বাংলাদেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল। এর মধ্যে বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত বিশেষভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ভারতের পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষণের নীতি অনুসরণ করবে ভারত। পাশাপাশি দেশটি সেনাবাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখবে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতে ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে।
ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সর্বদলীয় বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে ভারতের নয়াদিল্লির গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। পরে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনার সঙ্গে সেখানে বৈঠক করেন। সেদিন কোনো বিষয় স্পষ্ট না করলেও শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার এক দিন পর গতকাল এ বিষয়ে ভারত তাদের অবস্থান জানাল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সর্বদলীয় বৈঠকে জয়শঙ্কর বাংলাদেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্য কোনো দেশ হস্তক্ষেপ করলে কী নীতি গ্রহণ করা হবে, সে বিষয়ও উঠে আসে আলোচনায়।
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বৈঠকে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানতে চান, বাংলাদেশ ইস্যুতে বাইরের কোনো গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে সরকারের কাছে তথ্য আছে কি না। জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত সরকারের কাছে শুধু এ তথ্য আছে যে পাকিস্তানের কূটনীতিকরা বিক্ষোভের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেছেন।
বৈঠকে রাহুল গান্ধী ছাড়াও কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা কে সি ভানুগোপাল, জনতা দলের লাল্লান সিং, সমাজবাদী পার্টির রাম গোপাল যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের সুদ্বীপ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়ে এস জয়শঙ্কর বলেন, খুবই অল্প সময়ের নোটিসে, অল্প সময় অবস্থানের জন্য শেখ হাসিনা ভারতে আসার অনুমতি চান।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, বৈঠকে জয়শঙ্কর বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতে ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, শেখ হাসিনাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জড়িত থাকতে পারে।’
জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সোমবার সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই ভাষণে সেনাপ্রধান বলেছিলেন, ‘আমি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি... আমরা একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের বিষয়ে এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জয়শঙ্কর বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো বিকাশমান। আমরা আমাদের কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক যোগাযোগে রয়েছি। সেখানে আনুমানিক ১৯ হাজার ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ছাত্র। জুলাইয়ে অধিকাংশ ছাত্র দেশে ফিরে এসেছেন।’
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগণের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও সুস্থতার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ পর্যালোচনা করছি। আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন থাকব।’
জয়শঙ্কর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা এবং সিলেটের ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা আশা করি বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান করবে।’
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশের উদ্বেগের কারণে মেঘালয়ে ১২ ঘণ্টার রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতার মধ্যে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকার কথা জানাল যুক্তরাষ্ট্র : প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের পাশে আছে। এ ছাড়া আরও সহিংসতা পরিহারের বিষয়ে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে দুঃখিত বলেও জানানো হয়েছে। দেশটির স্থানীয় সময় সোমবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার।
মিলার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পদ থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ত্যাগের ঘোষণা আমরা দেখেছি। আমরা সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা সব পক্ষকে আরও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আমরা সামনের দিনগুলোতে সবাইকে শান্ত ও সংযমের আহ্বান জানাই। আমরা একটি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণাকে স্বাগত জানাই এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পন্নের আহ্বান জানাই।’
মিলার বলেন, ‘পরিশেষে এই সপ্তাহান্তে এবং গত সপ্তাহে মানবাধিকার লঙ্ঘন, হতাহতের ঘটনা এবং আহতের রিপোর্টে আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন এবং যারা কষ্ট পাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমরা আমাদের গভীর সমবেদনা জানাই।’
দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার আশাবাদ চীনের : বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের কাছে গতকাল প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং কৌশলগত সহযোগী হিসেবে চীন আশা করে বাংলাদেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় ইইউ রাষ্ট্রদূতদের উদ্বেগ : ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মিশনগুলোর রাষ্ট্রদূতরা সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উপাসনালয় এবং লোকজনের ওপর হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তারা চলমান ছাত্র আন্দোলনে যুক্তদের পাশাপাশি অন্যরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে ঢাকায় ইইউ দূতাবাস এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেছে। ইইউ দূতাবাসের পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মিশনের রাষ্ট্রদূতরা সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উপাসনালয় ও লোকজনের ওপর হামলার খবরে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা চলমান ছাত্র আন্দোলনে যুক্তদের পাশাপাশি অন্যরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাকে স্বাগত জানাই।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা বলেছেন, ‘আমরা জরুরি ভিত্তিতে সংযত থাকতে, সব ধরনের ধর্মীয় সহিংসতা এড়াতে ও মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সব বাংলাদেশিকে আহ্বান জানাই।’
ঢাকায় এই মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাস ছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসের দূতাবাস রয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় মার্কিন দূতাবাসের উদ্বেগ : বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। গতকাল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক সামান্থা পাওয়ারের এক্স হ্যান্ডেলে করা একটি পোস্ট শেয়ার করে এই উদ্বেগের কথা জানায় মার্কিন দূতাবাস। মার্কিন দূতাবাসের পোস্টে বলা হয়, ‘ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস শান্তি ও সংযমের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অব্যাহত রাখবে।’
সামান্থা পাওয়ার তার এক্স হ্যান্ডেলে করা পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে সব দলের গণতান্ত্রিক নীতি, আইনের শাসন এবং জনগণের অভিপ্রায়কে সমুন্নত রাখা জরুরি। বাংলাদেশে শান্তি পুনরুদ্ধার এবং মানবাধিকার রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
