বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশ বাহিনী সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার প্রথম বুলেট এই বাহিনীর হাত থেকেই বের হয়েছিল। সেই থেকে শুরু করে যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে, পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, আমরা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা-পুলিশের ওপর আক্রমণ, অস্ত্রাগার লুট এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশে এক ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই অরাজকতার পেছনে থাকা কারণগুলো খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা। আমাদের পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা আজকের এই অবস্থায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের অনৈতিক নির্দেশ পালনের দায়ভার সাধারণ পুলিশ সদস্যদের ওপর এসে পড়েছে। এই দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসাররা যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন নিরীহ পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবন দিয়ে মূল্য পরিশোধ করছে। মনে রাখতে হবে, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। আমরা যদি এই বাহিনীকে ধ্বংস করি, তাহলে সুশাসন ও নিরাপত্তা বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় গণ-ডাকাতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করছে এবং পুলিশের কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। আমরা কি ভাবতে পারি, পুলিশ ছাড়াও একটি আধুনিক রাষ্ট্র কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে?
দেশের ইতিহাসে পুলিশ সবসময়ই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। যখনই দেশে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়েছে, পুলিশ বাহিনী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সংকট মোকাবিলা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, করোনা মহামারীর সময় পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই বাহিনী ছাড়া আমরা কতটা অসহায়। যখন কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল, তখন পুলিশ সদস্যরাই মৃতদেহ সৎকার করেছে, ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে এবং আক্রান্তদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছে। তারা কখনো নিজেদের সুরক্ষার কথা ভাবেনি। অথচ, আজ সেই পুলিশ বাহিনীকেই আমরা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।
আমাদের মনে রাখতে হবে পুলিশ সদস্যরাও আমাদেরই ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান। তারা এই সমাজেরই অংশ এবং তাদের ওপর আক্রমণ মানেই আমাদের নিজেদের ওপর আক্রমণ। প্রথমত, আমরা যদি তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে নিজেরাই কিন্তু নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আসছি। কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাব? এই মুহূর্তে দরকার একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী। রাজনৈতিক দলগুলোর হাত থেকে মুক্ত করতে হবে পুলিশকে, যাতে পেশাদারত্বের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ জন্য পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনৈতিক তোষামোদকারী এবং পদলেহনকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের স্থলে পেশাদার এবং দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ দিতে হবে, যারা দেশের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের পুলিশ বাহিনীর পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি সত্যিই একটি নিরাপদ ও সুশাসিত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে পুলিশকে তার কাজের পরিবেশ দিতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা নিরাপদে এবং নিশ্চিন্তে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। আমরা যদি এই কাজে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশ হিসেবে ব্যর্থ হবো।
মনে রাখা উচিত যে, পুলিশ ছাড়া কোনো দেশ সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, পেশাদার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী। এই বাহিনীই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে এবং একটি সুশাসিত সমাজ গড়ে তুলবে।
তৃতীয়ত, আমাদের সবার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে। যখন কোনো সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ে, তখন সে পুলিশের কাছেই যায়। কিন্তু যদি সেই আস্থা ভেঙে যায়, তাহলে সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের অনেক জায়গায় পুলিশের জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বর মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যখনই কেউ বিপদে পড়ছে, এই নম্বরে কল দিয়ে তারা সাহায্য পাচ্ছে। এই বিশ্বাস এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করা আমাদেরই দায়িত্ব।
সুতরাং, প্রয়োজন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। আসুন, সবাই মিলে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং পুলিশ বাহিনী তাদের দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে পালন করতে পারবে। আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশ চাই, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী গঠন করা। এ জন্য সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা যদি এই সহযোগিতা করতে পারি, তাহলে পুলিশ বাহিনী আবারও তাদের সুনাম পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে এবং দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। চলুন, সেই দিনটির অপেক্ষা না করে আজই আমাদের দায়িত্ব পালন করি এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাই। আসুন, সবাই মিলে একটি নিরাপদ, সুশাসিত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিই। এবার কিন্তু পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার সময় এসেছে।
লেখক : শিক্ষার্থী ও সমন্বয়ক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, চট্টগ্রাম
