কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরে শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় পৌঁছেছেন।
তার মা-বাবা ও ভাই গতকাল শনিবার সকালে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে একটি মাইক্রোবাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশে^র হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আবু সাঈদের পরিবার আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের দেখা করার সার্বিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবু সাঈদ নিহতের ঘটনার বিচার ও পরিবারের দায়-দায়িত্বসহ নানা বিষয়ে কথা বলতে আজ রবিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাঈদের পরিবারের সদস্যরা দেখা করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আবু সাঈদের নিহতের ঘটনায় গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা বা কোনো অগ্রগতির তথ্য জানাতে পারেনি। এমনকি এ ঘটনায় বেরোবি কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশের পক্ষ থেকে গঠন করা দুটি তদন্ত কমিটির মধ্যে ঘটনার ১২ দিনের মাথায়ও তদন্ত কাজ প্রকৃতপক্ষে শুরুই করতে পারেনি বেরোবির কমিটি। আর এক্ষেত্রে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকাকে কারণ হিসেবে দাবি করেছেন ওই কমিটির আহ্বায়ক ড. মতিউর রহমান।
এদিকে ঘটনার দিন নিরস্ত্র আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি ছোড়ার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে। এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। তবে পুলিশের করা মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
দেশ জুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত ১৬ জুলাই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেরোবির শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এর কিছুক্ষণ পর বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আবু সাঈদকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। তাকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি ছোড়ার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি ছোড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ নিয়ে দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি হলে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে সংঘর্ষ, ক্যাম্পাসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মতিউর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে বেরোবি কর্র্তৃপক্ষ। কমিটি গঠনের পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার গতি নেই। তাছাড়া তদন্তের জন্য এখন পওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত এই তদন্ত কমিটির কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। তদন্তের জন্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপও নিতে দেখা যায়নি এই কমিটিকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক ড. মতিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পাস তো বন্ধ; আমরা সেই অর্থে কাজ শুরুই করতে পারিনি। এক্ষেত্রে শুধু সেকেন্ডারি আলামত যেগুলো আছে, সেগুলো সংগ্রহ করেছি, দেখছি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রত্যক্ষদর্শী সবার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কেউ প্রমাণ দিতে চাইলে সেটা সংগ্রহ করতে হবে। তারপর তো রিপোর্ট জমা দিতে হবে। কিন্তু ক্যাম্পাস যেহেতু বন্ধ এখন সেগুলো তো কালেক্ট (সংগ্রহ) করা সম্ভব হচ্ছে না।’
কমিটির আহ্বায়ক আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাস খুললে আমরা একটা বিজ্ঞপ্তি দেব, এই বিষয়ে যদি কেউ আমাদের কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে চায় তাহলে তা প্রমাণসাপেক্ষে দিয়ে যেন সহায়তা করে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ, সেক্ষেত্রে কবে নাগাদ জমা দেওয়া যাবে তা নিশ্চিত না।’
এদিকে সেদিনের সংঘর্ষের ঘটনায় গত ১৭ জুলাই পুলিশই বাদী হয়ে তাজহাট থানায় মামলা করে। তবে পুলিশের এফআইআরে সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এফআইআরে বলা হয়েছে, ‘বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দিক থেকে গুলি ছুড়তে থাকে এবং ইটের টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখা যায়। সহপাঠীরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
বেরোবি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিভূতিভূষণ রায়ের লেখা এই এফআইআরে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাতপরিচয় দুই থেকে তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এফআইআরে আরও বলা হয়, ‘রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনরত দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন দিক থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ও তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসআই বিভূতিভূষণ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি মাত্র মামলা দায়ের করেছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্য যাচাই করবেন।’
তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলছেন, নিজেদের দোষ ঢাকতেই বিক্ষোভকারীদের ওপর দোষ চাপাতে চাইছে পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ মারা গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সুস্পষ্ট মামলা হয়নি। উল্টো নিজেদের দোষ ঢেকে পুলিশ দায়ী করেছে আন্দোলনকারীদের।’
আবু সাঈদের লাশ হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক যান। তাদের মধ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘আবু সাঈদের হাত, বুক, পিঠ, মুখসহ শরীরের শতাধিক স্থানে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন ছিল। সাঈদের শরীর ঝাঁঝরা হয়েছিল গুলিতে। গুলিটার নাম কি সেটা বলতে পারি না, তবে তার সারা শরীর ঝাঁঝারা ছিল।’
গত ১৬ জুলাইয়ের সংঘর্ষ এবং আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় পরদিন ১৭ জুলাই পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলিশ। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সায়ফুজ্জামান ফারুকীকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে ঘটনার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এই কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তদন্ত কমিটির প্রধান সায়ফুজ্জামান ফারুকীর মোবাইল ফোনে কল করে কোনো সাড়া মেলেনি।
