১০ হাজার ৫০০ জন অ্যাথলেট, গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ এবারের প্যারিস অলিম্পিকে ময়দান কাঁপাবেন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য। কিন্তু সেই ১৮৯৬ সালে আধুনিক অলিম্পিক শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হওয়া ৩২টি অলিম্পিয়াডের বিভিন্ন সময়ে নিজ দ্যুতিতে মহিয়ান হয়ে উঠেছেন অনেক অ্যাথলেট। আজ তাদেরই আমরা কিংবদন্তি নামে ডাকি। নিজেদের নৈপুণ্যে তারা ছাপিয়ে গেছেন সময়-কাল-পাত্রের গণ্ডি। বর্ণিল ক্যারিয়ারে তারা হয়ে উঠেছেন অনুজদের জন্য পথপ্রদর্শক। অলিম্পিকের ১২৮ বছরে গৌরবময় অধ্যায়ে আমরা পেয়েছি এমনই কিছু কিংবদন্তির যাদের উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন এখনের নবীনরা। সেই সব কিংবদন্তির ভেতর থেকে কয়েকজনকে নিয়েই এ আয়োজন।
জেসে ওয়েনস
কেবলমাত্র নিজের খেলায় অবদানের জন্য কেউ কিংবদন্তি বনে যান না। এর জন্য প্রয়োজন হয় খেলার বাইরেও তিনি কোন আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমনই এক উদাহরণ ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের আফ্রো-আমেরিকান তারকা জেসে ওয়েনস। ১৯৩৫ সালে চারটি ভিন্ন অ্যাথলেটিকস ইভেন্টে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন তিনি। ইতিহাসে ওই অধ্যায় আখ্যায়িত করা হয় ‘ক্রীড়াক্ষেত্রের সেরা ৪৫ মিনিট’ হিসেবে। বিতর্কিত ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিককে বয়কট করতে চেয়েছিল মানবাধিকার কমিশনগুলো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওয়েনসের নেতৃত্বে ১৭ জন আফ্রো-আমেরিকান আসরে অংশ নিয়ে ব্যাপক সাফল্য পান। চারটি স্বর্ণপদক জেতেন ওয়েনস। দেশে ফিরলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সম্মাননা জানান তাকে।
ফ্লোরেনস গ্রিফিথ-জয়নার
অলিম্পিক আসরগুলোর মাঝে ১৯৮৮-এর রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিক বসে এশিয়ায়। আর প্রথমবার আসর আয়োজন করে দক্ষিণ কোরিয়া। এসবের মাঝে একজন অ্যাথলেট আরও স্মরণীয় করে রাখেন আসরটিতে। ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস আসরে একটিমাত্র রৌপ্য জেতা ফ্লোরেনস সবকিছু জমিয়ে রেখেছিলেন হয়তো পরের আসরের জন্য। কঠোর প্রশিক্ষণের নিয়ম অনুসরণ করে, গ্রিফিথ জয়নার তার ওজন নামিয়ে আনেন ১৩০ পাউন্ডে। ট্র্যাকের পোশাকে বদল আনেন ফ্লোরেনস, উঁচু-কাটা পা এবং কম কাটা টপস দিয়ে দৌড়ে আরও বেশি গতি নিয়ে আসেন। সিউল অলিম্পিকে ফ্লোরেনস ট্র্যাক এবং ফিল্ডের রেকর্ড বইগুলো যেন পুনরায় লিখতে থাকেন।
তিনি ১০০ মিটারের জন্য একটি অলিম্পিক রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন, জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। ২১.৩৪ সেকেন্ডে স্বর্ণপদক জিতে ২০০ মিটারে দুবার বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছিলেন। ৪০০ মিটার রিলের তৃতীয় লেগ দৌড়ে তার তৃতীয় স্বর্ণপদক এবং ১৬০০ মিটার রিলেতে একটি রৌপ্যপদক জিতেছিলেন ফ্লোরেনস। তাকে ডাকা হতো ফ্লো-জো নামে।
নাদিয়া কোমানেসি
বহুল প্রচলিত একটি কথা রয়েছে কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। কিন্তু এ অকাট্য বাক্যটিকেও ১৯৭৬ মন্ট্রিয়েল অলিম্পিকে মিথ্যে প্রমাণিত করেছিলেন একজন রোমানিয়ান জিমন্যাস্ট নাদিয়া কোমানেসি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নাদিয়া তাক লাগিয়ে দেন পুরো আসরে। এমনকি বিচারকদের কাছ থেকে তিনি পেয়ে যান একদম নিখুঁত ১০। এমনকি এটা বিশ্বাস করা হতো যে জিমন্যাস্টিকে ১০ পাওয়া অসম্ভব। স্কোরকার্ডও দেখাতে পারেনি এই কীর্তি। বাধ্য হয়েই লিখতে হয় ‘১.০০’। ওখানেই শেষ নয়। ক্যারিয়ারে আরও সাতবার দশে দশ পেয়েছিলেন নাদিয়া। পাঁচবার মন্ট্রিয়েলে, আর দুবার ১৯৮০ মস্কো আসরে। ৫টি স্বর্ণ, ৩টি রৌপ্য এবং ১টি ব্রোঞ্জ মোট ৯টি পদক রয়েছে তার সংগ্রহে।
পাভো নুরমি
ফিনল্যান্ডের পাভো নুরমি সেই ১৯২০ সাল থেকে রাজত্ব করে এসেছেন মিডল ও লং ডিসট্যান্স ইভেন্টগুলোতে। তার কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ডাক নাম পেয়েছিলেন ‘ফ্লায়িং ফিন’। নিজের ক্যারিয়ারে ২২টি বিশ্ব রেকর্ড এবং ১২টি অলিম্পিক পদক জেতেন পাভো, যার মধ্যে ৯টি স্বর্ণপদক। আর এ সবকিছুই তিনি জেতেন ৮ বছরের ব্যবধানে। ৮০ বছর ধরে অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জেতা ক্রীড়াবিদ ছিলেন পাভো। ১৯৯৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিচারে বিশ্বের সেরা অলিম্পিয়ানের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ফ্লায়িং ফিন।
মাইকেল ফেলপস
এই জলমানব অলিম্পিক ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ক্রীড়াবিদদের একজন। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের আগে ৮০ বছর ধরে অক্ষুণœ ছিল পাভো নুরমির রেকর্ড। আর ওই আসরেই সাঁতারের পুলে ঝড় তুলতে আসেন মাইকেল ফেলপস। সেখান থেকে শুরু করে পরের ৩টি আসর ধরে এককভাবে রাজত্ব বজায় রাখেন ফেলপস। তাতেই ভেঙেচুরে যায় পাভো এবং লাতিনিনার রেকর্ড। একটি একটি করে ২৮টি অলিম্পিক পদক নিজের নামে করেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাঁতারু। ২০১২ লন্ডন আসর শেষে অবসরে গিয়েছিলেন ফেলপস। কিন্তু দুই বছর বাদেই অবসর ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়েন ২০১৬ রিও অলিম্পিকের পুলে, জিতে নেন আরও ৫টি স্বর্ণ পদক। নিজের ক্যারিয়ারে ৩৯টি বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন ফেলপস। অলিম্পিক ইতিহাসও আজীবন মনে রাখবে এই কিংবদন্তিকে।
উসাইন বোল্ট
লং ডিসট্যান্সে পাভো নুরমি যেমন এককভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, শর্ট ডিসট্যান্সে ওই একই কাজ করে নিজেকে অমর করে রেখে গেছেন উসাইন বোল্ট। অলিম্পিক আসরে এ জ্যামাইকান জিতেছেন ট্রিপল ট্রিপল; অর্থাৎ অলিম্পিকের টানা তিন আসরে তিনটি করে স্বর্ণপদক জেতার কীর্তি। কিংবদন্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়। তবে উসাইন বোল্ট সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম। সর্বকালের সেরা এই স্প্রিন্টার ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে আবির্ভাবের বছরেই ১০০ ও ২০০ মিটার এবং ১০০ মিটার রিলেতে স্বর্ণ জেতেন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে তার ৯.৫৮ সেকেন্ডের রেকর্ড অক্ষুন্ন রয়ে গেছে আজও।