অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটলে বলে দেওয়া যায় আজই অলিম্পিক পাট চুকে যাচ্ছে বাংলাদেশের। তবে আজ যে দুজন দুটি ভিন্ন খেলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তারা অসম্ভব কিছু ঘটিয়ে ফেললে প্যারিস অলিম্পিক নিয়ে বাংলাদেশিদের আগ্রহ কিছুটা টিকে থাকবে। প্যারিসের উত্তরে ২৬ বছরের পুরনো স্তাদে দ্য ফ্রাঁসেদেশটির জাতীয় স্টেডিয়াম। সেখানে ১ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ডিসিপ্লিন। ছেলেদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের প্রিলিমিনারি রাউন্ডে আজ বাংলাদেশের হয়ে নামবেন ইমরানুর রহমান। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই স্প্রিন্টার বাংলাদেশের টানা চারবারের দ্রুততম মানব। তাই তাকে নিয়ে একটু হলেও স্বপ্ন দেখা যায়। অন্যদিকে প্যারিস লা ডিফেন্স এরেনার নীল জলে ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলের হিটে পরীক্ষা দেবেন সোনিয়া খাতুন। শুরুতেই তারা জ¦লে উঠতে না পারলে এবারের মতো নিভে যাবে বাংলাদেশের অলিম্পিক মশাল এবং সেটা অবশ্যই শতভাগ ব্যর্থতায়।
দুই অ্যাথলেটের ভিন্ন দুই ভেন্যুতে নামার আগেই বিশ্ব মিডিয়ায় শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে চার দশকে অলিম্পিক থেকে বাংলাদেশের খালি হাতে ফেরার সংবাদ; যা দেশের প্রত্যেক মানুষের জন্যই ভীষণ লজ্জার। সেই লজ্জার হাত থেকে ইমরান ও সোনিয়া দেশকে রক্ষা করবেন এমনটা আশা করাই ঠিক নয়। ট্র্যাক ও পুলের দ্রুততম মানব-মানবী নির্ধারণের দুই ইভেন্টে বাংলাদেশের দুই প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সংস্থার দয়া-দাক্ষিণ্যে। তারা পারেননি যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে প্যারিসে যেতে। তাদের দুজনের সেরা টাইমিং প্রথম ধাপ পেরিয়ে যাওয়ার আশা জোগাচ্ছে না।
যুক্তরাজ্য থেকে উড়ে এসে বারবার জাতীয় পর্যায়ে সেরা হচ্ছেন ৩০ বছরের ইমরানুর। গত বছর যুক্তরাজ্যে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস অনুমোদিত এক প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটারে ১০.১১তে দৌড়ে গড়েন নয়া জাতীয় রেকর্ড; যা তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল গত বছর এশিয়াডে ভালো করার। সেটা হয়নি। তবে অলিম্পিকে তিনি চাইবেন নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে। ছাড়িয়ে যাওয়া মানে প্রিলিমিনারি রাউন্ড থেকে তাকে পৌঁছাতে হবে প্রথম রাউন্ডে। ছয়টি হিটে নিজেদের সামর্থ্য দেখাবেন সারা দুনিয়ার নিচের সারির স্প্রিন্টাররা। ইমরান আছেন ৬ নম্বর হিটে। গত বছর এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে ৬০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। তবে ১০০ মিটারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। তাই তাকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। যদিও ইমরান খুব করে চাইছেন প্রথম ধাপ পেরিয়ে যেতে। যুক্তরাজ্য থেকে কোচ এবং ফিজিওকে সঙ্গী করে সরাসরি প্যারিসে গেছেন তিনি। এক সপ্তাহ সেখানেই নিজেকে ঝালিয়ে নিয়েছেন। প্রথমবারের মতো অলিম্পিকের ট্র্যাকে দৌড়ানোর রোমাঞ্চের কথা প্রথমে বললেন ইমরান, ‘খুবই রোমাঞ্চিত আমি। ট্র্যাকে নামতে মুখিয়ে আছি। চেষ্টা করব প্রিলিমিনারি থেকে পরের রাউন্ডে পা রাখতে এবং সেখান থেকেও এগিয়ে যেতে। অনুশীলন ঠিকঠাক হয়েছে। প্রস্তুতি ও সবকিছু নিয়ে কোচের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে, কোচও এখন এখানে আছেন। এখানে আমার লক্ষ্য যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাওয়া। সেটাই সবার লক্ষ্য থাকে। প্রতিটি রাউন্ড ধরে এগোতে চাই। একটিতে সফল হলে পরেরটিতে তাকাতে চাই।’
সোনিয়া প্যারিসে গেছেন সাঁতারের বিশ্ব সংস্থা ফিনার দেওয়া ওয়াইল্ড কার্ড নিয়ে। গত বছর এশিয়ান গেমসে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে নিজের ক্যারিয়ার সেরা টাইমিং গড়েন এই সাঁতারু। ৩০.১১ সেকেন্ড টাইমিংটাকে প্যারিসে পেছনে ফেলতে পারলেই লক্ষ্য পূরণ হবে তার। ৩ নম্বর হিটে ঝাঁপাবেন সোনিয়া। প্যারিস অলিম্পিকে অংশ নেওয়া আরেক সাঁতারু সামিউল ইসলাম রাফি নিজের সেরা টাইমিং গড়ায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন সোনিয়া। শুক্রবার গেমস ভিলেজে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘নিজের টাইমিং আরও একটু কমিয়ে আনাই প্রধান লক্ষ্য। মাত্র দেড় মাসের অনুশীলনে অলিম্পিকে এসেছি। আপনারাও জানেন, এখানে কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। তবে সেটা না ভেবে আমার লক্ষ্য ক্যারিয়ারসেরা টাইমিং করা।’ সোনিয়ার অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি
থাকলেও সামিউল এসেছিলেন রাশিয়ান কোচের অধীনে থাইল্যান্ডে প্রায় সাত মাসের ট্রেনিং নিয়ে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সোনিয়া বলেন, ‘রাফি থাইল্যান্ডে উন্নত প্রশিক্ষণে আছে। সেখানে ট্রেনিংয়ের ফল এখানে পেয়েছে। আমি তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ভালো করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। দেখা যাক কতটুকু কী করতে পারি।’ দেশের সাঁতারুদের দুরবস্থাটাও প্যারিসে গিয়ে ভালোই টের পাচ্ছেন সোনিয়া, এখানে যারা ভালো সাঁতারু এসেছেন, তাদের সবারই আলাদা সাঁতারের সরঞ্জামাদি আছে। এ ছাড়া আছে নিজস্ব ম্যাসেজম্যান। আমরা তো এসব কল্পনাও করতে পারি না। তারপরও সবাই শুধু সাফল্য চায়। আমরা কীভাবে লড়াই করব তা কতজন জানে? তারপরও আমি চেষ্টা করব ভালো কিছু করার।’
ইমরান, সোনিয়ার পরীক্ষার আগে বাংলাদেশের হয়ে তিন ইভেন্টে তিন ক্রীড়াবিদ প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শুটার রবিউল ইসলাম নিজের সেরার কাছাকাছিও যেতে পারেননি। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের বাছাইয়ে ৬২৪.২ স্কোর গড়ে ৪৯ জনের মধ্যে তিনি হন ৪৩তম। অথচ তার সেরা স্কোর ছিল ৬২৮। ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারের হিটে সামিউল ইসলাম ৫৩.১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে ৭৯ জনের মধ্যে হন ৬৯তম। এটা এই ইভেন্টে তার সেরা টাইমিং। আগের টাইমিং ছিল ৫৩.১৩ সেকেন্ড। বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়াবিদ হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করে প্যারিসে গিয়েছিলেন আরচার সাগর ইসলাম। রিকার্ভ একক ইভেন্টে র্যাংকিং রাউন্ডে হন ৬৫২ স্কোরে ৬৪ জনের মধ্যে ৪৫তম। তাতে নকআউট পর্বে তিনি পান কঠিন প্রতিপক্ষ। র্যাংকিং রাউন্ডে ২০তম হওয়া গত অলিম্পিকের রুপাজয়ী ইতালির মাউরো নেসপোলির কাছে ফুঁৎকারে উড়ে যান সাগর। ৬-০ সেট পয়েন্টে হারে শেষ হয় সাগরের এবারের অলিম্পিক যাত্রা। আজ অভাবনীয় কিছু না ঘটলে বিদায়ঘণ্টা বেজে যাবে সোনিয়া ও ইমরানেরও। কারণ অলিম্পিকের সোনাজয়ীদের সঙ্গে তাদের টাইমিংয়ের পার্থক্যাটা প্যারিস থেকে ঢাকার দূরত্বের মতোই!
