রেলওয়ের ফাঁস প্রশ্নের সুবিধাভোগী দেড় শতাধিক

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৪, ০২:১৯ এএম

বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পদের নিয়োগ পরীক্ষায় দেড় শতাধিক চাকরিপ্রার্থীকে প্রশ্ন ও সমাধান সরবরাহ করেছিলেন গ্রেপ্তার চক্রের সদস্যরা। তারা প্রশ্ন ও সমাধান একসঙ্গে বিক্রি করেছেন। এমনকি গ্রেপ্তার পিএসসি কর্মচারী সাজেদুল ইসলাম, পানি ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও তার ছোট ভাই সাইম হোসেন এবং ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী লিটন সরকার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে প্রশ্ন ও সমাধান দিয়েছেন অনেককেই। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

প্রশ্ন ও সমাধান যারা পেয়েছেন, প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছেন সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আলী মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেলওয়ের উপসহকারী ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ১৭ জনকে বুথ থেকে হাতেনাতে ধরা হয়েছিল। তারপর তাদের বিরুদ্ধে পাবলিক সার্ভিস কমিশন আইন অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে পিএসসির ভেতরে, বাইরে কিংবা চক্রের অন্য কেউ এবং যারা প্রশ্ন ও সমাধান নিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত যেই থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

গত ৯ জুলাই রেলওয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পিএসসির সাবেক, বর্তমান ছয়জনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাদের মধ্যে গত ১০ জুলাই ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন আবেদ আলী, পিএসসির অফিস সহায়ক খলিলুর রহমান, ডেসপাস রাইডার সাজেদুল ইসলাম, পানি ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন, সাখাওয়াতের ভাই সাইম হোসেন এবং ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী লিটন সরকার।

ঢাকা ও সিলেটের কয়েকটি কোচিংয়ে দেওয়া হয় প্রশ্ন : ঢাকার মালিবাগ, মিরপুর ও সিলেটের তিনটি কোচিং সেন্টার এবং মালিবাগ ও খিলগাঁওয়ে আগে থেকেই থাকা রেলওয়ে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন ও সমাধান দেন চক্রের সদস্যরা। মূলত এসব কোচিং সেন্টারের দেড় শতাধিক পরীক্ষার্থীকে রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলীর প্রশ্ন ও সমাধান দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রশ্ন ফাঁসকারীরা ব্যক্তিগতভাবেও কোনো কোনো পরীক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্র দিয়েছেন। সেই সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে, পিএসসির ডেসপাস রাইডার সাজেদুল তার জবানবন্দিতে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে বলেছেন, পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফরের মাধ্যমে তিনি রেলওয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছেন। এরপর তিনি সেই প্রশ্ন তিন-চারজনের কাছে দেন। যাদের কাছ থেকে আগেই টাকা নেওয়া ছিল।

প্রশ্নে ফাঁসে টাকার লেনদেন পরিমাণ নিরূপণ করতে পারছে না সিআইডি : প্রশ্ন ফাঁসকারীদের মোবাইল ব্যাংকিং ও ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকিং চ্যানেলে যে লেনদেন হয়েছে, তাদের শনাক্ত করছে সিআইডি। তবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখনো টাকার অঙ্ক নিরূপণ করতে পারেনি সিআইডি। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা।

পিএসসি থেকে তিন স্তরে ফাঁস হয় প্রশ্ন : পিএসসি থেকে তিনটি স্তরে প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রথম স্তরে পিএসসির পরিচালক বা উপপরিচালক পদের কর্মকর্তা, নিচের স্তরে থাকে তার পরিচিত তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। এরপর এই কর্মচারীদের দালাল। তারা প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের সমাধানসহ পৌঁছে দেন। এর আগে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেন দালালরা। তবে চক্রটি নিজেদের গোপনীয়তা রাখতে চাকরিপ্রার্থীদের নিজেদের কোচিং সেন্টারের নিয়ে আসেন। এসব কোচিং সেন্টার থেকে বাইরে প্রশ্নপত্র দেওয়া নিষেধ থাকলেও কেউ কেউ নগদ টাকা পাওয়ার লোভে দিয়ে দেন।

প্রিয়নাথের হয়ে কাজ করতেন লিটন : ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী লিটন সরকার। তিনি কাজ করতেন এই চক্রের অন্যতম হোতা প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথের হয়ে। লিটন বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাকে সামনে রেখে চাকরিপ্রার্থী জোগাড় করে এনে দিত প্রিয়নাথের কাছে। এর আগে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে কত টাকা নেওয়া হবে, না হবে সেসব ঠিক করতেন। বিবাহিত বেকার লিটন ধানম-ির শুক্রাবাদের কাঁচাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। এই চক্রের সদস্যদের মধ্যে সবার প্রথম সিআইডির জালে ধরা পড়ে লিটন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধরা হয় প্রিয়নাথকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত