সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন ঘিরে টানা কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত সোমবারের ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবারও দেশের কোথাও নতুন করে প্রাণহানি বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। সহিংসতা থামার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভর করা অজানা আতঙ্কও কাটতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় গতকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বড় বড় নগরীর সড়কে যানবাহন ও মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য জেলায়ও যানবাহন ও মানুষের চলাচল বেড়েছে। সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
এদিকে নতুন করে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাতে আহত চিকিৎসাধীন এক শিক্ষার্থীসহ তিনজনের গতকাল মৃত্যু হয়েছে। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গতকাল সকালে রাজধানীর মগবাজার মোড়ে গিয়ে বহু রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার চলাচল করতে দেখা যায়। গতকাল দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। এ সময় রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহন ও জনসাধারণের উপস্থিতি অনেকটা বেড়ে যায়। দুপুরে শাহবাগ, কাকরাইল, পল্টন, শান্তিনগর ও মালিবাগ এলাকার সড়কগুলোতে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশের দোকানপাট খোলা পাওয়া যায়। বাজারগুলোতে অনেক মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা শুরু হলে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায়। মাঠে নামানো হয় বিজিবি সদস্যদেরও। কিন্তু আন্দোলনের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুর,জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার গত ১৯ জুলাই শুক্রবার মধ্যরাত থেকে দেশ জুড়ে কারফিউ জারির পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। গতকাল কারফিউয়ের চতুর্থ দিনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিল। অবশ্য আগের কয়েক দিনের মতো তাদের সাধারণ মানুষকে খুব একটা তল্লাশি করতে দেখা যায়নি। অনেকটা নীরব ছিলেন তারা। এ কারণে গতকাল অন্যান্য দিনের তুলনায় রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকালের চিত্র বলছে, ঢাকার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
ঢাকায় আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল : গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
আগামীকাল (আজ) ও পরশু (আগামীকাল) কারফিউ বহাল থাকবে। আজ বুধবার কারফিউর সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে।
আজ থেকে অফিস খুলছে : আজ থেকে অফিস-আদালত খুলছে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত অফিস-আদালত চলবে। গতকাল গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিজ নিজ কর্র্তৃপক্ষের। এর আগে প্রথমে সরকারের নির্বাহী আদেশে রবি ও সোমবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে এক দিন বাড়িয়ে তা গতকাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আন্দোলনের নামে বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকারের নির্বাহী আদেশে রবিবার থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীসহ চিকিৎসাধীন তিনজনের মৃত্যু : কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় আহত এক শিক্ষার্থীসহ তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা গেছেন। নিহতরা হলেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তড়ুয়া (২১), দর্জির (টেইলার) দোকানের কর্মচারী নাসির হোসেন (৩২) ও নিরাপত্তাকর্মী মনির হোসাইন (৫৪)। গতকাল ঢামেক হাসপাতালসহ রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে তাদের মৃত্যু হয়। গতকাল রাজধানীসহ সারা দেশে কারফিউ চলার মধ্যে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এর আগে সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢামেক হাসপাতালে বহু আহত আসেন। তাদের মধ্যে গতকাল তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ১৪১ জনের মৃত্যু হলো। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।
নিহত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তড়ুয়া গত ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন। তারা বাবার নাম রতন চন্দ্র তড়ুয়া। তবে তিনি কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে চান না। নিহত নাসির একটি টেইলারের দোকানে কাজ করতেন। বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে। বাবার নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি ২০ জুলাই দুপুরে বাসার বিদ্যুৎ বিল দিতে বের হলে গুলিবিদ্ধ হন। গতকাল মুগদা হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। আর নিহত মনিরের বাড়ি কুমিল্লার মোহনগঞ্জ এলাকায়। বাবার নাম মমতাজুর রহমান। তিনি ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গতকাল ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে মারা যান।
স্বাভাবিক চট্টগ্রাম নগর : সারা দেশে কারফিউ জারির চতুর্থ দিনে গতকাল চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল। কারফিউর তৃতীয় দিন গত সোমবার পর্যন্ত জেলা ও নগরের রাস্তাঘাটের চিত্র ফাঁকা দেখা গেলেও গতকাল রাস্তায় চলেছে গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ভাড়ায় চালিত বিভিন্ন যানবাহন। গতকাল সাধারণ ছুটির দিন থাকলেও খুলেছিল বেসরকারি অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রাস্তাঘাটে বাড়ে মানুষের আনাগোনা। নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিছু পোশাক কারখানাও খুলেছে। কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরাও। নগর ও জেলার বিভিন্ন সড়কে সেনা ও বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় চট্টগ্রামে আজ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর অফিস খোলা থাকবে বেলা ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত।
রাজশাহীতে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন : কারফিউর মধ্যে রাজশাহীর রাস্তায় লোকজনের চলাচল অনেকটাই বেড়েছে। গতকাল রাস্তায় বেশ কিছু রিকশাও চলাচল করেছে। শহরের চেয়ে গ্রামে মানুষ ও ছোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল বেশি। গতকাল দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজশাহীতে কারফিউ শিথিল ছিল। এ সময় সবখানেই মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কারফিউ জারির পর থেকে রাজশাহী শহরে বড়-ছোট সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও গতকাল শহরের রাস্তায় বেশ কিছু যানবাহন চলাচল করেছে। সাধারণ মানুষের চলাচলও দেখা যায়। এদিন অন্যদিনের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি কম ছিল। গত কয়েক দিন রাজশাহীর ক্লিনিকপাড়ায় রোগীর আগমন কম ছিল। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও চেম্বারে আসেননি। তবে এ সংখ্যাটা গতকাল বেড়ে গেছে। গতকাল হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কারফিউ শিথিল থাকাকালে গতকাল রাস্তায় মানুষের জটলা দেখা গেছে। দুপুর ১টা থেকে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। প্রয়োজনীয় কাজ সারার জন্য মানুষের মধ্যে এক ধরনের বাড়তি তৎপরতা দেখা যায়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজশাহীতে কারফিউ শিথিল ছিল।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম ব্যুরো
