১৯৬৫ সালে দৈনিক পাকিস্তানে যোগদান করেন তিনি। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ছিলেন সহকারী সম্পাদক। ‘সুপান্থ’ ছদ্মনামে তার লেখা কলাম ‘নগর দর্পণ’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক এবং অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালের ২৩ জুলাই মারা যান বরেণ্য সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতেই ছাপা হচ্ছে তার লেখা উপসম্পাদকীয়
চিরজীবী রবীন্দ্রনাথ। বাইশে শ্রাবণ তার মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে এই অনুভব প্রবলতর হয়ে ওঠে প্রতি বছর। কালের বৈষম্যের জন্য আমরা যারা যেতে পারিনি তার সান্নিধ্যে, ছিলাম না তাকে স্বাগত জানাতে এই নগরীতে অথবা শুনিনি তার ভাষণ করোনেশন পার্কের জনসভায়, কার্জন হলের সমাবেশ সংবর্ধনা বৈঠকে, তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ একটি নাম, একটি স্পন্দন, উজ্জ্বল উপলব্ধি, রক্তের কল্লোল। সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় আমাদের। জন্মদিন, মৃত্যুদিন সেই পরিচয়কে আরও গভীর প্রতিষ্ঠা দেওয়ার উপলক্ষ। সন্দেহ নেই, জন্মদিনে বেজে ওঠে উৎসবের সুর, আনন্দধারা বয়ে যায় অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে। বেদনা-ভারানত মৃত্যুদিন, চাঞ্চল্যহীন গম্ভীর। কিন্তু বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, মৃত্যুদিন শুধু প্রথাগত স্মরণসভা অনুষ্ঠানের উপলক্ষ মাত্র নয়, একটি প্রতিজ্ঞা, একটি আত্মপরিচয়কে শানিত করে নেওয়ার অবকাশ। পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ পাকিস্তানি আমলে পালিত হয়েছে দুটি লড়াইয়ের দিন হিসেবে। এই লড়াই বাঙালির পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করে নেওয়ার জন্য। চিরাচরিত স্মরণসভার ব্যঞ্জনায় নয়, ২২ শ্রাবণ এখানে পালিত হয়েছে একটি নিষিদ্ধ নাম উচ্চারণের জন্য, নির্বাসিতকে নিয়ে আসার জন্য দিনের আলোতে, তরঙ্গ মুদ্রিত জনসমুদ্র তীরে। রবীন্দ্রনাথ একটি আশ্চর্য ফলবান নাম, একটি অপরাজেয় শক্তি। ১৯৪৭-এর আগস্ট থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত এই জনপদে তিনি তাকে অস্তিত্ববান করে রেখেছেন, প্রবলভাবে বিধিনিষেধকে তুচ্ছ করে, হুলিয়া এড়িয়ে, নির্বাসন দ-কে অনায়াসে উপেক্ষা করে। একজন মৃত কবি এমনভাবে বেঁচে থাকার দৃষ্টান্ত সাহিত্যের ইতিহাসে আর নেই। আগামীকাল ২২ শ্রাবণে তাই তার উদ্দেশে আমরা নিবেদন করব শ্রদ্ধাঞ্জলি, বলব তুমি ছিলে বলে আমরা ভয়কে জয় করেছি, সোনার বাংলাকে বলতে পেরেছি ভালোবাসার কথা তোমার কবিতায়, তোমার সুরে সুরে।
দুই নম্বর মানুষ
এই নগরীর আমি দুই নম্বর বাসিন্দা। না, প্রাধান্যের বিচারে নয়, অনুমান করি, আমিই একলা নই, আমার মতো আছে আরও অনেক ‘দুই নম্বর’ মানুষ। অর্থাৎ আমরা যারা ‘দুই নম্বর’ সিগারেট কিনি পয়সার অভাবে, দুটো টাকা বাঁচাতে খাই ভেজাল দেওয়া ‘দুই নম্বর’ সরষের তেল, পরি ‘দুই নম্বর’ কাপড়, চড়ি দুই নম্বর যানে অর্থাৎ ভিড়াক্রান্ত বাসে। এই ‘দুই নম্বরের’ ধাক্কা ইদানীং আর সামলাতে পারছি না আমরা। বাজে সিগারেট টেনে টেনে ফুসফুস বিকল, ভেজাল তেলে পেটের পীড়া নিত্যসঙ্গী। তিন নম্বর যান রিকশা এখন ভাড়ার কৌলিন্যে এক নম্বরের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। বাজারে ‘দুই নম্বর’ মাছও দুর্লভ, কাপড়-চোপড় জুতা, তেল এগুলোর কথা বোধ হয় না তোলাই ভালো। আমাদের আরও মুশকিল, ‘দুই নম্বর’ ওষুধে অসুখের ঘন ঘন আগমনকে ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই।
সর্বগ্রাসী সংকটের গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে খুঁজে ‘দুই নম্বর’ আমরা দিশেহারা।
যুগাবসান
বাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে, রিকশার জন্য কাড়াকাড়ি করতে করতে কখনো বা মনে পড়ছে ঘোড়ার গাড়ির কথা। মনে হয়েছে, হোক না জিরিজিরে হাড় বের করা ঘোড়ায় টানা, ঝরঝরে কোচ, ছেঁড়া গদি, কিন্তু তবুও তো টগবগ টগবগ করে পৌঁছানো যেত গন্তব্যস্থল।
কিন্তু আমাদেরই উপেক্ষায় ঘোড়ার গাড়ি আজ নগরীর রাজপথ থেকে ওঠে যাওয়ার উপক্রম। আজ কাল কোন কদর নেই যাত্রীদের কাছে, দূরের পাল্লায় মাল বহনের জন্যই যা কিছু চাহিদা। এই সামান্য প্রশ্রয় সম্বল করে ঘোড়ার গাড়ি আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না ঢাকার পথে। তার পরাজয় অনিবার্য। ঘোড়ারগাড়ির বিরুদ্ধে সময়ের রায় উচ্চারিত হয়ে গেছে বহু আগে।
অথচ চল্লিশের দশকেও কি রমরমা ছিল ঘোড়ার গাড়ির। কী তেজ, কী জৌলুস, কী গর্ব। ঘোড়ার গাড়িতে সে সময় চড়ার সুযোগ পেত কজন? আর কোচমানদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তো ভাবতে হতো দুবার। তাদের পরিহাসপ্রিয়তা, রসালো গল্প আর চুটকি পরিণত হয়েছিল জনপ্রবাদে। তারাই তখন জমিয়ে রেখেছিল যানবাহনের আসর। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ঘোড়াগাড়ির তার অতীত গৌরবের রেশ টেনে চলেছে রাস্তায়, কিন্তু তার পরিণতি ঠেকানো সম্ভব নয়।
ঘোড়ার আস্তাবলগুলো এখন রিকশা মেরামতের কারখানা, গাড়ির গ্যারেজে বসেছে মোটর মেকানিকদের আড্ডা। কোচওয়ানরা হতমান, তাদের শীর্ণদীর্ণ চেহারা। স্পর্ধাভরে হাওয়ায় চাবুক ঘোরানোর দিন শেষ। যে গাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, যে ঘোড়া থুবড়ে পড়ছে তার বদলে ঘটছে না নতুন সংযোজনা। আমাদের চোখের সামনে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সামন্ত যুগের রহস্যময় অনুষঙ্গ মাখা একটি যান, একটি অভ্যাস। ইতিহাসের উত্থান-পতন যেন চোখের সামনে।
শব্দের দাস
নগরজীবন তার আবর্তনের ছন্দে সৃষ্টি করে নতুন শব্দ, ঝেটিয়ে দেয় পুরনো ভাষা। আবার কখনো জড়িয়ে পড়ে আপন শব্দের জালে যেখান থেকে তার সহজ নিষ্কৃতি নেই। সাম্প্রতিককালে নাগরিক অভিধানে সংযোজিত শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হাইজ্যাকিং’, ‘ব্রাস ফায়ার’, ‘ক্রলিং’ ইত্যাদি। এসব শব্দ কিছুটা বৈচিত্র্য এনেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু নগর জীবনের ভাবনা এখনো পুরনো শব্দের দাস। যেমন এখানকার জনসভা সবসময়ই ‘বিশাল’, বিক্ষোভ ‘প্রচন্ড’, পরিস্থিতি ‘মারাত্মক’, যেকোনো ঘটনা ‘প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য’ দুর্নীতি ‘ব্যাপক’ ইত্যাদি ইত্যাদি। নগর জীবন যে দ্রুততালে বদলাচ্ছে, শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে না সে স্বতঃস্ফূর্ত গতিতে। পুরনো শব্দের দাসত্ব থেকে নাগরিক ভাষাকে মুক্তি দেওয়ার দিন এসেছে। ভাষাশিল্পীরা সচেতন না হলে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা ভাষার গায়ে লাগবে না রঙ, মুছবে না মফস্বলী গন্ধ; ভাষা ছড়াবে না জীবনের সৌরভ।
পাদটীকা
টেলিভিশনের পর্দায় সীতার আলুলায়িত কেশদামের শোভা দেখে জনৈক মহিলা দর্শকের মন্তব্য কৃপণ স্বামীর উদ্দেশে আমদের আর কী দোষ?
রামায়ণের যুগেই তো দেখছি শ্যাম্পুর চলন ঘটেছিল বিস্তর।
লেখক: আহমেদ হুমায়ূন ৬-৮-১৯৭২
