মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালিগঙ্গা, ইছামতী ও পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর পানি কমলেও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত দুই সপ্তাহে ভাঙনে অর্ধশত বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ছয় স্পটে ভাঙনরোধে প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে উপজেলার কুস্তা, বেগুননারচী, শ্রীধরনগর গ্রামের কমপক্ষে আটটি পরিবার ঘরের চালা, আসবাবপত্র, গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। এই গ্রামগুলোয় গত এক সপ্তাহে নদীতে বিলীন হয়েছে আরও ১২টি পরিবারের ঘরবাড়ি। ভিটেমাটিহারা মানুষ আশ্রয় নিয়েছে স্বজনের বাড়িতে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ঘরবাড়ির মানুষজন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
এদিকে উপজেলার জাবরা, তরা, উত্তর তরা ও নকীব বাড়ি এলাকার অন্তত ২০টি বসতবাড়ি, দুই কিলোমিটার রাস্তা ও ফসলি জমি কালিগঙ্গা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে। ইছামতী নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে ২০০ বছরের প্রাচীন ঘিওর হাট ও বাসুদেব বাড়ি এলাকা।
কুস্তা গ্রামের প্রবীণ মনির উদ্দিন জানান, গত এক সপ্তাহে তার ২০ শতাংশ বসতভিটা ধলেশ্বরী নদীতে চলে গেছে। আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেলেও অন্তত ভিটেমাটিটুকু অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু নদীর ভাঙনে সবকিছুই শেষ হয়ে যায়।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কুশুন্ডা গ্রামের সামেলা বেগম বলেন, ‘সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি বাড়ির উঠানের অর্ধেক নদীতে নিয়ে চলে গেছে। দুটি ঘর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছি। আমাদের গ্রামের আরও কয়েক বাড়িতে ভাঙন লেগেছে।’
উপজেলার পয়লা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও শ্রীধরনগর গ্রামের মন্টু মিয়া বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে নদীভাঙনে আমাদের গ্রাম একেবারে ছোট হয়ে গেছে। ভাঙনরোধে বিভিন্ন দপ্তরে অনেক ঘোরাঘুরি করলেও কোনো লাভ হয়নি। এবার এমপি সাহেব সরেজমিনে এসে দেখে কথা দিয়েছিলেন, কাজ শুরু হবে। যথাসময়েই ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলে এলাকাবাসীর উপকার করেছেন। আরও কিছু অংশে জিওব্যাগ ফেললে একটি গ্রাম-নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে।’
এদিকে গত শুক্রবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের এমপি সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ। এর আগের সপ্তাহে উপজেলার সিংজুরী ইউনিয়নের নিন্দাপাড়া এলাকায় ভাঙনকবলিতদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি। তার উদ্যোগেই নদীপাড়ের ছয়টি স্থানে ভাঙনরোধে কাজ শুরু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বর্ষার শুরুতেই ধলেশ্বরী, ইছামতী ও কালীগঙ্গা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে উপজেলার শ্রীধরনগর, নকিববাড়ী, কুস্তা, নারচী, বেগুননারচী, বাসুদেববাড়ী, শোলাকুড়িয়া, ঘিওর গরুহাটা ও তরা এলাকা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে এসব এলাকার ফসলি জমি, বসতবাড়ি, বাজার, স্থাপনা ও বিদ্যুতের খুঁটি।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙনরোধে প্রায় ২ কোটি টাকার প্রকল্পে ৪০ হাজার জিওব্যাগ ফেলা ও গাইড বাউন্ডারির নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। চলমান কাজ শেষ হলে ভাঙনরোধ হবে বলে আশা করছি।’
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার কয়েকটি ভাঙনকবলিত স্পটে জিওব্যাগ ফেলা শুরু হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে স্থানীয় এমপি সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ বলেন, ‘ঘিওর-দৌলতপুর ও শিবালয় নদী ভাঙনকবলিত উপজেলা। প্রতিবছরই নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয় শত শত পরিবার। বিষয়টি আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলাম। ভাঙনরোধে কয়েকটি পর্যায়ে ৪০ হাজার জিওব্যাগ ফেলাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কাজগুলো শেষ হলে নদী ভাঙনের কবল থেকে কয়েক হাজার পরিবার রক্ষা পাবে।’
