পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার তারিক আলির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ পুরনো এবং তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়ে তিনি ঢাকাতে ছিলেন। ওই প্রসঙ্গে আসার আগে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থান ও তৎপরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনা পরম্পরা এবং নাটকীয়তার নানা পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকে পোস্ট করা তার এই চিঠিটি খুবই গুরুত্ব বহন করে।
চিঠির প্রসঙ্গে আসার আগে, অনেকে জানলেও, নতুন পাঠকদের জন্য সংক্ষেপে তারিক আলির পরিচয় আবার জেনে নেওয়া যাক। তারিক আলী ষাটের দশক থেকেই আন্তর্জাতিক বামপন্থিদের নেতৃত্বস্থানে রয়েছেন। প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকায় লিখছেন সত্তরের দশক থেকে। দীর্ঘদিন ধরে লেফট রিভিউ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। জন্ম ১৯৪৩ সালে, পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। বাল্যকালেই তিনি পাকিস্তানি সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে জড়িত হন। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় চলে যান ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে। সেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি তিনি অক্সফোর্ডের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে বার্ট্রান্ড রাসেলের নেতৃত্বে গঠিত ভিয়েতনাম যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। ১৯৬৮ সালে লন্ডনের মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও মিছিলে নেতৃত্ব দেন। তারিক আলির গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান: মিলিটারি রুল অ্যান্ড পিপলস পাওয়ার, বুশ ইন ব্যাবিলন, স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ারস, ক্ল্যাশ অব ফান্ডামেন্টালিজমস। তার ইসলাম চতুষ্টয় সিরিজের প্রথম উপন্যাস শ্যাডোজ আন্ডার পমেগ্রানাটে ট্রি জার্মানিতে বেস্ট সেলার হয়। লিখেছেন রুশ বিপ্লবের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য।
এবার আসা যাক ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি’ প্রসঙ্গে। তিনি শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের কমরেড এবং বন্ধুরা বলে সম্বোধন করে চিঠিটি শুরু করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দুর্নীতিপরায়ণ প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাতে এই অসাধারণ বিজয়ে আপনাদের অভিনন্দন। প্রতিবাদী জনগণ একবার যখন মৃত্যু ভয় ভুলে যায়, তখন যে কোনো কিছুই হতে পারে, তখন অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রের অন্য শক্তিগুলোর মধ্যে। তখন ওই কোণঠাসা দুর্নীতিপরায়ণ নেতার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’
তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে খুব বন্ধুত্বসুলভ অভ্যর্থনা পাননি শেখ হাসিনা। মোদি যাকে এতদিন ‘আমাদের বোন’ বলে সম্বোধন করতেন, তিনি খুব দায়সারা আচরণ করেছেন।’ এই আচরণের কারণ অল্প কথায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশে যারা ভারতের এজেন্ট রয়েছেন, তারা মনে করছেন ‘আওয়ামী লীগ আপাতত শেষ। ব্রিটেন হাসিনাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি।’
চিঠিতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা, আপনাদের সাহস এবং ধৈর্যের কারণেই আপনাদের এই বিজয়।’ তিনি শিক্ষার্থীদের পরামর্শও দিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিশ্বাস করতে মানা করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘তথাকথিত বিরোধী দলগুলোকেও বিশ্বাস করবেন না। তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নিজেদের শক্তির ওপর আস্থা রাখুন। এমন একটি জনপ্রিয় পরিষদ তৈরি করুন যেখানে আপনাদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধি থাকবে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিপ্লব এখনো শেষ হয়নি। যদি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা হয়, তবে আপনারাই যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকেন সেই দাবি তোলেন। যদি তারা এতে রাজি না হয়, তাহলে আবারও রাজপথে নামুন। এ এক ঐতিহাসিক বিজয়। আপনাদের কাছ থেকে কেউ যেন এ বিজয় ছিনিয়ে নিতে না পারে।’
এবার বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্কটা একটু তার নিজের কথাতেই জেনে নিতে পারি আমরা। ২০১৪ সালে আগস্ট মাসে তিনি বাংলাদেশে এলে লেখক, সাংবাদিক ও কবি ফারুক ওয়াসিফকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। প্রথম আলোতে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি এক প্রশ্নের জবাবে জানান, “১৯৬৯-৭০ সালে যখন আমি ঢাকায় ছিলাম, তখন এখানে শক্তিশালী আশাবাদ দেখেছি। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জনসভায় আমিই প্রথম স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বলেছিলাম, ‘স্বায়ত্তশাসন তোমাদের কিছুই দেবে না, তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকেই যাওয়া উচিত। নইলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।’ এটাই আমি বলেছিলাম। সাংবাদিকরা এতই নার্ভাস হয়েছিল শুনে, তারা আমার বক্তৃতার পুরোটা প্রকাশ করেনি। কিন্তু কথাটা শেখ মুজিবের কানে গিয়েছিল এবং তিনি সন্ধ্যায় তার বাসায় দেখা করতে বললেন। সেখানে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি শুনেছি তুমি কী বলেছ। কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত, তুমি কি নিশ্চিত?’ আমি বললাম, ‘আমি নিশ্চিত। আমি পাকিস্তানি শাসকদের ভালো করে জানি। তারা তোমাদের ধ্বংস করবে। তোমাদের প্রস্তুত থাকা দরকার, সে জন্যই আমি এটা বলেছি। তারা স্বায়ত্তশাসন দেবে না, তারা ছয় দফা মানবে না। তোমাদের স্বাধীনতার দিকেই যাওয়া উচিত।’ কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে একদমই একমত হলেন না।”
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদেরও আশা ছিল, বাংলাদেশ মুক্তিকামী প্রগতিশীল রাষ্ট্র হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তা হয়নি।’ কেন হয়নি জানতে চাইলে তারিক আলি বলেন, ‘বলতেই হচ্ছে, এর কারণ সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের একের পর এক ভুল। তারা একদলীয় রাষ্ট্র গঠন করেছিল, কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু করেছিল। মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করেছিল, ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করছিল।’ তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, যে রাজনীতিবিদরা জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেন না, মানুষ তাদের জন্য আর জীবন দেয় না।’
গ্রন্থনা : সাঈদ জুবেরী
