ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অনেকটা উজ্জীবিত। হামলা-মামলার ভয়ে যারা দীর্ঘদিন আড়ালে ছিলেন, তারাও হয়েছেন সক্রিয়। ভয়-ভীতিহীনভাবে দীর্ঘদিন পর রাজপথে নেমে এলেও ছাত্ররাজনীতিতে অনেকটা কৌশলী অবস্থান নিয়েছে সংগঠনটি। শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা আগের ছাত্রলীগের মতো দখলদারিত্বের রাজনীতি চান না। ক্যাম্পাস দখল, গেস্টরুম নির্যাতন, চাঁদাবাজি এসব বিলুপ্ত ঘোষণা করতে চান। এর ব্যত্যয় ঘটলেই সাংগঠনিক ব্যবস্থাও চালু থাকবে বলে জানান তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দাবিতে দীর্ঘ চার বছর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রদল। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এতে ছাত্রদলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। কর্মসূচিতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল, ঢাকা কলেজ, তেজগাঁও কলেজে, কবি নজরুল কলেজ, বাঙলা কলেজে, ইডেন কলেজ, বদরুন্নেছা কলেজ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ শাখার নেতাকর্মীরাও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
সরকার পতনের পর গত ৯ আগস্ট শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বিএম আলমগীর কবিরের হল দখলের একটা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। এরপর ছাত্রদল হল দখল করা শুরু করেছে বলে প্রচারণা শুরু হয়। তবে এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে এক জরুরি নোটিসে ওই নেতাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এ ছাড়া সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বরিশাল জেলা শাখার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খানকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আসিফ চৌধুরী লিমনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মোখলেছুর রহমান, ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ জামাল চৌধুরীকে।
এতেই থেমে থাকেনি ছাত্রদল। গত ১২ আগস্ট এক জরুরি বার্তায় কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির কিংবা সংগঠনের কারও নাম ব্যবহার করে কেউ যদি কোথাও আইনবিরুদ্ধ কোনো কর্মকা-ে লিপ্ত হয় কিংবা অনৈতিক কোনো সুযোগ-সুবিধা দাবি করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরাও।
মোহাম্মদ সাদিক হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল যদি এসব সুন্দর উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে পজিটিভ ধারণা রাখতেই পারি। শিক্ষার্থীদের সম্মান জানাতে শিখুন। তারা যখন চায় না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চলুক, তখন আপনাকে মেনে নিতেই হবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে, সেজন্য নিয়মিত শিক্ষার্থীদেরও আপাতত হলে না ওঠার নির্দেশনা দিয়েছে ছাত্রদল। নির্দেশনা অনুযায়ী অনেকে হলও ছেড়ে দেন। তাদের মধ্যে একজন কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক তানভীর বারী হামিম। হলে ওঠার পরও ছাড়ার বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্ররাজনীতিবিমুখ করার যে এজেন্ডা, তা দুর্বৃত্তদের সংগঠন ছাত্রলীগ বাস্তবায়নে সফল হয়েছে। ক্যাম্পাসে হলগুলো থেকে দখলদারিত্বের ট্রেন্ড হটিয়ে একটি পজিটিভ এবং অ্যাপ্রিসিয়েবল ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। তাই বৈধ শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও আমরা ধীরে চলো নীতিতে আপাতত হলে না ওঠে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে আস্থার জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা জানান, সন্ত্রাসী ও দখলদারিত্বের কর্মকা-ের বিপরীতে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন তারা। কোনো ধরনের দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, নির্যাতনের রাজনীতি চান না ছাত্রদল নেতারা। তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী সৃষ্টিশীল ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক, নিরাপদ, সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সারথি হওয়ার প্রত্যাশা তাদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদল দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে হাসিনা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম, খুন ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। ছাত্রলীগ যে দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসের রাজনীতি সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কায়েম করেছিল, সেটি হচ্ছে হাসিনা ও তার দোসরদের জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল। আমরা জনগণের ভোটাধিকার ও তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। এজন্য ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ও দখলদারিত্বের কর্মকা-ের বিপরীতে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করব।’
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল এবং শান্ত থাকার জন্য বলেছি। কোনো নেতাকর্মী যাতে বিশৃঙ্খলা করতে না পারেন, অতি উৎসাহী হয়ে কোনো অঘটন ঘটাতে না পারেন, সেজন্য কঠোর বার্তা দিয়েছি।’
সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আইনের প্রতি শতভাগ শ্রদ্ধাশীল এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী সৃষ্টিশীল ইতিবাচক কার্যক্রমের নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণের সারথি হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা কোনো ধরনের দখলদারিত্ব চাই না। আমরা এ বিষয়ে ইতিমধ্যে কঠোর বার্তা দিয়েছি এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খল ছাত্ররাজনীতি করবেন। ছাত্রলীগের তৈরি করা চাঁদাবাজি, গেস্টরুম নির্যাতন এসব আর থাকবে না। আমরা শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ।’
চার বছর পর ঢাবিতে বড় জমায়েত : ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের হামলার পাশাপাশি পুলিশের বাধার মুখেও পড়েন তারা। ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদলের প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করতে চাইলে পুলিশের বাধায় প- হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় চার পাঁচ বছর পর গতকাল আবারও ঢাবিতে বড় জমায়েত করেছে ছাত্রদল।
শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি ও প্রতিবাদী গান পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া অবস্থান কর্মসূচি শেষে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। নেতারা তাদের বক্তব্যে বলেছেন, গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। খুনি, স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্টদের জায়গা আর এই দেশে হবে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ট্রাইব্যুনাল দ্রুত গণহত্যার বিচার শুরু করতে হবে। হাসিনা ও তার দোসরদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
