বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চাভিলাষী ও অপেশাদার অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই কর্মকর্তাদের অনেকে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী গুলি ছোড়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। চিহ্নিত এই কর্মকর্তারা নিজেদের ‘বিশেষ মতাদর্শে’র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা কার্যক্রম ও বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
যাদের মধ্যে বাহিনীটির সাবেক মহাপরিদর্শকও (আইজিপি) রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগে দুর্নীতি, অনিয়ম, গ্রেপ্তার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ। ইতিমধ্যে এই কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাদের দুজনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি ও তিনজনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগপন্থি ও সাবেক সরকার-ঘেঁষা হিসেবে পরিচিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ দেননি। ঢাকা মহানগরসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে তাদের কর্মস্থল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) হারুন অর রশীদ, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, খন্দকার নুরন্নবীসহ অন্তত ৫৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকতার হদিস নেই। তারা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার। ডিএমপি সদর দপ্তরে শুধু ক্রাইম বিভাগের সদস্যরা পুরোদমে অফিস করছেন। পাশাপাশি থানাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি বেড়েছে। গতকাল ডিএমপি সদর দপ্তর ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের পেশাদারিত্ব ধ্বংসের জন্য বিশেষ একটি এলাকার ও রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তারাই দায়ী। তারা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে বসে পুলিশকে রাজনৈতিক দমন-নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পিআরবিসহ বাহিনীর প্রচলিত যাবতীয় বিধি লঙ্ঘন করে তারা একটি নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করেছেন। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন অনেক কর্মকর্তা।
কাজে না ফেরা এসব কর্মকর্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মাইনুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা এখনো কেন কাজে ফেরেননি সেটা আমরা জানতে পারিনি। তাদের ব্যাপারে আমাদের কাছে আপাতত কোনো তথ্যও নেই। আমরা আশাবাদী তারা দ্রুতই কাজে ফিরবেন।’
তবে এর আগে কাজে না ফেরা পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি গত রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশের ফোর্স এখনো জয়েন করেনি। তাদের জন্য শেষ সময় হচ্ছে বৃহস্পতিবার। আপনারা যদি বৃহস্পতিবারের মধ্যে কেউ না আসেন, আমরা ধরে নেব আপনারা চাকরিতে আসতে ইচ্ছুক নন।’ পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ‘এই বৃহস্পতিবারের মধ্যে যে যার জায়গায় চলে যাবেন, ডিউটিতে থাকবেন। যা হয়ে গেছে, অহেতুক কেউ কারও গায়ে হাত তুলবেন না। বিচার করার প্রক্রিয়া আমরা করব। বিচার বিভাগ বিচার করবে। যারা দোষী হবেন, বড় দোষী, ছোট দোষী যেই হোক, তাদের পানিশমেন্ট (শাস্তি) হবে। ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করা যাবে না।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দমন-পীড়ন চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের গুলিতে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও আনসার সদস্যসহ প্রায় ৬০০’র মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও চলে যান অনেকটা আত্মগোপনে। আন্দোলন চলাকালে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরসহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগকারীদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এমন অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘উচ্চাভিলাষী ও অপেশাদার পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এখনো সেটা চূড়ান্ত করা হয়নি। এই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে ৮ম এবং ১২তম, ১৫, ১৭, ১৮, ২০, ২১, ২২. ২৪. ২৫, ২৭ ও ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাই সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া সাবেক কয়েকজন আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারের নামও আছে এই তালিকায়।’
গতকাল ডিএমপিসহ পুলিশের কয়েকটি ইউনিট ঘুরে দেখা গেছে, কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি, র্যাবসহ প্রতিটি ইউনিটের কর্মকর্তা ও সদস্যরা। তাদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহত গাড়ি থেকে তুলে ফেলা হয়েছে ডিএমপির লোগো ও পুলিশ লেখা স্টিকার। ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন ও সঞ্জিত চন্দ্র রায় ছাড়া গত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেউ কাজে যোগ দেননি। তারা কোথায় আছেন এটাও বলতে পারছেন না সহকর্মীরা, অনেকের মোবাইল ফোনও বন্ধ।
৫৩ আন্দোলনকারী নিহতের মামলা নিয়ে বিপাকে ডিএমপি : কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় ৫৩টি হত্যা মামলা করা হয়েছিল ডিএমপির পক্ষ থেকে। সরকার পতনের আগে করা এসব মামলা নিয়ে এখন বিপাকে ডিএমপি। পুলিশ ও অনান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের করা এসব মামলায় পুলিশের গুলির কোনো উল্লেখ না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে নতুন করে মামলা হবে, নাকি আগের মামলাগুলোরই বিচার হবে। যদিও ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এরই মধ্যে ডিএমপির থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) আগের হত্যা মামলায় তদন্তকাজ দ্রুত করতে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
পদায়ন হচ্ছে বঞ্চিতদের : ডিএমপি সূত্র বলছে, ইতিমধ্যেই পাঁচ অতিরিক্ত উপকমিশনারকে সরিয়ে নতুন ৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। ডিএমপি সদর দপ্তরের ডিসি হেডকোয়াটার্স, ডিসি মিরপুর, ডিসি ট্রাফিক মিরপুর, ডিসি লজিস্টিকস ও ডিসি গোয়েন্দা গুলশানকে ডিএমপি সদরে সংযুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদবঞ্চিত পাঁচ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে উপকমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ১৮টি থানার ওসিকেও বদলি করা হয়েছে। আরও বদলি করা হয়েছে অতিরিক্ত আইজিপি থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের। সামনের দিনগুলোতে পুলিশে আরও রদবদল ও বঞ্চিতদের পদায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি দেওয়া হবে পদোন্নতি।
