দ্রুত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসা উচিত

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৫:১৮ এএম

আমার মনে হয় চলমান যে সংকট, তাতে লক্ষ্যের দিক থেকে সরকার এবং উচ্চ আদালত কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু মাঝখান থেকে কোনো একটি মহল এ আন্দোলন থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তারা এ আন্দোলনকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। আমার মনে হয় পুরো সংকটটা এ জায়গায় তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে এটা আমার মনে হয় না। এখানে বহিরাগতরা এসে পরিবেশ অস্থিতিশীল করছে। আজ (গতকাল) দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহিরাগতদের বের করে দিতে গিয়ে একজন প্রক্টরসহ কয়েকজন শিক্ষক আহত হয়েছেন। এটা কিন্তু স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে, এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাজ নয়। যারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন, তারা কিন্তু দল বা সংগঠন নয়, এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা প্ল্যাটফর্ম। যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে। এখন আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের উচিত শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তারা যেন কোনো গুজবে কান না দেয়, কোনো উসকানিতে পা না দেয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।

সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত, তাহলে এ সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। কোটা সমস্যা অত বড় কোনো সমস্যা নয়। সারা পৃথীবীতেই কোটা প্রথা আছে। আমাদের দেশেও স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা শুরু হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা দাবি করছে যে, কোটা সংস্কার করা, উচ্চ আদালতও কিন্তু সেই সুযোগ সরকারকে দিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কার চায় আবার সরকার তো ২০১৮ সালে পুরো কোটাব্যবস্থাই বাতিল করে দিয়েছিল। এই জায়গা থেকে চিন্তা করলে আমার মনে হয় কোটা সংস্কার করা বা পুনর্মূল্যায়ন করা সরকারের ভাবনার মধ্যেও রয়েছে। ফলে সরকার উচ্চ আদালতে আপিল করে রেখেছে। সরকার পুরো বিষয়টি মনিটরিং করছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্য ও আরও কর্তাব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদেরও যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। তাদের এখানে বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। আর যারা আন্দোলন করছে তাদের অবশ্যই ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।

আদালতে বিচারাধীন বিষয় হওয়ায় এই মুহূর্তে সরকার আলোচনায় বসে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবেও অনেক কিছু করা যায়। প্রধান বিচারপতি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন ৭ আগস্ট পর্যন্ত উচ্চ আদালত বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ আদালত খোলা। তারা যেকোনো সময় আদালতে গিয়ে তাদের মতামত জানাতে পারে বা বিষয়টি ব্যাখ্যা দিতে পারে। একই সঙ্গে আমার মনে হয় সরকারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত। কারা শিক্ষার্থীদের উসকানি বা মদদ দিয়ে বিপথে পরিচালনা করছে। কারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা পবিত্র জায়গায় রাজাকার সেøাগান তুলেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী এই রাজাকারদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন। অথচ আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই রাজাকারদের নামে পরিচয় দিয়ে সেøাগান দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবশ্যই এ সেøাগানের পেছনে কারা ছিল তা বের করতে হবে। কীভাবে একই সময়ে সারা বাংলাদেশে একই সেøাগান উঠল, কারা এই শিক্ষার্থীদের মধ্যরাতে মাঠে নামিয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজাকার সেøাগান দেবে পরিচয় দেবে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে খুব চতুরতার সঙ্গে স্বার্থান্বেষী মহল ঢুকে পড়েছে। ফলেই রাজাকারের মতো ঘৃণিত পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সরকারের সমালোচনা করবে, ভুল ধরিয়ে দেবে তাদের অধিকার আদায়ে মাঠে নামবে এটা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু আন্দোলনের ফসল অন্য কেউ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রবিরোধী সেøাগান দেবে আর সরকার তা বসে বসে দেখবে তা সম্ভব নয়। জাতির চেতনার জায়গায় মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের বিষয় কোনো আপস দেখানো সমীচীন নয়।

আজকে যারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে অর্থাৎ ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থী, তারা কিন্তু উভয়ই শিক্ষার্থী। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিভাজন কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তাদের আচরণ হবে সহনশীল। তারা কেন প্রতিহিংসা করবে। আমার কাছে মনে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দাবি নিয়ে সেøাগান দেবে, আবার ছাত্রলীগও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দাবি নিয়ে সেøাগান দেবে। আর আমরা অভিভাবক শ্রেণি তাদের উভয়ের দাবিদাওয়া শুনে সিদ্ধান্ত নেব। প্রয়োজনে সরকার বা দায়িত্বশীল মহলকে অবহিত করব। কিন্তু আমাদের দেশে এই সহনশীলতা গড়ে ওঠেনি। ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী উভয়ই কিন্তু তরুণ। এ বয়সে তারা কিছু ভুল করবে, আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি তাদের উচিত এই তরুণ শিক্ষার্থীদের ভুলগুলো ধরিয়ে ও শুধরে দেওয়া।

ছাত্রলীগের অনেক ছেলেও কিন্তু কোটা সংস্কারের পক্ষে আর আমি আগেই বলেছি, সরকারের ভাবনায়ও তাই রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে গেছে আন্দোলন ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে চক্রান্তকারী মহলের অপতৎপরতা। এই আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছে, তাদের কেউ বাধা দেয়নি, ছাত্রলীগের ছেলেরাও তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়নি। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়নি। সুতরাং সবকিছু সঠিকপথেই এগোচ্ছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে একটা মহল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ফলে আজকের এ সংঘাত। আমার মনে হয় এই মহলকে চিহ্নিত করা অতি জরুরি।

শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি নিয়ে মাঠে নামবে। কেউ সপক্ষে থাকবে কেউ বিপক্ষে থাকবে এটা ঠিক আছে। তারা তাদের দাবি নিয়ে কর্মসূচি দেবে, প্রয়োজনে আদালতে গিয়ে তাদের অধিকারের জন্য লড়বে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোভাবেই এখান থেকে ফায়দা নেওয়ার চিন্তা করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখলেই স্বার্থান্বেষী মহল মাঠে নামবে, রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাবে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে না লাগিয়ে তারা যাতে জাতির বৃহৎ স্বার্থে কাজ করে সেই সুযোগ করে দেওয়া।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত