কাশিমপুর থেকে পালাল ২০৯ বন্দি, গুলিতে নিহত ৬

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৪৮ এএম

গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বিক্ষোভের সময় কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ বন্দি পালিয়ে গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের এ ঘটনার সময় গুলি ছোড়েন কারারক্ষীরা। এতে ছয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের তিন সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের হামলায় অন্তত ৩০ কারারক্ষী আহত হয়েছেন। কারাগারটির সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা বন্দি নিহত ও পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের মূল ফটক ভেঙে পালিয়েছেন বেশ কয়েকজন কয়েদি। এ সময় কারারক্ষীদের ওপর হামলা চালান তারা। এতে অন্তত ১৫ কারারক্ষী আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই সেখানে সেনাসদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। কারাগারটির এক কর্মকর্তা জানান, কোনো অস্ত্র বা অন্য কিছু লুট হয়নি। তবে ৩৫ থেকে ৪০ জন কয়েদি পালিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

কাশিমপুর কারাগার থেকে পালানোর সময় গুলিতে নিহতদের লাশ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় কারা কর্র্তৃপক্ষ। নিহতরা হলেন নরসিংদীর রায়পুরা থানার নলভাটা গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে মো. জিন্নাহ (২৯), সিলেটের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার রামেশ্বরপুর এলাকার ইমতিয়াজ পাভেল (২৭), নওগাঁর আসলাম হোসেন (২৭), জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের সোনারপাড়া এলাকার আফজাল হোসেন (৬৩) ও টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার কানুটিয়া এলাকার পন শেখ কালু (৪৫)। নিহত আরেকজন রাধে শ্যাম হরিজন জমাদ্দারের (৬৭) বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরের দিকে কারাগারের বন্দিরা হঠাৎ বিদ্রোহ শুরু করেন। তারা কারাগার থেকে বের হওয়ার জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন এবং কারা ফটক ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারারক্ষীরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে বন্দিরা কারারক্ষীদের ওপর চড়াও হন। এ সময় কারাগারের ২০৯ বন্দি সীমানাপ্রাচীর টপকে পালিয়ে যান এবং গুলিতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়িয়ে মই হিসেবে ব্যবহার করে দেয়াল টপকে পালান বন্দিরা।’

জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে তিনজন জঙ্গি রয়েছেন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে খবর দেওয়া হলে সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহ দমন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

কারাগারের সুপার সুব্রত কুমার বালা জানান, গতকাল সকাল থেকে কাশিমপুর কারাগারে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোস্তাক আহমেদ জানান, রাত ৩টা ৪০ মিনিটে কারাগারের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট আবদুর রহিম একটি ট্রাকে করে ছয়টি লাশ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। নিহতদের সবার শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে। থানা-পুলিশ না থাকায় লাশগুলো হাসপাতালের একটি কক্ষে মেঝেতে রাখা হয়। পরে গতকাল সন্ধ্যায় নিহতের স্বজনরা বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নেওয়ার দাবি জানালে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে পাঁচজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়। স্বজন না আসায় রাধে শ্যাম হরিজন জমাদ্দারের লাশ মর্গে রাখা হয়েছে।

কারাগারে বন্দি নিহতের খবর পেয়ে গতকাল স্বজনরা হাসপাতালে ভিড় করেন। নিহত বন্দি জিন্নাহর ভাই মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আমার ভাই নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন। পরে আমরা তাকে আত্মসমর্পণ করাই। এরপর নরসিংদী থেকে কয়েক দিন আগে তাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়।’

এদিকে ‘রাজনৈতিক মামলার সব আসামিকে মুক্তি দেওয়া হবে’ এমন খবরে বন্দিদের আত্মীয়স্বজনরা মঙ্গলবার সকাল থেকে কাশিমপুর কারাগারের কেন্দ্রীয় কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকে ভিড় করেন। তারা দুপুর ১টার দিকে হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার রাজনৈতিক এবং সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেপ্তার বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য কারা কর্র্তৃপক্ষকে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে কারারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। গুলির শব্দে কারাগারের ভেতরে ও বাইরে বন্দিদের স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সেনাসদস্যরা দ্রুত কারাগারে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

কুষ্টিয়ায় বন্দি বিদ্রোহ : কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দি বিদ্রোহের পর লে. কর্নেল মাহবুব উল আলম শিকদারের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পর লে. কর্নেল মাহবুব উল আলম শিকদার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে কারাগারের সামনে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর খুব দ্রুত বিশাল একটা ফোর্স নিয়ে আসা হয়। ভেতরে থাকা কারারক্ষীরাও ভালো কাজ করেছেন। খুব বেশি কয়েদি বের হয়ে যেতে পারেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। অস্ত্র লুট হয়নি। কারও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।’

জানা গেছে, বেলা আড়াইটার দিকে কারাগারের ভেতরে থাকা বন্দিরা স্লোগান দিয়ে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আসেন। পরে ৫০ থেকে ৬০ জন ভেতরের দরজা টান দিয়ে খুলে ফেলের। এরপর তারা মূল ফটকে এসে কারারক্ষীদের আঘাত করেন ও মূল ফটক ধাক্কাতে থাকেন। একপর্যায়ে ফটক খুলে গেলে দৌড়ে চলে যান। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনা ঘটে যায়। ঘটনার সময় কারারক্ষীরা রাবার বুলেট ছোড়েন। ভেতরে থাকা কারারক্ষী এবং বাইরে থাকা সবাই এসে প্রতিহত করেন।

জেলা কারাগারের সামনে থাকা কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারা বলেন, ঘটনার সময় কারাগারের ভেতর গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। টানা ১০ মিনিট গুলি হচ্ছিল। এ সময়ের মধ্যে বন্দিরা যে যার মতো দৌড়ে পালাতে থাকেন।

জেল সুপার আবদুল বারেক গণমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনায় ৮ থেকে ১০ জন কারারক্ষী আহত হয়েছেন। কতজন বন্দি বের হয়েছেন, তার গণনা চলছে। কারা পালিয়ে গেছেন, তা পরে জানানো হবে। তবে কোনো জঙ্গি বা বড় ধরনের কোনো অপরাধী বের হতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫-৩০ জনের মতো বন্দি পালিয়ে যেতে দেখেছেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত