পুলিশবিহীন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রাম শহরের মানুষ। চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে গত তিন দিন ধরে অনেকেই রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন নিজেদের বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। থানা ও ফাঁড়িতে পুলিশ না থাকার সুযোগে পেশাদার অপরাধীরা মাঠে নেমেছে। গত সোমবার শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর নগরের ৯/১০টি থানায় ভাঙচুর, অস্ত্র লুটপাট করে আগুন দিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে দুর্বৃত্তরা।
আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেশের সব পুলিশ সদস্যকে সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দিলেও এই প্রতিবেদন লেখার সময় বিকাল ৩টার দিকে নগরের থানাগুলোয় পুলিশ যোগদানের খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে গতকাল বুধবার নগর পুলিশের সদর দপ্তর দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে ১১ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেছে দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য। তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে অংশ নিয়েছেন সিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত নগরে চুরি-ডাকাতির বিষয়ে জানতে নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার মোবাইলে কল করলেও তারা ধরেননি।
এদিকে মাঠে পুলিশ না থাকায় গত মঙ্গলবার রাতে নগরের হালিশহর ও খুলশি এলাকায় কিছু সুপারশপ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি এবং লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। তবে দায়িত্বশীল কোনো সূত্র থেকে এসব খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু কিছু এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হলেও থানায় পুলিশ না থাকায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগও দিতে পারছেন না।
এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর জেলার রাউজান উপজেলার জলিল নগর ও নোয়াপাড়ায় এলাকায় দুর্বৃত্তরা জুয়েলারির দোকানে লুটপাট করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নগরের খুলশি ২ নং রোডের বাসিন্দা আমজাদ খান বলেন, ‘সোমবার বিকেল থেকেই এখানকার অনেক বাসিন্দা রাত জেগে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। রাস্তায়, থানায় পুলিশ নেই। চুরি-ডাকাতি হলে অভিযোগ দেওয়ারও সুযোগ নেই। ভাই আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
রাউজানে কর্মরত স্থানীয় এক সংবাদকর্মী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে জানান, সোমবার বিকেলে মুন্সীরঘাটা এলাকায় অবস্থিত ওয়ান ব্যাংকে লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় ব্যাংকে রাখা ২ থেকে ৩ কোটি টাকা দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে যায়। রাউজান প্রেসক্লাব ভবনে তাণ্ডব চালিয়ে নগর ৪০ হাজার টাকা, পাঁচটি ল্যাপটপ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। রাউজান থানায়ও ব্যাপক তাণ্ডব চালায় দুর্বৃত্তরা। থানায় রাখা বেশ কিছু পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে তারা।
এদিকে ডাকাতি ও লুটপাটে অতিষ্ঠ হয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন চট্টগ্রাম শহর ও গ্রাম এলাকার অনেক মানুষ। পুলিশ নেই, অপকর্ম করলে কিছুই হবে না- এমন চিন্তা থেকে দুর্বৃত্তরা যেভাবে পারছে লুটপাট করছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। লুটপাট ও ডাকাতির শিকার হওয়া মানুষ মামলা করবেন বা এই ঘটনা প্রতিহত করবেন- সেটির কোনো উপায় পাচ্ছেন না। তবে কোনো বিপদ হলে নিকটস্থ সেনা ক্যাম্পে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
আজ বৃহস্পতিবার নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব থানাই পুলিশশূন্য। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সতর্ক পাহারা দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা। পুলিশের কার্যক্রম চোখে পড়েনি। রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। নগরের কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও, হালিশহর, পতেঙ্গা, আকবর শাহ, ডবলমুরিং থানাসহ বিভিন্ন থানায় সোমবার বিকাল থেকে রাতভর হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় থানার সামনে থাকা গাড়ি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে কোতোয়ালী থানা কার্যালয়। এই থানায় কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়া সেদিন নগরের হালিশহর সুপার শপ ‘ইয়েলো’ বিভিন্ন শো-রুম, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
নগর পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ৮/৯টি থানায় হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের পর অবস্থা বিবেচনায় কেউ থানায় বা নিজ নিজ কার্যালয়ে থাকা কেউ নিরাপদ মনে করছেন না। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় আত্মগোপনে রয়েছেন। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে জানানো হয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে আনসার বাহিনীর সদস্যদের থানা, বিমানবন্দর ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম সব পুলিশ সদস্যকে নিজ নিজ ইউনিটে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছেন।
অক্ষত মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন
দুর্বৃত্তরা সোমবার বিকেল থেকে রাতভর নগরের ৮/৯টি থানায় র্ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালালেও নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) আলী হোসেনের দৃঢ়তায় দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব থেকে রেহায় পায় মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন। সেদিন অনেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ভয়ে পুলিশ লাইন ছেড়ে গেলেও মূল ফটকে সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্বপালন করেন উপকমিশনার আলী হোসেন।
সিএমপির একটি সূত্র জানায়, মনসুরাবাদ পুলিশ লাইনে আছে ডিবি পুলিশ, কোর্ট পুলিশ এবং রিজার্ভ ফোর্স। সবমিলিয়ে প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য আছেন মনসুরাবাদ পুলিশ লাইনে। সেখানে আছে প্রায় তিন হাজার অস্ত্র এবং বিপুল গোলাবারুদ। আছে অসংখ্য গাড়ি ও আলামত। ‘দুর্বৃত্তরা হামলার চেষ্টা করেও পুলিশের দৃঢ়তায় অক্ষত রয়েছে মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন’ বলেন ডিবির এক কর্মকর্তা।
থানায় ফিরছে পুলিশ, সহযোগিতা করছে মানুষ