‘রাতের রাস্তা দখল’ কতটা চাপে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলো? 

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ০১:৪৪ পিএম

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে কর্তব্যরত এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ। বুধ ও বৃহস্পতিবার মাঝ রাতে লাখ লাখ নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে শুক্রবার মিছিল করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। আবার ওই ঘটনায় তার পদত্যাগ চেয়ে মিছিল করেছে বিজেপি।

বিশ্লেষকদের মতে, বুধ আর বৃহস্পতিবারের মাঝ রাতে যে লাখ লাখ নারী-পুরুষ রাস্তা দখল করে নিয়েছিলেন, জনতার সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেখেই রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। তারা বলছেন, ওই রাতের রাস্তা দখল সবগুলো রাজনৈতিক দলকেই একটা বার্তা দিয়েছে যে নারী নিরাপত্তার ব্যবস্থা বা দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থার দাবি নিয়ে দলগুলো যদি শুধু রাজনীতিই করে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ পথে তো নামবেই।

ধর্ষণকাণ্ডে যখন রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে তখন কর্মবিরত পালন করছে রাজ্যের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়ার ডাক্তাররা। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে রেসিডেন্ট ডাক্তাররাও কাজ করছেন না। ভারতে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন শনিবার সকাল থেকে ২৪ ঘন্টার জন্য ধর্মঘট ডেকেছে।

গত সোমবার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ঘোষণা দেন তার সরকার ঘটনায় ধৃতের দ্রুত বিচার চায়, এবং তারা ফাঁসীর দাবি জানাবে আদালতে। পরের দিনই অবশ্য কলকাতা হাইকোর্ট কলকাতা পুলিশের তদন্তের ওপরে ভরসা না রেখে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে ওই চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়। এরই পরে বুধবার রাত থেকে কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গায় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করেন। দুটো স্লোগান ছিল তাদের মুখে, ‘বিচার চাই’ আর ‘রাতের রাস্তা দখল করো’।

মুখ্যমন্ত্রী আগেই বিচার এবং ফাঁসির দাবি তুলে থাকলেও ওই রাতের রাস্তা দখল কর্মসূচীর পরে, বৃহস্পতিবার তার দল চার দিনের এক কর্মসূচী ঘোষণা করে। সেই অনুযায়ীই শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেসের সহকর্মীদের নিয়ে ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন মমতা ব্যানার্জী। মিছিল শেষে তিনি বলেন, ‘ডিউটিতে যাঁরা থাকেন, প্রতি ঘণ্টায় রোগী কেমন রয়েছেন, দেখতে হয়। ডাক্তারদেরও অনেক কষ্ট করে কাজ করতে হয়। পুলিশের মতো। এটা নিয়ে রাজনীতি করতে নামলেন বলে আমাদের নামতে হল।’ ‘রাতের রাস্তা দখল’ করার মধ্যেই আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে যে ভাঙচুর চলে, সেটিকে ‘রাম-বাম’, অর্থাৎ বিজেপি এবং বামেদের কাজ বলে তিনি আবারও মন্তব্য করেন শুক্রবার।

এদিকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার বিরুদ্ধে ১২ ঘণ্টার বনধ ডেকেছিল এসইউসিআই দলটি। তাদের ক্যাডাররা অনেক জায়গায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি আবার শুক্রবার কলকাতায় ধর্না-অবস্থান, জেলায় জেলায় রাস্তা অবরোধ আর দুপুরে দু ঘণ্টার জন্য ‘সামাজিক কর্মবিরতি’র ডাক দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশ্যে এক মশাল মিছিলও করার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। তবে মিছিল শুরুর আগেই পুলিশ বিজেপি নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ায় সেই মিছিল আর হয়নি। এর আগে কলকাতার শ্যামবাজারে বিজেপির ধর্না অবস্থান মঞ্চ পুলিশ ভেঙ্গে দিয়েছিল। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের মতে, ‘সাধারণ মানুষ একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে ইনাফ ইজ ইনাফ, তোমরা যদি নারী নিরাপত্তার ইস্যুতে শুধুই রাজনীতিই করে যাও, তাহলে আমাদের ব্যবস্থা আমরাই করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখি।’

কলকাতার একজন পেশাজীবি ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় নারী সুজাতা ঘোষ বলছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো শুক্রবার পথে নামছে, কেউ ফাঁসী চাইছেন, কেউ মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইতে তার বাড়ির দিকে মিছিল করছেন, কেউ বনধ ডাকছেন। অথচ বুধবারের আগে, অর্থাৎ ওই মাঝ রাতের জনসমুদ্র দেখার আগে কিন্তু এইসব রাজনৈতিক কর্মসূচীগুলো আমরা দেখতে পাই নি। মাঝরাতের ওই লাখো মানুষের ভিড় দেখে এখন দলগুলোর মনে হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মানুষ যখন নেমে গেছে, আমরা যদি এখন না নামি তাহলে দলীয় সমর্থকরা প্রশ্ন তুলবে, তাই এখন তারা মাঠে নেমেছে।’

সুজাতা ঘোষের মতে, “একটা পাবলিক পার্সেপশান তৈরি হয়েছে আরজি করের ঘটনায় যে শুধু কি একজনই এই ঘটনায় জড়িত? না কি আরও কেউ আছে? তাদের কী আড়াল করা হচ্ছে? এই ধারণার বশবর্তী হয়ে ওই রাতের রাস্তা দখলে নেমে মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে যে রাজনৈতিক দল বা সরকারের ওপরে আর তারা ভরসা করতে পারছে না।’

সাধারণ মানুষের এই ধারণা নিয়ে শুক্রবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার ভিনিত গোয়েল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বহু ধরণের গুজব ছড়ানো হচ্ছে আরজি করের ঘটনা নিয়ে। তারা আরও দোষীদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন ইত্যাদি যা সব বলা হচ্ছে, বিষয়টা পুরোটাই তারা তদন্ত করে দেখছিলেন অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে। আদালতের নির্দেশে এখন যখন সিবিআই তদন্ত করছে, তারাও খতিয়ে দেখতে পারে যে পুলিশ যখন তদন্ত করছিল তখন কোনও খামতি ছিল কী না। বুধ-বৃহস্পতিবার রাতে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে যে ভাঙচুর হয়, সেই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তারা ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

‘রাতের রাস্তা দখল’ করতে লাখ লাখ মানুষ যেভাবে নেমেছিলেন, তা বিশ্লেষণ করতে কলামিস্ট শুভাশিস মৈত্রের মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষের অনেক কিছু বলার আছে, যা তারা এতদিন বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, বোঝা যাচ্ছে মমতা ব্যানার্জীর প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনেক কিছু সম্ভবত বলতে চাইছেন সাধারণ মানুষ, তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরেও তারা খুব একটা ভরসা করছেন না নিজেদের প্রতিনিধি হিসাবে। তাই নিজেরাই রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন সেই রাতে। ওটা একটা অভূতপূর্ব প্রতিবাদ হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে এই ‘রাস্তা দখল’ কতটা প্রভাব ফেলবে বা আদৌ ফেলবে কী না অথবা দলগুলো কী শিক্ষা নেবে, সেটা বলার সময় এখনও আসেনি।

নারী আন্দোলনের কর্মী অধ্যাপিক শাশ্বতী ঘোষ বলছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শুক্রবার ফাঁসির দাবিতে মিছিল করছেন, তবে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা তো তার হাতে, তার পুলিশের হাতেই ছিল। ব্যবস্থা তো তিনিই করতে পারতেন। এখন রাতের রাস্তা দখল কর্মসূচীর পরে সব দলই সাধারণ মানুষের সেই আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। সেদিন অবশ্য অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিই দলীয় পরিচয় ছাড়া যোগ দিয়েছিলেন।’

শাশ্বতী ঘোষ আরও বলেন, তবে ওই বিপুল জনসমাগম দেখে তাদের এখন মনে হচ্ছে যে আমরা দলীয়ভাবে কিছু করব না? পথে না নামলে তো কর্মীরা আমাদের কাছে প্রশ্ন তুলবে। শুক্রবার তারা সাধারণ মানুষের চাপে পড়ে মিছিল করতে বাধ্য হচ্ছেন।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত