সুদর্শন যুবক। চলাফেরায় আভিজাত্যের ছোঁয়া। যেন হিন্দি ছবির নায়ক। কখনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, কখনো পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে হাঁটাহাঁটি করছেন। হাতে দামি ঘড়ি। নিজের ফেসবুক ওয়ালে আছে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও। তার ফলোয়ারও আছে লাখের ওপরে। নাম তার মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। এই ডেভিড ইমনই এখন চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের ‘সেনসাশন’।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ, সবশেষ ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’ এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উঠে এসেছে তার নাম।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধ জগতে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠেন চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের এই অনুসারী। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি এবং হামলার অভিযোগের পর তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরে আধিপত্য ধরে রাখতে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে তার প্রতিপক্ষ সারোয়ার হোসেন বাবলা, ঢাকাইয়া আকবর নামে পুলিশের তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে।
সবশেষ ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে ১৩ জুলাই বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’ এ হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায়।
এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল সমন্বয়কারী রোহেনসহ ৯জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে র্যাব-৭। এর আগে একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৮জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সবশেষ শনিবার ৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে নগরের চান্দগাঁও ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব-৭। এ সময় র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নির্দেশে। আর এই কাজে নেতৃত্ব দেন ইমনের সহযোগী রোহেন মিয়া। রোহেনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালান।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইমন প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ফোন করে দুই কোটি টাকা এককালীন চাঁদা দাবি করেন। এ ছাড়া মাসিক ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। কিন্তু টাকা না পেয়ে ফোন করার দুই দিনের মাথায় (১৩ জুলাই ) হামলা, ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার ৯ জনের মধ্যে ৪ জনকে ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার আসামিদের চকবাজার থানায় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।’
‘ডিডিএন’ এ হামলা-ভাঙচুর ঘটনার দুইদিন আগে ডেভিড ইমনের একটি অডিও কল রেকর্ড ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে তাকে (ডেভিড ইমন) বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ডেভিড ইমন ফোন করেছে বলেন, আমার ফোন নম্বর দেখান, তিনিই বলে দেবেন আমি কে?... ব্যবসা করতে চাইলে একবারে ২ কোটি টাকা ও প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে দুদিনের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন, আমার পোলাপান ব্যবসা করবে।’
চট্টগ্রাম নগরের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ জগতের নতুন আতঙ্ক ডেভিড ইমনকে খুঁজছে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য গত ১৪ জুলাই জন্মস্থান চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। ডেভিড ইমন নিজে দুবাই আছেন বলে দাবি করলেও এর স্বপক্ষে এখনো কোনো প্রমাণ পায়নি নগর পুলিশ।
পুলিশ বলছে, এই ডেভিড ইমনই এখন চট্টগ্রামের আবাসন, ইন্টারনেট, গার্মেন্টসসহ নানা খাতের ব্যবসায়ীদের মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি হোয়াটসআ্যাপ নম্বর থেকে চাঁদা দাবি, না দিলে বাসা-বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ, হামলা ও ভাঙচুর করছেন তার অনুগত বাহিনীর সদস্যরা।
নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, বাকলিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যেই এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাব-৭ ও পুলিশের পৃথক অভিযানে মূল সংগঠক মাইকেল নামে এক যুবকসহ মোট ১৭জন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত আছে।’
ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ফোনে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দিবি, মাসে দিবি ১০ লাখ। এখন থেকে ব্যবসা আমরা করব’।
আদিল বিন মামুনের দাবি, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তাদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ফোনে হুমকি দেওয়া ব্যক্তি সবার পরিচিত।’
পুলিশ জানায়, ডিডিএনের কাছে চাঁদা দাবি করে ফোন দেওয়া ‘ডেভিড ইমন’ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের পক্ষে চট্টগ্রামে অপরাধজগত পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ‘সন্ত্রাসীর’ একজন মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন।
সিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বড় সাজ্জাদ গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কিশোরদের দলে টানছে। এই নতুন সদস্যরা বড় সাজ্জাদের নামে ব্যবসায়ীদের ফোন করে চাঁদা দাবি করছেন, হুমকি দিচ্ছেন।
জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের মো. মুসার ছেলে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি।