‘একাত্তরে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। ১৩ বছর জাতীয় দলে খেলেছি। অধিনায়কও ছিলাম। সব সরকারের আমলে আমাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমার গায়ে কোনো রাজনৈতিক তকমা নেই। আমি দেশ ছেড়েও যাইনি। এখানেই আছি। আমাকে নামিয়ে ফেলা কি এত সহজ? আমি নাকি নির্বাচন করলে সেটা বানচাল করা হবে। আমাকে মারধর করা হবে। সাফ জানিয়ে দিতে চাই, এসব হুমকিতে আমি পদত্যাগ করব না। আর পদত্যাগ করে আমি আমার দেশের ফুটবলকে নিষেধাজ্ঞার মুখে ঠেলে দিতে পারি না। অক্টোবরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যার যার ব্যক্তিগত অধিকার। কারও কথায় তো আমি সিদ্ধান্ত নেব না। যারা এসব করছে, তাদের বলছি, নির্বাচনে আসুন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাফুফের দায়িত্ব নিন।’ ফোনের ওপাশ থেকে এভাবেই নিজের অবস্থান জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন।
ফুটবল সমর্থকদের সংগঠন বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাস বেশ কিছুদিন ধরেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও ফুটবলকে সঠিক পথে রাখতে না পারার অভিযোগে বাফুফের সভাপতি ও নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তারের পদত্যাগের দাবিতে নানা কর্মসূচি করে আসছে। সর্বশেষ তারা মার্চ টু বাফুফে কর্মসূচি করে গত রবিবার। যেখানে সেøাগানে সেøাগানে নিজেদের দাবি জানান সমর্থকরা। সালাউদ্দিন ‘একটি মহলের এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে এই সমর্থকরা কাজ করছে বলে দাবি করেছেন। এই সমর্থকদের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সালাউদ্দিন দেশের ফুটবলে নিজের অবদানের দীর্ঘ ফিরিস্তি দিয়ে বলেন, ‘আমি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। জাতীয় দলের হয়ে খেলেছি ১৩ বছর, অধিনায়কত্বও করেছি। এ ছাড়া কোচিংও করিয়েছি। এই সবকিছুর স্বীকৃতিস্বরূপ জিয়াউর রহমানের আমলে আমি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাই। এরশাদের আমলেও আমি স্বীকৃতি পাই। বেগম জিয়ার আমলে সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি স্বাধীনতা পদকে আমাকে ভূষিত করা হয়। ২০০৮ সালে যখন বাফুফের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হই, তখন আমি আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে হয়েছে। এরপর শেখ হাসিনার সময় আমাকে শেখ কামাল আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। বাফুফের পাশাপাশি আমাকে চারবার বিনা ভোটে সাফের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। আমার পদত্যাগ চাওয়ার ওরা কে। দেশের ফুটবলে ওদের অবদান কী? ওরা সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের, আমিনের (তরফদার রুহুল আমিন) হয়ে কথা বলছে। আমার কথা হলো, ওরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাকে সরাক পারলে। হুমকি দিয়ে, জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো কিংবা কাউকে নিষিদ্ধ করার নিয়ম কোথায় আছে, আমি জানি না।’
২৬ অক্টোবর বাফুফের নির্বাচনের তারিখ আগেই চূড়ান্ত ছিল। সালাউদ্দিন নির্ধারিত সময়েই চান নির্বাচন আয়োজন করতে, ‘আমরা যে নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত করেছি, সেটা ফিফা-এএফসির সঙ্গে কথা বলেই। তাই হুট করে সেটা পরিবর্তন সম্ভব নয়। তা ছাড়া এ রকম কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে হবে। ফিফা-এএফসির সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ হচ্ছে। তারাই সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। আমি তাদের জানিয়েছি, এখানে কোনো রকম হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি। সুতরাং নির্বাচন সময়মতোই হবে।’ তবে ক্লাবগুলোর চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চলমান প্রিমিয়ার লিগের দলবদলের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন সালাউদ্দিন, ‘যারা খেলবে সেই ক্লাবগুলোই আমাদের কাছে দলবদলের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দল গঠন নিয়ে প্রায় সব দলই সমস্যায় আছে। তবে পেছানোর এই সিদ্ধান্তও আমাদের একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা ফিফা-এএফসির কাছে ক্লাবগুলোর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পেছানোর আবেদন করেছি।’
এদিকে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন বাফুফের সিনিয়র সহসভাপতি ও ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান সালাম মুর্শেদী। এ ছাড়া দেশ ছেড়েছেন আরেক সহসভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ। এই দুজনই ছিলেন বাফুফের সব আর্থিক বিষয়ে স্বাক্ষরকারী। ফলে সালাউদ্দিনের দাবি, ‘এই মুহূর্তে বাফুফের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করার ক্ষেত্রেও ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে, ওরা দুজন না থাকায় আমরা চাইলেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারছি না। অনূর্ধ্ব-২০ দল নেপালে সাফের টুর্নামেন্ট খেলতে যাবে। তাদের পাঠাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তাই আমরা সাফের কাছে আবেদন করেছিলাম যাতে বিমানভাড়ার টাকাটা নগদে আমাদের অগ্রিম দেয়। সাফ বলেছে, এয়ারলাইনস থেকে সরাসরি তাদের পাঠালে তারা বিমানভাড়া দিয়ে দেবে। এভাবেই আপাতত আমাদের কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সুতরাং বাফুফে পরিচালনা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।’
চার মেয়াদে সভাপতির দায়িত্বে থেকে সেভাবে ফুটবলের উন্নতি করতে পারেননি সালাউদ্দিন। সাবেক এই তারকা ফুটবলার হিসেবে যতটা সফল, ঠিক ততটাই ব্যর্থ ফুটবল পরিচালনায়। তারপরও পঞ্চম মেয়াদে চাইছেন সভাপতি হতে। তবে কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করে আগেভাগে দায়িত্ব ছেড়ে তিনি চান না নির্বাচনে অংশ নিতে। চান ফুটবল প্রশাসন নিজের মুঠোয় রেখে আরেকবার নির্বাচনী সেতু সফলভাবে পাড় হতে। এখন সময়ই বলে দেবে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সালাউদ্দিনের আশা করতটা পূরণ হয়।
