এক
গত দুই সপ্তাহের বাংলাদেশের করুণ পরিণতি, রাষ্ট্র পরিচালকদের অভূতপূর্ব কাণ্ডজ্ঞানহীন একরোখামি, সরকারি দলের প্রতিহিংসাপরায়ণতা, অজস্র নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর অহেতুক মৃত্যু, বেনজীর পুলিশি হামলা চালাতে গিয়ে পুলিশের মৃত্যু, বেশুমার হাসপাতাল উপচে পড়া আহত, গণগ্রেপ্তার (ও জনসম্পদ তছনছ) ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে আমার আফসোস হচ্ছে। তবে এসব আফসোস পরিপ্রেক্ষিত বিচারে বিলাপই মাত্র, হয়তো আত্মশ্লাঘাও বটে। নিতান্ত শোকার্ত অবস্থাতেও শ্লাঘা আমাদের জন্ম হতে পারে, অন্তত আমার। তাই একদম কবিতা-মনে-না-রাখতে-পারা-আমারও বুদ্ধদেব বসুর ওই লাইনটা তাই মাথায় সারাবেলা গুণগুণ করে ‘...বেদনাতেও দম্ভ নয় শোভন/ আমার শোক, তুমি নম্র হও’ (ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ)। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র কি আমাদের এই শোক ও ক্ষোভ আমলে আনতে সক্ষম?
না! বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনের অনেক বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহের হিংস্রতা আর ব্যবস্থাপনার লেজেগোবরে মাখামাখি দশার প্রধান কারণ রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা এবং এর হর্তাকর্তাদের একরোখামি। এরোগেন্স। আর দ্বিতীয় কারণ হাই-প্রোফাইল উপদেষ্টারা। আমার ধারণা, মন্ত্রিপরিষদের মূল অংশ ও সরকারপ্রধানের উপদেষ্টারা কেবল শাসকের অনুকরণ করেন। পর্যালোচনা করেন না। কোনো কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসকেরই যেন এমন মন্দ কপাল না হয়!
দুই
আমাদের প্রজন্মের লেখাপড়া করা বাংলাভাষী যুবাদের অনেকের কাছেই গোয়েন্দা বলতে ছিলেন হয় শার্লক হোমস কিংবা কিরিটী রায়। সঙ্গে ব্যোমকেশ বক্সী থাকলে থাকতে পারতেন। রূপবান ফেলুদা একটু পরে এসে যুক্ত হলেও হতে পারেন। গোয়েন্দাসাহিত্যে আগ্রহীদের কখনোই ফেলুদাকে বৌদ্ধিক বিশ্লেষণের দিক থেকে ওই তালিকার সঙ্গে রাখতে দেখিনি। আমিও রাখিনি। গোয়েন্দাদের সমান্তরালে ঢিসুম-ঢাসুম স্পাই-গুপ্তচর এবং রবিনহুডি সাম্যতার দর্শনওয়ালা কিছু সুপারম্যান চরিত্রগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা রবিনহুড হোন বা বনহুর। সবাই সমান্তরালে মিলেমিশে একটা বৃহৎবর্গের নায়ক (অতি অবশ্যই পুরুষ) হিসেবেই বিরাজ করে এসেছেন। পর্দার দুনিয়ায় পিস্তল হাতে গুপ্তচর থাকলেন জেমস বন্ড। বর্গটা আসলেই ভেজাইল্যা। রবিনহুডের মতো সাম্যতাপ্রিয়, জেমস বন্ডের মতো পেটোয়া এক রাষ্ট্রের অনুচর সবাই একঘাটে পানি খেতে থাকেন। এর সবই বইয়ের পাতায়, কিংবা রঙ্গপর্দায়।
বাস্তবে গোয়েন্দা বিভাগের পুলিশ দেখা সে জন্য আমাদের অনেকের জন্যই কৈশোরে এক মহা-মন খারাপের কারণ হতো। নিরীহ আর পাঁচজন চাকরিজীবীর মতোই সাধারণ মানুষই ভাবতে হতো আমাদের। বইয়ে পড়া ওইসব উত্তুঙ্গ লোকদের সঙ্গে মেলাতে মন চাইত না। মেলাতে পারতামও না। কিন্তু আমাদের কল্পনাকে সাহায্য করা গোয়েন্দাদের কাজ নয়। ফলে ওটা নিছকই বইপড়ার দুর্ভোগ হিসাবে মানতে শুরু করেছিলাম। গোয়েন্দাদের কাজ যে কী তা নিয়ে আমাদের সব উদ্ভট থিউরি শুনতে হতো। একদিকে শুনতাম যে, তারা ভিখিরি সেজে, ময়লাসাফাই শ্রমিক সেজে এখানে সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাগী সব আসামিকে ধরে বেড়াতেন। ভক্তিতে আমাদের মন গলে পড়ত এসব পেশাজীবীদের নিয়ে। আবার শুনতাম ভিন্ন কথা। আরেকটু শেয়ানা রাজনীতি বিশ্লেষক মুরব্বিরা বুঝিয়ে দিতেন যে, গোয়েন্দাদের কাজ হলো শাসকের সমস্যা তৈরি করে যারা তাদের হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এসে আচ্ছামতো শায়েস্তা করা। বড় হতে হতে বুঝতে শুরু করেছিলাম যে, এগুলোর সবই সত্য। এরপর আমি নিজেই এক বড় মানুষ। জৈবিক বয়স বিচারে আরকী! তত দিনে চিতা, কোবরা, র্যাব বানিয়ে পুলিশি কর্মকাণ্ডের গোয়েন্দা অংশকে কার্যত লাঠিয়াল বাহিনির রূপ দিয়ে ফেলেছে আমাদের রাষ্ট্র।
আমাদের মধ্যে মিহিদানা, হাততালি দিয়ে শাসকের পদতলে বসে থাকা মানুষজন এসব বাহিনীর সব কৃতিত্বের গুণগান করতে শুরু করেছেন। আমরা কেউ কেউ একটা পুলিশি-গোয়েন্দা রাষ্ট্রের নির্মম অগণতন্ত্রী গোড়াপত্তনে শিউরে উঠেছি। তারপরও কখনোই গোয়েন্দার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্যামেরা তাক করে সরাসরি টিভিপ্রচারের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি অতীব নতুন। ছিল না। কখনোই ছিল না। সাম্প্রতিককালে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক লোককে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের মাধ্যমে পাবলিক আইকন বানানোর প্রক্রিয়া ছিল। যদি পুলিশের প্রধান করোনার সময়ে নাকে জীবাণুখোসা পরার তাগিদ জানাতে টিভিতে আসতে শুরু করে থাকেন, তো গোয়েন্দাপ্রধান বিভিন্ন কেইসের চলমান অগ্রগতি নিয়ে প্রায় ক্রিকেট কমেন্টারির মতো করেই টিভি-সম্প্রচারিত হতে শুরু করলেন। গোয়েন্দাদের গুপ্ত বৈশিষ্ট্যটাই লুপ্ত হতে শুরু করেছে। এটা ভালো না মন্দ, তা রায় দেওয়া আমার কাজ নয়। কিন্তু আপনাদের নিশ্চিত করি, এটা অত্যন্ত সুচিন্তিত জনগণ শাসনের একটা মডেল। এতগুলো টিভি চ্যানেল (ও পত্রপত্রিকাকে) রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার বলে বসাতে যদি কারও অশান্তি হয়, তবে নিশ্চিত করি, রাস্তায় পথচলতি ‘সাধারণ’ মানুষজন সব টিভিকেই একেকটা বিটিভি বলেই জানেন। কান পাতুন, তাদের বিচার-বিশ্লেষণ শুনতে পাবেন।
তিন
তো এই গোয়েন্দারাজ দলগত নৈশভোজের পরপরই আন্দোলনকারীদের ৬ সমন্বয়কারী আন্দোলন নিয়ে বার্তা দিলেন। এরা হলেন সেই সমন্বয়কারী, যাদের বাসা কিংবা হাসপাতাল থেকে ডিবি অফিস তুলে নিয়ে গেছিল। নৈশভোজে গোয়েন্দারাজের সঙ্গে বসেই তারা যে খাচ্ছিলেন সেটা পোস্ট করতেও ডিবি অফিস ভুল করেননি। পাছে তারা আর কিছু খাচ্ছিলেন ভাবেন বলে আপনারা ভাবেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে নিয়ে ডিবির অফিসে রেখে সেখান থেকে তাদের বাণী সম্প্রচার করানো একটা কাঁচা পোলাপাইন্যা কাজ। এমন কাঁচা যে গোয়েন্দা বিভাগের সাম্প্রতিক রাষ্ট্র-প্রচারিত সাফল্যের গল্পগুলো মাথায় দুড়দাড় করে আসতে শুরু করল। এই কাঁচা কাজটা বোঝেননি বাংলাদেশে এমন লোক পাওয়া কঠিন হবে। তবে অবশ্যই সরকারি দলের লোকজন, সরকারের একান্ত ‘উপদেষ্টা’ মহল নিশ্চয়ই একে বজ্র আঁটুনি এক ব্যবস্থা মনে করেছেন। আর রইলেন সরকারের দোহার বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী সম্প্রদায় টিভি ও প্রচারমাধ্যমে যারা পালে পালে গিজগিজ করে কোরাস গাইছেন। এতগুলো নিরীহ তরুণের নির্বিচার হত্যা আর গ্রেপ্তারের পর এদের কাছে আমি সংবেদ আশা করি না, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান করি। আপনারা সত্যিই ভেবেছিলেন যে, এই গোয়েন্দা-ন্যারেটিভ মানুষে খাবে? এখনো তাই ভাবছেন? এই দেশব্যাপী ধরপাকড়ের মধ্যে? আপনারা জনসাধারণকে বেকুব ভাবেন? নাকি ভাবেন, ভয়ের যে রাজত্বের আপনারা দোহার, সেই ভয়েই তারা কাবু?
এই রচনা প্রকাশিত হওয়ার আগেই আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারব, এই কাঁচা-ন্যারেটিভের গোয়েন্দা নাটক মানুষজন কীভাবে গ্রহণ করেছেন। বুঝতে পারব বলছি বটে, কিন্তু বোঝার চ্যানেলগুলো অত্যন্ত দুরূহ। সব কিছুুই বন্ধ রাখা হয়েছিল। সারা বিশ্ব এখন জানে এখানে যোগাযোগের রাস্তা কীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং কী উদ্দেশ্যে। কিন্তু ধরপাকড়ের চরিত্র নিয়ে যাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে তারা সড়ক আন্দোলনের সময় শহিদুল আলমকে পাকড়াও অভিযানটা স্মরণ করুন। যদি তাতে আপত্তি থাকে, তাহলে অন্তত ২৮ তারিখ দিবাগত রাতে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র আরিফ সোহেলকে ‘তুলে নেওয়া’র কাহিনিটা তার বাবার মুখে শুনুন। সন্তানহারা বাবার পক্ষে আপনাদের ভয়ের রাজের প্রজা থাকা সম্ভব হয়নি। তিনি বিশদই বলেছেন। প্রতিটা ‘তুলে নেওয়া’ই এই পদ্ধতিতেই চলেছে। গণস্বাস্থ্য থেকে সমন্বয়কদের তিনজনকে তুলে নেওয়ার সময়েও আত্মীয়স্বজন নিশ্চিত করেছেন যে, টেনেহিঁচড়ে চিকিৎসারত অবস্থায় এদের নেওয়া হয়েছে। আত্মীয়, চিকিৎসকদের শতেক প্রতিরোধ সত্ত্বেও। গোয়েন্দারাজ বলেছেন, ‘সমন্বয়কদের হেফাজতের’ জন্য নেওয়া হচ্ছে। এই বিদঘুটে প্রচার কেউ দুই পয়সার বিশ্বাস করেনি। সরকারি গায়েনরা ছাড়া। মনে রাখবেন, এসব সমন্বয়ক একবার ইতিমধ্যেই গুম হয়েছেন। বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে ‘গুম’ হয়ে জীবিত ফিরে আসাকেই এখন আমাদের পুরস্কার হিসেবে মানতে হবে। তা ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন তারা জানেন না। বিশ্বাস করেছেন আপনারা?
চার
স্বাধীনতার পর কোনো সরকার/আমল এই পরিমাণ পাবলিক অবিশ্বাসের পাত্র হয়েছিল কিনা আমি সন্দেহ করি। ১৯৭৭ থেকে, যতই আমার বয়স মাত্র ৮ হোক না কেন, আমি জনপরিসরে শাসকদের প্রতিমূর্তি মনে করতে পারি। আমার মনে পড়ে না।
গত ১৫ জুলাই থেকে আমি, বাংলাদেশের অগণিত জীবিত মানুষের মতো, দিনক্ষণকালের কোনো অনুভূতির ধারাবাহিকতা রাখতে পারছিলাম না। আমি জানি না এই অদ্ভুত হত্যাযজ্ঞের মধ্যে, এসব নিহত কিশোরের পরিবারের কেমন অনুভূতি। আমি জানি না, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চিরদুর্ভোগ পোহাবেন কিংবা এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এমন তরুণদের পরিবারের অনুভূতি কী। আমি জানি না, আসলে আমার নিজের অনুভূতিই বা কী ছিল এই কদিনে। আমি সহকর্মীদের ব্যাকুল চোখে তাকাচ্ছিলাম। আমি স্বভাবসুলভ রস বজায় রাখতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার অনুভূতি! আমি নিশ্চিত নই।
এর মধ্যে শিক্ষক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ ২৪ জুলাই শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। এই কবিসচিবের পদপ্রান্তে কবিদের থাকার গল্প শুনেছি। শিক্ষকদের দেখেও আমি বিস্মিত নই। তারপরও, এতগুলো লাশের সঙ্গে বেইমানি হলো না এখন যাওয়া?
তবুও, এই কদিন কখনোই আমার কান্নার কোনো অনুভূতি মনে পড়ে না। গত রাতে আমার ঘুম নেই, আগের রাতগুলোতেও। ফজরের আজান পড়ে গেছে। তার করুণ সুর আমাকে আর্দ্র করেছে। র্যান্ডাম সাইবার খবরপ্রাপ্তির মধ্যে আমার চোখে পড়ল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটা নৈবেদ্য। বাংলাদেশের সরকারের গোঁয়ার অদূরদর্শিতার সামনে নিহত তরুণদের স্মরণে বাতি জ্বালিয়েছেন তারা। আর মৃদুসুরে গাইছেন, গিটার বাজিয়ে, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে...’। গত ১০ দিনের জমাট কান্না যা আমি এমনকি জানতাম না, ভোররাত্রিতে ওয়াইওমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠের উছিলায় অবাধ হয়ে পড়ল। (সংক্ষেপিত)
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
