শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা অপহরণে আরও দুই মামলা

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৪, ০৩:১৪ এএম

আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যা ও অপহরণের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর কাফরুলে কলেজছাত্র ফয়জুল ইসলাম রাজন হত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ২৪ জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। গতকাল বুধবার এ মামলার আবেদনের পর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট আহমদ হুমায়ুন কবির কাফরুল থানাকে মামলা রেকর্ড করার আদেশ দেন। এ মামলার আবেদনটি করেন ফয়জুল ইসলামের ভাই রাজীব।

অন্যদিকে গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা শাকিলা চৌধুরী সুমুর আদালতে সোহেল রানা নামে এক আইনজীবী বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগে আরও একটি মামলা করেন।

এদিকে শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় আবেদন করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গত ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত সাভারের ডেইরি ফার্ম হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আরিফ আহমেদ সিয়ামের পিতা মো. বুলবুল কবিরের পক্ষে গতকাল এ আবেদনটি করা হয়। আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম। এতে অভিযোগটি নথিভুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর ৮ ধারা অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানানো হয়েছে।

হত্যা মামলা : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ মানুষ নিহত হন। ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ফয়জুল ইসলাম রাজনকে গত ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে নির্বিচার গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। ওই হত্যার ঘটনায় করা মামলায় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ মান্নান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হক সাচ্ছু, সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহম্মেদ মজুমদার, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগ নেতা সালামত উল্লাহ সাগর ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সদস্য দীপংকর বাছার। এ ছাড়া এই মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের ৫০০ থেকে ৬০০ নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

অপহরণের অভিযোগে মামলা : অপহরণের অভিযোগে মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা শাকিলা চৌধুরী সুমুর আদালতে সোহেল রানা নামে এক আইনজীবী বাদী হয়ে এ মামলাটি করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে উত্তরা পশ্চিম থানাকে মামলাটি এফআইআর হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

মামলার বাদী তার অভিযোগে বলেন, ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর গেটের স্মাইল গ্যালারির সামনে দিয়ে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় বাদী ও তার বন্ধুকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়িতে ১০ থেকে ১১ জন বন্দুকধারী ছিলেন। গাড়িতে ঘণ্টাখানেক রেখে নির্যাতনের পর তাদের একটি ভবনে নেওয়া হয়। বাদী আরও বলেন, তাকে ও তার বন্ধুকে ৬ মাস ৩ দিন আটক রেখে নির্যাতন করা হয়।

এ নিয়ে শেখ হাসিনা, তার সরকারের সময়ের মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হলো। এর মধ্যে দুটি হত্যা মামলা। মোহাম্মদপুর এলাকার মুদিদোকানি আবু সায়েদ নিহত হওয়ার ঘটনায় গত মঙ্গলবার শেখ হাসিনাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট আদালত মোহাম্মদপুর থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় আবেদন করা হয়েছে।

আবেদনে শেখ হাসিনা ছাড়াও আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, অতিরিক্ত কমিশনার মো. হারুন অর রশীদ, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদসহ কতিপয় অসাধু র‌্যাব কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনকে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এর ৩ (২), ও ৪ (১), ৪ (২) ধারা অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় করা আবেদনে আইনজীবী বলেন, আন্দোলকারী ছাত্র-জনতাদের সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার হীন উদ্দেশ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলন প্রতিহত করতে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার নির্দেশনা দেন।

এতে বলা হয়, আসামি ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এমপি একই উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য ও নির্দেশনা দেন। আসামি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও অন্য আসামিদের এমন নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশব্যাপী বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে তাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। অ্যাডভোকেট গাজী এম এইচ তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আসামিদের উসকানি ও নির্দেশে যেসব হত্যাকান্ড হয়েছে, সেগুলো সুস্পষ্ট গণহত্যা। দেশে প্রচলিত সাধারণ আইন এবং আদালতে এসব গণহত্যার বিচার সম্ভব নয়। এসব হত্যার বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনালের আইনে গণহত্যার যে সংজ্ঞা, এখানেও সেটি হয়েছে। আমরা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত চেয়েছি। আমাদের আবেদনটি তদন্ত সংস্থা তদন্তের জন্য গ্রহণ করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত