এক : ফ্যাসিবাদী সরকারের তুলকালাম দম্ভের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার তুমুল দ্রোহ আবারও সত্য হয়েছে। এটিই ঐতিহাসিক বিজ্ঞান। বাহাদুরির বিপরীতে জনতার রক্তদাগ ইতিহাসের দিনলিপিতে সর্বদা টগবগ হয়ে থাকে। হুল, হাতিখেদা, উলগুলান, তেভাগা, নানকা, টংক, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪-এর রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সাহসী আত্মপরিচয়ের দলিল। বিপ্লবী এই গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়ে আমরা ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ময়দানে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশ জুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে চলা হামলা, লুটপাট ও সহিংসতায় আমরা ক্রমশই উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নস্থল, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চল, শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য, জাদুঘর, শিল্পীর বাড়ি, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সংগ্রহশালা আক্রান্ত হচ্ছে। যে বা যারা এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত তারা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানবিরোধী। তাই দেশের নানা স্থানে ছাত্র-জনতাই জানবাজি রেখে এসব সহিংসতা রুখে দাঁড়াচ্ছে।
আমরা উদ্বিগ্ন যখন নিদারুণভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসী সমাজে প্রশ্নহীন হামলা হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই জনতার বাংলাদেশে আদিবাসীরা এসব সহিংসতাকে পাঠ করতে পারছেন না। কারণ আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হলো, নির্বাচন কিংবা যেকোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে তাদের ওপর অন্যায় বলপ্রয়োগ ও হামলা হয়। খুন, লুটপাট, উচ্ছেদ ও ধর্ষণ ঘটে। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে, আদিবাসীরা সংবিধানমতে তাদের জন্য কোটা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন সেটি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী জুলুমের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আদিবাসীদের উচ্চারণগুলোও শামিল হয়েছে। ঠিক যেভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে কিংবা কৃষক আন্দোলন কি মুক্তিযুদ্ধে দেশের আদিবাসী জাগ্রত ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর আদিবাসীরা কোনো শঙ্কা করেননি, চির বঞ্চনা থেকে মুক্তির দিশা খুঁজেছিলেন। কিন্তু যখন একের পর এক দেশ জুড়ে আদিবাসী বসতিতে হামলা ও লুটপাট শুরু হয় তখন আদিবাসী অন্তর আবারও চুরমার হয়েছে। দেশের আদিবাসীরা কার্যত ভূমিহীন গরিব নিম্নবর্গ। বিগত সময়ের রাষ্ট্রীয় অবিচার ও জুলুমের দাগ প্রতি আদিবাসী জনপদ ও শরীরে প্রশ্নহীন ক্ষত হয়ে আছে। আদিবাসী বসতিতে হামলার এক অন্যতম উদ্দেশ্য ভূমি দখল ও উচ্ছেদ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা কোনোভাবেই আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কোনো অন্যায়-সহিংসতা মানতে পারি না।
এবার অবিস্মরণীয় কিছু ঘটনাও ঘটছে। ছাত্র-জনতা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, স্থানীয় প্রতিবেশী সবাই মিলে জানমাল সুরক্ষায় সচেষ্ট হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন, দূতাবাস এবং গণমাধ্যম ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়কে বহুবার উল্লেখ করেছে। কিন্তু তারপরও পাহাড় কি সমতলে আদিবাসী জনমনে শঙ্কা কাটছে না। বরেন্দ্র, মধুপুর গড়, পাহাড় কী চা-বাগানে এক প্রশ্নহীন নিরাপত্তাহীনতার বোধ আদিবাসী সমাজে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে আদিবাসীরা মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচবেন এই আশাতেও আমরা মিছিলে মিশেছি। কিন্তু জানি ফ্যাসিবাদী সরকার বিদায় হলেও, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিলোপ না হলে সবার জন্য মানবিক মর্যাদা অর্জিত হবে না। আশা করি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে আদিবাসী অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করবেন। যেভাবে ফ্যাসিবাদী বারুদ-বাহাদুরির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা জানবাজি রেখে দাঁড়িয়েছে, আশা করি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমালের সুরক্ষায় ছাত্র-জনতাই সামাজিক ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। দেশের সবপ্রান্তে এই সুরক্ষা ঢালকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। এসব হামলার তদন্ত ও বিচার করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
দুই : আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগণের নিরাপত্তা চেয়ে সমতলের আদিবাসীদের বৃহত্তর জনসংগঠন ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’ একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর জেলায় আদিবাসীদের ওপর হামলা, স্থাপনা ভাঙচুর, সম্পদ লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং আদিবাসীসহ সংখ্যালঘু জনগণের মনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।’ আদিবাসীদের এই নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতাকে আগের কোনো সরকার গুরুত্ব দেয়নি। বরং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক খনন, ইকোপার্ক, বিনোদনকেন্দ্রের নামে আদিবাসী জনপদ ছিন্ন ভিন্ন করা হয়েছে। মধুপুর শালবনে ইকোপার্কের নামে পীরেন স্নালকে খুন করা হয়েছে। পাহাড় থেকে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ করা হয়েছে। দিনাজপুরে স্বপ্নপুরী বিনোদনপার্ক কিংবা শেরপুরে গজনী অবকাশকেন্দ্রের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। চিম্বুক পাহাড়ে ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণের পাঁয়তারা করা হয়েছে। উপকূলে রাখাইন জনপদ নানাভাবে জবরদখল করা হয়েছে। নওগাঁতে ভূমি দখলের জন্য আলফ্রেড সরেনকে হত্যা করা হয়েছে। আজ ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মিছিলে দাঁড়িয়ে আমরা সেসব নির্দয় ক্ষত থেকে শক্তি নিয়ে শঙ্কিত আদিবাসী জনপদ আগলে দাঁড়ানো অতি জরুরি বলে মনে করছি। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ছাত্র-জনতার নেতৃত্ব আমাদের এক বহুত্ববাদী রূপান্তরের আওয়াজ দেবে।
তিন : নওগাঁর নিয়ামতপুরের নিয়ামতপুর ইউনিয়নের ঝাঁঝিরা এক প্রাচীন ওঁরাও গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় ৭০ পরিবার বসবাস করে। এই গ্রামের ভূমিহীন গরিব আদিবাসীরা মূলত কৃষিমজুর। আদিবাসী ঘরগুলো তো আর লুটেরা রাজনীতিকের প্রাসাদ নয়; ধান, বীজ আর কিছু কৃষিজ উপকরণই সম্বল। দুর্বৃত্তরা ঘরে আগুন দিয়ে ধান লুট করে। রাজশাহীর তানোরের সিন্দুকাই সাঁওতাল পাড়ায় ঘর ভেঙে দিয়ে জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার ভয় দেখায়। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ইদলপুর গ্রাম থেকে দুর্বৃত্তরা গরু, ছাগল, ভেড়া লুট করে নিয়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরার টংপাড়ায় আদিবাসীদের ১২ বিঘা পুকুরের মাছ লুট করে দুর্বৃত্তরা। দিনাজপুরের বিরলের ধামইর ইউনিয়নের পিপল্লা গুচ্ছ গ্রামে ৫০ সাঁওতাল পরিবারের বাস। দুর্বৃত্তরা আদিবাসীদের মাটি ও বেড়ার ঘরগুলো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। নওগাঁর ধামইরহাটের আগ্রাদ্বিগুণের খেলনা ইউনিয়নের কাউয়াকুড়ি গ্রামে ২০০ ওঁরাও ও মুন্ডা পরিবারের বসবাস। সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দুর্বৃত্তদের হামলায় গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুরা আতঙ্কে আছেন। মৌলভীবাজারের চাম্পারায় চা-বাগানেও হামলা হয়েছে। হামলায় ভূমিহীন আদিবাসী নিম্নবর্গের যাই পুড়েছে, যা-ই লুট হয়েছে তাই-ই তার সর্বোচ্চ সম্পদ। দিন-রাত রক্ত জল করা কৃষিকাজ করে আবার হয়তো আদিবাসী মানুষেরা কিছু ধান বা একটা ছাউনির ঘর তুলবেন, কিন্তু মনের গভীরে দগদগে হয়ে থাকা দাগ সারবে কীভাবে? ছাত্র-জনতার সামাজিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে অবশ্যই এই দাগ মোচনের উপায় খুঁজতে হবে। আর সেটি হয়তো এক দীর্ঘমেয়াদি বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রশ্ন। কিন্তু তার আগে কিছু মধ্যমেয়াদি কাজ আছে। আর সবকিছুর আগে এখন এই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী টালমাটাল অস্থির প্রশাসনবিহীন সময়ে দরকার আদিবাসী জনগণের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা। ছাত্র-জনতার সামাজিক সুরক্ষা ঢালকে মজবুতকরণের ভেতর দিয়েই একমাত্র এটি সামাল দেওয়া সম্ভব।
চার : ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬,৫০,১৫৯ জন এবং জাতিসত্তা ৫০। দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.২ ভাগ। চলতি লেখায় ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টিই ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এই আত্মপরিচয়ের দাবিতে আদিবাসীদের সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকার আদিবাসীদের আত্মপরিচয়কে কোনো মর্যাদা দেয়নি। বরং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃগোষ্ঠী’ শব্দগুলো আদিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সংবিধানে না থাকলে সরকারি প্রকল্প এবং কর্তৃপক্ষ সর্বক্ষেত্রে ‘ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী’ শব্দটির একতরফা বহুল ব্যবহার করেছে। নানা সময়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বাংলাদেশে কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা, মুন্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও লালেং এই ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষা বিপন্ন। কিন্তু রাষ্ট্র বিপন্ন মাতৃভাষা সুরক্ষায় কোনো কার্যকর অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। বরং এমনসব বলপ্রয়োগ বহাল রেখেছিল, যা আদিবাসীদের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অধিকার রক্তাক্ত করেছিল। যদিও আদিবাসী অধিকারের সঙ্গে জড়িত এমনতর সহস্র অমীমাংসিত বিষয় এই লেখার লক্ষ্য নয়। ‘আদিবাসী অধিকার সম্পর্কিত রূপান্তরের রূপরেখা’ নিয়ে পরবর্তী সময় বিস্তারিত আলাপের ইচ্ছা আছে। যা হয়তো আমাদের সামগ্রিক রূপান্তরকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। আমরা মনে করি, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই অস্থির অনিরাপদ সময়ে যত দ্রুত গ্রহণযোগ্য সংবেদনশীল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়ে কাজ শুরু করবে ততই সবার জন্য মঙ্গল।
পাঁচ : গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, দম্ভ এবং দোর্দ- ক্ষমতার অবসান ঘটেছে। দশের দুর্বিনীত দম ও দ্রোহের বিজয় হয়েছে। দেশের নয়া সামাজিক রূপান্তরে নিজেদের স্বর ও স্বপ্নগুলোকে মেলানোর জন্য আদিবাসীরাও অপেক্ষা করছে। গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকের মতো আয়নাঘর থেকে মাইকেল চাকমারও মুক্তি মিলেছে। হয়তো চাপা পড়া, দাবিয়ে রাখা, বিক্ষত, আদিবাসী আওয়াজগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হবে এই নতুন জমানায়। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে বাংলাদেশের নয়া রূপান্তর প্রক্রিয়ায়। বান্দরবানের লামার সরইপাহাড়ে রাবার কোম্পানি ম্রোদের সবকিছু পুড়িয়ে, ঝিরিতে বিষ দিয়ে উচ্ছেদ করতে চেয়েছে বারবার। মৌলভীবাজারের খাসিপুঞ্জির গাছ ও পানজুম কেটে বাঙালি দুর্বৃত্তরা নানা অনাচার জিইয়ে রেখেছে। মধুপুর শালবনে জোর করে চাষের জমিতে একটা একটা লেক খনন করতে চেয়েছে বন বিভাগ। গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে আদিবাসীদের জমি কেড়ে রেখেছে রাষ্ট্র। দেশের নদী, পাহাড় অঞ্চলের আদিবাসী নাম বদলে দেওয়া হয়েছে জোর জবরদস্তি করে। নিরাপত্তার নামে বান্দরবানের বম গ্রামে কত তল্লাশি চলেছে। সেচের পানি না পেয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে দুই সাঁওতাল কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। চা-বাগানে জোর করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে দাসপ্রথা। সুন্দরবনে মুন্ডাদের কৃষিজমে দখলের জন্য খুনখারাবি হয়েছে। বিচার হয়নি গীদিতা রেমা, অবিনাশ মুড়া, সত্যবান হাজং কিংবা নরেন্দ্র মুন্ডা হত্যার। আদিবাসী জীবন ও জনপদ জুড়ে এমনই বঞ্চনা আর বৈষম্যের দাগ। এসব বঞ্চনা ও বাহাদুরিকে প্রশ্ন করতে হবে।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার লড়াই আমাদের সাহসী করে তুলে। আমরা আশা করব, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন ও প্রকৃতির সুরক্ষায় ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিস্তৃত ও জোরালো হবে। পাড়ায় পাড়ায় আদিবাসী-বাঙালি দল তৈরি করে দায়িত্ব বণ্টন করা যেতে পারে। দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, দায়িত্বশীল প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে যেসব দুর্বৃত্তের মাধ্যমে আদিবাসীদের ওপর হামলা হচ্ছে তা রোধে কেবল আইন বা শাসন নয়, দরকার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণ। ছাত্র-জনতার রূপান্তরের রূপরেখায় এই দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে আশা করি। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে হবিগঞ্জের আমরাইলছড়া চা-বাগানে ম্যানেজার কর্তৃক নারী চা-শ্রমিকের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারী চা-শ্রমিকরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেছিল শক্তিশালী জন-আন্দোলন। এবারও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজশাহীর সিন্দুকাই সাঁওতাল পাড়ায় যখন দুর্বৃত্তরা হামলা করে তখন নারী-পুরুষরা একত্রিত হয়ে তাদের রুখে দাঁড়ান। মানুষের ঐক্যবদ্ধ দস্তখতের সামনে সব দোর্দ- প্রতাপই মিথ্যা হয়ে যায়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানও তাই প্রমাণ করেছে। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগণের জানমালকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বিস্তৃত করে ছাত্র-জনতার শক্তি দ্রোহী হয়ে থাকুক।
লেখক: গবেষক ও লেখক
