কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ চলাকালে ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের কাছে বহু কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ করেছিল সরকার। এরমধ্যে ১৬ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ফেসবুক সরকারের অনুরোধের বিপরীতে ১৩ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৭ শতাংশ কনটেন্ট সরিয়েছে। ইউটিউব ১৭ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সরিয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ কনটেন্ট। আর টিকটক সরিয়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ।
টিকটকের কার্যক্রমে সরকার সন্তুষ্ট উল্লেখ করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, সরকারের ৩৫০ টির মতো অনুরোধে সাড়া দিয়ে টিকটক ৭ লাখ ভিডিওর মধ্যে ৬৭ শতাংশ কনটেন্ট সরিয়েছে। গত ১৮ জুলাই সরকারের শতভাগ অনুরোধই তারা রেখেছে। ফেসবুকের কাছে যে সংখ্যক কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ করা হয়েছিল সে তুলনায় তাদের সাড়া অনেক কম।
আজ বুধবার (৩১ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি কার্যালয়ের আয়োজিত এক বিফ্রিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তার ব্রিফিংয়ের পর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে দুপুর ২টার দিকে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আবার চালু করে সরকার।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হলে ১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট এবং ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ দিন পর ২৩ জুলাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত পরিসরে চালু করা হয়। ১০ দিন পর ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়েছে। কিন্তু ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ ছিল।
সরকার বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাম্প্রতিক ঘটনায় দায়িত্বশীল আচরণ করেনি। সেজন্য গত শনিবার ই-মেইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বিটিআরসি। সেই প্রেক্ষিতে আজ বুধবার সকালে মেটার (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম) সিঙ্গাপুরের এশিয়া সদর দপ্তরের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফেসবুকের প্রতিনিধিরা অনলাইনে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। টিকটকের প্রতিনিধি সশরীর হাজির হন। ইউটিউব বৈঠকে অংশ না নিয়ে ই-মেইলে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশে অফিস স্থাপন, মিস-ইনফরমেশন, ডিস-ইনফরমেশনজনিত যেকোনো অস্থিরতা নিরসনে ফ্যাক্ট চেকিং জোরদারের উদ্যোগ গ্রহণসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মো. মুশফিকুর রহমান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ, মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।
ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, ফেসবুক-ইউটিউবে গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে প্রাণহানি ও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকার ও জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
সংঘর্ষের সময় ১৬ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত যেসব কনটেন্ট অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করে। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্ল্যাটফর্মগুলো ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে তাদের আশ্বস্ত করেছে। তারা স্বীকার করেছে যে ১৪ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত যতটা সাড়া দেওয়ার কথা ছিল, তারা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে।
ফেসবুক থেকে বাংলাদেশের জন্য নিয়োগ দেওয়া তথ্য যাচাইকারী বা ফ্যাক্ট চেকাররা নিরপেক্ষ নন বলে উল্লেখ করে জুনাইদ আহমেদ বলেন, তাদের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড সরকারবিরোধী, দেশবিরোধী। ফেসবুককে এমন ফ্যাক্ট চেকার নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে, যাদের দেশের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও আইন সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগ, ফেসবুক বাংলা ভাষায় আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা-এই শব্দগুলো দিলে রিচ (ব্যবহারকারীদের সামনে নেওয়া) কমিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দিলে সেগুলোর রিচ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান এবং নির্বাহী আদেশে কারামুক্ত থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও মেটাকে জানানো হয়েছে।
বিফ্রিংয়ে জানানো হয়, বিএনপি নেতা গোলাম মওলা রনি (আওয়ামা লীগের সাবেক সংসদ সদস্য), প্রবাসী বাংলাদেশী ইলিয়াস হোসেন, ড. কনক সারোয়ার, জাহিদ এফ সরদার ও পিনাকী ভট্টাচার্যসহ ৫০ জনের একটা তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত দেশের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে, জনগণের নানারকম গুজব ও মিথ্যা অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। এরা দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তে জড়িত। সামাজিক মাধ্যমগুলোকে তাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে।
