ট্রফি ফেরত চায় আবাহনী

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৪, ০৬:১৭ এএম

আবাহনীর আঙিনাটা এখন বড্ড অপরিচিত। আগের সেই লাল দালান আর নেই। আবাহনী মাঠের চারপাশ জুড়ে চলছে নির্মাণযজ্ঞ। শেখ কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজকে অবশ্য ছাপিয়ে গেছে ৫ আগস্ট ক্লাব জুড়ে নাশকতাকারীদের ধ্বংসযজ্ঞ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন হামলা হয়েছিল আবাহনী ক্লাবে। দুষ্কৃতকারীরা ক্লাবে প্রবেশ করে জ্বালাও-পোড়াওয়ের পাশাপাশি লুট করে নিয়ে গেছে ৫২ বছরের অর্জিত সব ট্রফি। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনী নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল অন্যতম সফল ক্লাব হিসেবে। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, টেবিল টেনিসসহ বিভিন্ন খেলায় তাদের অর্জনের তালিকা বিশাল। শো-কেসে ট্রফির সংখ্যাও অগুনতি। সাফল্যের সেই স্মৃতি স্মারক হারিয়ে বেদনাকাতর সাবেক খেলোয়াড়রা মঙ্গলবার মিলিত হয়েছিলেন ক্লাবের আঙিনায়। কাকুতি-মিনতি করে তারা ফেরত চেয়েছেন ট্রফিগুলো। পাশাপাশি ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে সেরা হওয়ার প্রত্যয়ও ঝরেছে খেলোয়াড়-কর্মকর্তা-সমর্থকদের কণ্ঠে।

প্রতিষ্ঠার পর আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন হকির কিংবদন্তি আব্দুস সাদেক। বার্ধক্যজনিত রোগে বেশিরভাগ সময়ই অসুস্থ থাকেন এই তারকা। শারীরিক অসুস্থতার তোয়াক্কা না করে তিনিও মঙ্গলবার হাজির আবাহনীর আঙিনায়। কাতর স্বরে তিনি বলেন, ‘৫২ বছর হয়ে গেল এই ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক। ৫২ বছর পর নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আবাহনী ক্লাব হলো শ্রেষ্ঠ ক্লাব। এই ক্লাবের ট্রফির সংখ্যা কত আমি ঠিক জানি না। ৭৪ সালে তিনটি খেলাতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আবাহনী। এরপর তো শত শত ট্রফি ক্লাবটি জিতেছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কদিন আগে একটি অপ্রীতিকর ঘটনায় ক্লাব থেকে শত শত ট্রফি কে বা কারা নিয়ে গেছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে অনুরোধ করব, এই ট্রফিগুলো যাতে ক্লাবকে ফেরত দেওয়া হয়।’

জাতীয় দল ও আবাহনী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন, ‘আমাদের ক্লাবটি ভাঙচুর হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো যে ট্রফিগুলো, আমরা পারফরম্যান্সের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম, সেই ট্রফিগুলো সব লুট হয়ে গেছে। এটা শুনে খুবই মর্মাহত। ১৯৮০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে এখানে খেলতে আসি। এই ট্রফিগুলো নিয়ে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িত। আমি ভীষণ মর্মাহত। নিশ্চয় দুষ্কৃতকারী ছাড়া এ রকম কাজ কেউ করতে পারে না। যে কোনো মাধ্যমে হোক ট্রফিগুলো ফেরত চাই। আমাদের অনেকেই এখানে ষাটোর্ধ্ব বয়স। জানি না কতদিন বাঁচব। জীবন থাকতে এই ট্রফিগুলো আবার ফিরে পেতে চাই, দেখে যেতে চাই। সেটাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক, ক্রিকেটের এক সময়ের ডাকসাইটে কর্মকর্তা হলেও দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুলের বড় পরিচয় তিনি আবাহনীর টুটুল। সাবেক এই তারকা বলেন, ‘এই ট্রফিগুলো বিক্রি করে কিন্তু খুব বেশি টাকা পাওয়া যাবে না। তবে আমরা এখানে যারা আছি, তাদের ৫২ বছরের অর্জন, খ্যাতি কিন্তু শেষ হয়ে যাবে। আমাদের এখানে আসার কারণ একটাই, অর্জনগুলো আমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে এসেছি। আপনারা এই ট্রফিগুলো ঘরেও রাখতে পারবেন না। ঘরে রাখলে কেউ এসে প্রশ্ন করলে কোনো সদুত্তরও দিতে পারবেন না। তাই আপনারা যদি এই ট্রফিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে যান আমরা অত্যন্ত খুশি হব। সেই সঙ্গে প্রশাসনে যারা আছেন, দয়া করে আবাহনীর মতো ক্লাবগুলোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। আবাহনী-মোহামেডান কোনো পাড়ার দল নয়। এগুলো জাতীয় পর্যায়ের ক্লাব।’

আবাহনী ও জাতীয় দলের হয়ে এক সময় মাঠ কাঁপানো ফুটবলার, বর্তমানে সোনালী অতীত ক্লাবের সভাপতি আবদুল গাফফার বলেন, ‘একটি ঘটনায় আমাদের ৫২ বছরের অর্জন নিয়ে গেছে। যারা নিয়ে গেছেন, তাদের কাছে অনুরোধ, এই অর্জনগুলো যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে দেখাতে পারি, সেজন্য ফিরিয়ে দিন। সেটা যদি দেখাতে না পারি আপনারাই কষ্ট পাবেন। পাশাপাশি ক্রীড়া উপদেষ্টার কাছে অনুরোধ করছি, আপনি ক্লাবগুলোকে সহায়তা করুন। নিরাপত্তা দিন।’

জাতীয় ক্রিকেট দল ও আবাহনীর সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন ক্লাবের এই অপূরণীয় ক্ষতিতে ভীষণ ব্যথিত সাবেক এই তারকা খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে মিলিয়ে না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্লাবের অন্যতম পরিচালক কাজী এনাম আহমেদ জানিয়েছেন, যদি অর্থের বিনিময়েও হয়, ট্রফিগুলো ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে আবাহনী তার মতো করেই মাঠে থাকবে।

আবাহনী অঙ্গন কাল পরিণত হয়েছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সূর্যসন্তানদের মিলনমেলায়। হারানো ট্রফিগুলো ফিরে না পেলে একটা ইতিহাসের অপমৃত্যু ঘটবে। যা এই সাবেকদের জন্য ভীষণ কষ্টের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত