বিএনপির পররাষ্ট্র কমিটিতে ফুড ডেলিভারি ম্যান!

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪, ১২:২৭ পিএম

কানাডায় ফুড ডেলিভারির কাজ করেন এমন নেতাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, জার্মানিতে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং সেখানকার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন একজনকেও ওই কমিটিতে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে যারা বিএনপির হয়ে কাজ করেন, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করে নতুন নতুন কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রবাসী নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এজন্য তারা বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে দায়ী করছেন।

গত ২৪ জুন স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপারসন ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটিতে আরও ১৭ জনকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে গত ১৫ জুন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে হুমায়ুন কবিরকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়া হয়।

বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবাসী বিএনপি নেতাদের প্রধান কাজ যে যেই দেশে থাকেন, সে সেই দেশের সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা। বিএনপির হয়ে সে দেশে লবিং করা। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, এমন এমন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়, যারা সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম। ধরা যাক, কেউ যুক্তরাজ্যে থাকেন এবং তার সঙ্গে যদি সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকে, তাহলে তিনি কীভাবে সে দেশের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের উন্নতি ঘটাবেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তো সব ঠিক করে দেবেন না।’ প্রবাসী বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পদবাণিজ্য, দলাদলি, আঞ্চলিকতার জেরে বহির্বিশ্বে বিএনপির রাজনীতিতে জেরবার অবস্থা। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন দেশে কমিটি গঠন এবং আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের কোন্দল আরও প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করা হচ্ছে। বেরিয়ে আসছে ভেতরের নানা তথ্য। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা তুলে ধরার পরিবর্তে মাত্রাতিরিক্ত কোন্দলে কোথাও দাঁড়াতেই পারছে না বিএনপি। শুধু তাই নয়, আগে বহির্বিশ্বে বিএনপি কমিটিগুলোয় সিলেটিদের রমরমা অবস্থা ছিল। সিলেটি মাহিদুর রহমানের সময় তিনি সব সময় সিলেটিদেরই কমিটিতে স্থান দিয়েছেন। এবার কুমিল্লার আনোয়ার হোসেন খোকন কুমিল্লার লোকদের কমিটিতে স্থান দিচ্ছেন।

তারা জানান, সব থেকে বেশি লেখালেখি হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে নিয়ে। কভিড-১৯-এর সময়কালে যে জুম মিটিং চালু করা হয়েছিল, তিনি এখনো তা অব্যাহত রেখেছেন বলে বহির্বিশ্বের বিএনপি নেতাকর্মীরা তার নাম দিয়েছেন জুম খোকন। এই জুম খোকনের মূল শক্তি হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন কবির। যিনি মূলত ভারতপন্থি বলে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপিকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে থাকেন। এ ছাড়া খোকনের কমিটি বাণিজ্যের মূল সহযোগী হচ্ছে ডেনমার্ক প্রবাসী যুবদলের সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক সোহেল আহমেদ। চেয়ারম্যানের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পদবাণিজ্যের চেষ্টা করেন এই তিন নেতা। এর অধিকাংশেরই সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই।

গত ১৫ জুন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে হুমায়ুন কবিরকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়া হয়। এরপর ২৪ জুন স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপারসন ফরেন অ্যডভাইজরি কমিটিতে আরও ১৭ জনকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে শফিক দেওয়ানকে (জার্মানি) রাখা হয়।

শফিকুল ইসলাম দেওয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যে থার্ড টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে, সেখানে সিসিটিভি বসানোর কাজ পেয়েছেন শফিক। তিনি জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ঘনিষ্ঠ। গত ১০ বছর তিনি বিএনপির রাজনীতিতে একদমই সক্রিয় ছিলেন না। বিভিন্ন সময় তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ধরে প্রকাশ্যে গালাগাল করেছেন। এ নিয়ে তিনি একটি লিফলেটও বিতরণ করেন। এ ধরনের একজনকে ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটিতে রাখায় ইউরোপ বিএনপি নেতাকর্মীরা অবাক ও হতাশ হয়েছেন। তারা সন্দেহ করছেন, ধনাঢ্য ব্যবসায় শফিক দেওয়ানের সঙ্গে খোকনের বিশেষ সম্পর্ক তৈরিতে মধ্যস্থতা করেন সোহেল আহমেদ।

জার্মান বিএনপির এক নেতা দুঃখ করে বলেন, ‘শফিক দেওয়ান আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ। আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাকে হঠাৎ করে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে কারও সঙ্গে আলোচনা না করে। শফিক ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে থাকেন না। থাকেন রাজধানী থেকে অনেক দূরে।’

এদিকে কানাডা বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ‘সম্প্রতি স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপারসন ফরেন অ্যডভাইজরি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে জায়গা পেয়েছেন আশরাফ উদ্দিন। তিনি কানাডায় থাকলেও এখনো সিটিজেন হননি। রিফিউজি হিসেবে সেখানে ফুড ডেলিভারির কাজ করেন। তার পক্ষে কানাডা সরকার কিংবা বিরোধী দলের সঙ্গে দলের হয়ে কাজ করার সক্ষমতা নেই। এমন লোকদের পদ দিলে দলের কোনো লাভ হবে না।’

কানাডা বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেছেন, কানাডা বিএনপির যেসব নেতা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাদের বেশিরভাগ নেতাকে বাদ দিয়ে মুষ্টিমেয় দু-একজনের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন স্টেটের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ নেতারা এর প্রতিকার চেয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন।

পূর্ব কানাডার সভাপতি করেছেন এজাজ আক্তার তৌফিককে। সাধারণ সম্পাদক করেছেন নবী হোসেনকে। এর মধ্যে তৌফিক এর আগে কানাডার যে রাষ্ট্রদূত ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ। হাইকমিশনারের সহযোগিতা নিয়ে বিএনপি নেতাদের নামে মিথ্যা মামলা করেন তৌফিক। আর নবী হোসেন চাঁদপুরের বাসিন্দা। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত