বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পযাত্রা শুরু হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে, দেশভাগের পর অন্য শিল্পীদের নিয়ে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তিনিই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ। জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে তিনটি ডিপার্টমেন্ট, ছয়জন শিক্ষক ও আঠারো জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট। ১৯৫২ সালে এই প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরিত হয় সেগুনবাগিচায়। ১৯৫৬ সালে আবারও স্থানান্তরিত হয়ে আসে শাহবাগে। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাত্রা শুরু করে এবং ২০০৮ সালে চারুকলা অনুষদ হিসেবে পরিচিতি পায়। আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ আধুনিক শিল্পধারা বিনির্মাণে তার অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য এ দেশের শিল্পীসমাজ শিল্পাচার্য উপাধি দিয়েছে, তিনি সবার ‘শিল্পাচার্য জয়নুল’।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিখ্যাত শিল্পীদের অধিকাংশই তার শিক্ষার্থী, অন্যরা সহকর্মী। কিন্তু সহকর্মীরাও তাকে গুরু মানতেন, তার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করতেন। সে হিসেবে দেশের বিখ্যাত সব শিল্পীরাই তার শিক্ষার্থী। তাকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি প্রদানের এটিও একটি কারণ। তার স্নেহধন্য এই শিল্পীদের স্মৃতিকথা থেকে শিক্ষক ও শিল্পী জয়নুল আবেদিন সম্পর্কে জানা যায়।
তার শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়ে শিল্পীসমাজে নানা গল্প প্রচলিত আছে। সেগুলো লাভ করেছে কিংবদন্তির সম্মান। একবার ক্লাসে শিল্পাচার্য শিক্ষার্থীদের বললেন, রসগোল্লা আঁকতে। শিক্ষার্থীরা সবাই এঁকে নিয়ে গেল। ছবিগুলো দেখে জয়নুল আবেদিন বললেন, গোল গোল আঁকলেই রসগোল্লা হয় না। রসে ভেজা রসগোল্লার মধ্যে একটা নরম নরম ব্যাপার থাকে। সেটা আঁকতে হবে। তারপর তিনি শিক্ষার্থীদের বোঝালেন কীভাবে বস্তুর ভাব কাগজেও ফুটিয়ে তুলতে হয়।
আরেক দিন ক্লাসে তিনি শিক্ষার্থীদের বললেন বাছুর আঁকতে। শিক্ষার্থীরা এঁকে আনল। সবারটা দেখার পরে বললেন, গরু ছোট করে আঁকলেই বাচুর হয় না। তিনি আরও বললেন, বাবারা গরুর নানা ধরন আছে। দুপুরের গরু এক রকম। সন্ধ্যার গরু আরেক রকম। সকালের গরু খুব পুরুষ্ট। দুপুরের গরুর পেট চিমসে যায়। সন্ধ্যার গরু মলিন ও ক্লান্ত। গরু আঁকলেই কি আর গরু হবে। গরুর ভাবটা আঁকতে হবে।
গভীর উপলব্ধি আর সচেতনতা যেমন তার ছবিতে ধরা পড়ত তেমন তার কথায়, বাক্যে ও শিক্ষণ পদ্ধতিতে। সর্বনিম্ন আঁচড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন অন্তর্নিহিত ভাব। তেমনি একটি-দুটি বাক্যে তিনি তুলে ধরতেন জাতির গভীর অসুখ। তার ‘এখন আমাদের দুর্ভিক্ষ নেই কিন্তু চারদিকে আছে রুচির দুর্ভিক্ষ’ কথাটি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি সারাজীবন বাঙালির রুচি নির্মাণে কাজ করে গেছেন। সবার ভেতরে সংবেদনশীলতা প্রোথিত করে দিতে চেয়েছেন।
শিল্পী মনিরুল ইসলাম একবার স্মৃতিচারণ করেছেন, তিনি ও আরও কয়েকজন শিল্পী একবার নৌকায় করে বেড়াতে গেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে। তাদের ইচ্ছা নৌকায় বেড়াতে বেড়াতে তারা ছবি আঁকবেন। নৌকার, কচুরিপানার, নদীতীরের, গ্রামের মানুষের নদীঘনিষ্ঠ জীবনের। তারা একে একে আঁকতে থাকলেন ছবি। জয়নুল আবেদিনের জন্যও রঙ তৈরি করলেন, তাকে আহ্বানও করলেন আঁকতে। জয়নুল কিন্তু নিমগ্ন হয়ে নৌকায় বসে থাকলেন। তারপর যখন তীরে নামলেন তখন শিল্পী মনিরুল ইসলামকে বললেন, কী মিয়া রঙতুলি দাও। একটা ছবি আঁকি। মনিরুল ইসলাম তাড়াতাড়ি সবকিছু তৈরি করে দিলেন। জয়নুল আঁকতে থাকলেন ছবি। বিহ্বল মনিরুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, কী মিয়া নৌকার দুলুনি টের না পাইলে নৌকা আঁকবা কেমনে? পানির মধ্যে নৌকা কেমনে দোলে ঐটা আঁকতে সময় লাগে। বুঝলা?
এভাবেই শিল্পী জয়নুল আবেদিন কী ক্লাসরুমে কী ক্লাসরুমের বাইরে শিখিয়েছেন শিল্পের দুরূহতম, নিগূঢ় কৌশল। এজন্যই তিনি শিল্পাচার্য।
সুলতানা রাজিয়া
(আমীরুল ইসলামের ‘শিল্পীদের গল্প’ বই অবলম্বনে)
