জামালপুর জেলা কারাগারে জেলারসহ কারারক্ষীদের জিম্মি করে কারা ফটক ভেঙে পালানোর সময় গুলিতে নিহত হয়েছে ছয় বন্দি। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় শুরু হয়ে এই বন্দি বিদ্রোহ চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। পরে সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন জেলারসহ আরও অন্তত ১৯ জন।
বন্দি বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেও। গতকাল শুক্রবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনেন সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা। এ ঘটনায় এক বন্দি গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন কারারক্ষী আহত হয়েছেন।
জামালপুর কারাগারে বন্দি বিদ্রোহের ঘটনায় নিহতরা হলেন মো. আরমান, মো. রায়হান, শ্যামল, ফজলে রাব্বি ওরফে বাবু, মো. জসিম ও মোহাম্মদ রাহাত। তাদের সবার বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। নিহতদের বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। গতকাল দুপুরে জামালপুর কারাগারের ফটকে বন্দি বিদ্রোহের ঘটনায় সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান কারাগারটির জেলার আবু ফাতাহ।
কারা কর্র্তৃপক্ষ জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক মামলার বন্দি আসামিরা গত কয়েক দিনে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। অন্য মামলার আসামিরা কারাগারে বন্দি রয়েছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে বন্দিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের একটি পক্ষ মুক্তির জন্য বিদ্রোহ করে অন্যপক্ষকে মারধর শুরু করে। পরে বিদ্রোহীপক্ষ দায়িত্বরত কারারক্ষীদের হাত-পা বেঁধে জিম্মি করে। এরপর বিদ্রোহীরা প্রথম গেট দিয়ে জেলারের কক্ষে ঢুকে তাকে প্রধান গেট খুলে দিতে বলে। এতে অস্বীকৃতি জানালে বিদ্রোহীরা জেলারকে মারধর করে। পরে বন্দিদের একটি পক্ষ ও কারারক্ষীদের সহায়তায় তিনি মুক্ত হন। তখন বিদ্রোহীরা জেলারের কক্ষ, হাসপাতাল ও বন্দিদের সাতটি সেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে কারারক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রাত ১০টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য আহতরা জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ বিষয়ে জামালপুর জেলা কারাগারের জেলার আবু ফাতাহ বলেন, ‘বন্দিদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মারামারি শুরু করে। এ সময় তারা আমাকে ও কারারক্ষীদের ওপর আক্রমণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বিদ্রোহ : চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি এলাকায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিরা বিদ্রোহ শুরু করলে বিক্ষোভ দমনে কারারক্ষীরা অন্তত ৩০০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। গোলাগুলির ঘটনায় রুবেল (৩৫) নামে একজন বন্দি আহত হয়েছেন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত এ বন্দির চোখে গুলি লেগেছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে ওই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার আখেরুল ইসলাম গতকাল বিকেল ৫টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বেশ কিছু বন্দি জামিন পেয়েছেন। যাচাই-বাছাই করে আজ (গতকাল) জুমার নামাজের পর তাদের জামিনে মুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছিল। এ সময় কারাগারে বন্দি থাকা সব হাজতিকে মুক্তি দিতে হবে বলে দাবি ওঠে। কারা কর্র্তৃপক্ষ তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জামিন নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে হঠাৎ বিক্ষোভ শুরু করলে পাগলা ঘণ্টা বাজায় কর্র্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারারক্ষীরা কয়েকশ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় কিছু কারারক্ষী আহত হন।’
জানা গেছে, বন্দি বিদ্রোহের খবর পেয়ে বেলা সোয়া ৩টার দিকে সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা কারাগারে পৌঁছান। এরপর সাড়ে ৩টার দিকে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
কারাগারের উত্তর পাশে হযরত শাহ আমানত (রহ.) মাজার জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন নগরীর বক্সিরহাট এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান। তিনি জানান, মাজারসংলগ্ন মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। মোনাজাত শেষে হঠাৎ কারাগারের ভেতরে গুলির শব্দ শুনতে পান। এ সময় আশপাশের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে ছোটাছুটি করতে থাকেন। দুপুর পৌনে ২টা থেকে শুরু হয়ে ২টা ৪০ মিনিটে শেষ হয় গোলাগুলি। এ সময় কারাগারের ভেতর থেকে বন্দিদের চিৎকার শোনা গেছে।
গতকাল বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, কারা সীমানায় ফটক এবং পকেটগেটে তালা ঝুলছে। অদূরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কারারক্ষীরা সতর্ক অবস্থানে আছেন। কারাগারে ঢোকার মূল ফটকের বাইরে সেনা ও বিজিবি সদস্যদের দেখা গেছে। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে কারাগার থেকে সেনা ও বিজিবি সদস্যদের বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি পিকআপে করে আহত এক ব্যক্তিকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারাগারের ফটক এবং বাইরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক পাহারা দিতে দেখা যায়। গোলাগুলিতে ঠিক কতজন আহত হয়েছেন তা কারা কর্র্তৃপক্ষ গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নিশ্চিত করেনি। তবে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে কিছু কারারক্ষী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিনিয়র জেল সুপার মঞ্জুর হোসেন।
