয়া হয়েছে, একজন আজ থেকে ৩০ বছর পরে অবসরে যাবেন এবং প্রতি মাসে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬০ টাকা করে অবসর-পরবর্তী ১৫ বছরে সর্বমোট এই টাকা পাবেন। অন্যদিকে বর্তমান পেনশন ব্যবস্থার যে হিসাব দিয়ে তুলনা করা হচ্ছে, সেই হিসাবটা আজ থেকে ১৫ বছর পরের। অর্থাৎ কেউ যদি আজকে পেনশনে যান এবং পরবর্তী ১৫ বছর পেনশন পান তাহলে মোট ওই টাকাটা পাবেন। তাহলে দেখা গেল মাঝখানে ৩০ বছরের পার্থক্য আছে। এখন এই ৩০ বছরে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কত কমবে এবং শিক্ষকদের বেতন কত হবে, তা কি হিসাবে আনা হবে না? আজ থেকে ৩০ বছর আগে তারা যে বেতন পেতেন এখন কি সেই বেতন পান এবং ৩০ বছর পরে কি এখনকার মতো বেতন পাবেন?
বর্তমান পেনশন পদ্ধতিতে একজন অধ্যাপক (১ম গ্রেড) যদি অবসরে যান, তিনি যে পেনশন-সুবিধাটা পাবেন, তা হলো তার মূল বেতনের (৭৮০০০ টাকা) ৯০ শতাংশের ২৩০ গুণ। অর্থাৎ ৭৮০০০ঢ৯০ঢ২৩০=১,৬১, ৪৬০০০ টাকা। এই টাকার অর্ধেক ৮০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা তিনি পাবেন এককালীন। বাকি অর্ধেক মাসিক ৩৫ হাজার ১০০ টাকা করে আজীবন এবং পেনশনারের মৃত্যুর পর তার নমিনি আজীবন। এই টাকার পাশাপাশি মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা করে চিকিৎসা ভাতা, বছরে দুটি বোনাস এবং একটি বৈশাখী ভাতা পাবেন। এই ৩৫ হাজার ১০০ টাকা আবার প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাড়তে থাকবে। যদি এটি ইনক্রিমেন্টসহ হিসাব করা হয়, তাহলে বর্তমান ব্যবস্থায় একজন পেনশনারের ১৫ বছর পর সর্বমোট প্রাপ্তি হবে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৮৮ টাকা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অধ্যাপকদের নিজের কোনো চাঁদা দিতে হয় না। প্রত্যয় স্কিমে তো তাদের টাকা দিতে হবে। এ তো গেল আর্থিক দিক। শিক্ষকদের প্রধান দাবি এই যে, তাদের কথাটা কি সরকার শুনবে না? তারা উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন ভারত, পাকিস্তানসহ প্রায় সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন ও আর্থিক সুবিধা কম। আমরা শিক্ষার মান নিয়ে আতঙ্কিত, কিন্তু শিক্ষকদের মানসম্পন্ন বেতনের ব্যাপারে উদাসীন। যে আমলাদের ওপর সরকার নির্ভরশীল সেই আমলাদের গড়ে তুলতেও তো মানসম্পন্ন শিক্ষা আর শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন দরকার। শিক্ষকরা তাই দাবি তুলেছেন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল, উচ্চতর গ্রেড প্রদান করতে হবে। শিক্ষকতার সঙ্গে অন্য পেশার পার্থক্য সুস্পষ্ট থাকলেও বেতন, মর্যাদা আর অধিকারের ক্ষেত্রে কি তার প্রমাণ থাকবে না? তিন মাস ধরে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করে তাদের যুক্তি তুলে ধরেছেন। সবশেষে প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষক সমাজ তাদের দাবির কথাটাই বলতে চাইছেন। কিন্তু পেশার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বাত্মক আন্দোলন ও উদ্বেগ সরকারের উপেক্ষার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে কেন?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
