কোটা আন্দোলনে সক্রিয় কেউ হবেন ঢাবির নতুন উপাচার্য

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪, ০৯:০৪ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালের পদত্যাগের পর থমকে আছেন সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম। পরবর্তী উপাচার্য কে হচ্ছেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা, কানাঘুষা। বেশ কয়েকজন শিক্ষকের নামও আলোচনায় আসছে। যেহেতু দেশে বর্তমানে নির্দলীয় সরকার, সেহেতু রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কাউকে উপাচার্য হিসেবে চান না বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থী। কেউ কেউ বলছেন, দলীয় কেউ না হলে প্রশাসন চালানোই কঠিন হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কোটা আন্দোলনে যারা শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই নির্ধারিত হতে পারে ঢাবির অভিভাবকের নাম।  একটি সূত্র বলছে, আজ মঙ্গলবার কিংবা কাল বুধবারের মধ্যে ঘোষণা হতে পারে নতুন উপাচার্যের নাম।

সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। গত শনিবার এই পথেই হাঁটলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামাল। এরপর থেকেই পরবর্তী উপাচার্য কে হচ্ছেন তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়কে গতিশীল করার লক্ষ্যে খালি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শিগগিরই পূরণ করার কথা ভাবছে নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পরামর্শ দিতে গঠিত হওয়া লিয়াজোঁ কমিটিও এ নিয়ে কাজ করছে। খুব শিগগির উপাচার্যের নাম ঘোষণা হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাবির উপাচার্য হিসেবে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক লুৎফর রহমান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান মামুন।

তবে উপাচার্য হওয়া নিয়ে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ড. নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের একাডেমিক অ্যাডভাইজার এবং আরণ্যকের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়েলস সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থার কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভের দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত নন। যার কারণে তিনি উপাচার্য হিসেবে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পছন্দের তালিকায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লিয়াজোঁ কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশ কিছু নাম এসেছে আলোচনায়। তবে অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান অনেকটা এগিয়ে আছেন। তবে এখনো নিশ্চিত কিছু হয়নি। শিগগিরই হয়তো এটা চূড়ান্ত হবে।

ঢাকা বিম্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান যদি উপাচার্য হন, তাহলে সবার জন্যই ভালো। নিরপেক্ষভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজাতে পারবেন। তিনি ভালো একজন গবেষকও বটে। কখনো তাকে রাজনৈতিক ব্যানারে দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে সাজাতে হলে, এগিয়ে নিতে হলে এমন কাউকে প্রয়োজন। তিনি উপাচার্য হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও গৌরব উদ্ধার করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।

এরপর আলোচনায় রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। সাদা দলের শিক্ষকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রশাসনিক ও একাডেমিক যোগ্যতা,  ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের ওপর ভিত্তি করে তিনি বেশ এগিয়ে রয়েছেন। এক দফা দাবিতে মার্চ টু ঢাকার দিন তার নেতৃত্বেই প্রথম কারফিউ ভেঙে মিছিল হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বারবার রাজপথে এসেছেন তিনি।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ওপর আমাদের সবার আস্থা রয়েছে। তারা যেভাবে চাইবে, সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে। দায়িত্ব একটা আমানত, সরকার যদি সেই আমানত রক্ষার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেয় কিংবা যোগ্য মনে করে, সেটা আমি আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করব। ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করব, আমার দ্বারা কোনো অন্যায় কিছু হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার চেষ্টা করব।’

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের বর্তমান আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও জনপ্রিয়তার কারণে তিনি একাধিকবার শিক্ষক সমিতি, সিনিটসহ বিভিন্ন ফোরামে বিজয়ী হয়েছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন এই শিক্ষক। সাদা দল এবং অন্য শিক্ষকদের নিয়ে রাজপথে মিছিলও করেছেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে।

অধ্যাপক লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। এ জন্য সিনেটে আমাকে অপমানিতও হতে হয়েছে। তবুও ন্যায়ের পক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলেছি আমি। সরকার যদি আমাকে দায়িত্ব দেয়, আমি সেটা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করব। এই দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার চেষ্টা করব।

এ ছাড়া সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার পিজে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের দুইবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া অধ্যাপক ছিদ্দিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর এবং ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে দীর্ঘ সাড়ে ৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন।

জনপ্রিয়তা ও পরিচিতির দিক থেকে বামপন্থি হিসেবে পরিচিত শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান এবং ড. মো. কামরুল হাসান মামুন আলোচনায় রয়েছেন। তাদের নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন সময়ে উভয়ের ব্যাপারেই একাডেমিক দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রশংসা শোনা যায়। ক্যাম্পাসে তারা শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক হিসেবে বেশ পরিচিত। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলন ও মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। অন্যায়ভাবে আটক করা শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনতেও দেখা যায়। বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার নিয়েও কথা বলেন তারা।

উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রশাসকও প্রয়োজন। যদিও দাবি উঠেছে নিরপেক্ষ কোনো শিক্ষককে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়ার। তবে তিনি কতটা সামলাতে পারবেন, সেটি দেখার বিষয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সাদা দল থেকে কাউকে দায়িত্ব দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভালো চলবে।’

উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যিনিই আসবেন তার উচিত হবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন ও আবাসনব্যবস্থায় নজর দেওয়া। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সবকিছু পরিচালনা করা।

প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এবং পুলিশের হামলার পর থেকেই উপাচার্য এবং প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর সে দাবি আরও জোরালো হলে ১০ আগস্ট পদত্যাগ করেন উপাচার্য মাকসুদ কামাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত