দশদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন এক তরুণী চিকিৎসক। গত শুক্রবার সকালে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের চার তলার সেমিনার হল থেকে উদ্ধার হয় তরুণী চিকিৎসকের অর্ধনগ্ন মরদেহ।
এই ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতের মানুষ। বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
মেয়েকে হারিয়ে শোকে কাতর বাবা-মা, তবে লড়াইতে সবাইকে পাশে পাওয়ায় সুষ্ঠু বিচারের আশা তাদের। কলকাতার উত্তরের শহরে থাকেন তাঁরা।
তরুণী চিকিৎসকের বাবা বলেন, “আমার একটা মেয়ে চলে গেছে, কিন্তু এখন তো কোটি কোটি ছেলে মেয়ে আমার। এই এই কোটি কোটি ছেলে মেয়েরাই তো আমার যে মেয়ে চলে গেছে, তার জন্য লড়াই করছে, তার হয়ে বিচার চাইছে।”
তরুণী ওই চিকিৎসকের হাতে লেখা একটা প্রেসক্রিপশন ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে। সাধারণত ডাক্তারদের হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন বোঝা দায় হলেও ওই প্রেসক্রিপশনটি গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, আবার বাংলায় লিখে বুঝিয়ে দেওয়া যে কোন ওষুধ কখন খেতে হবে।
খুব ভালো চিকিৎসা করত বলে জানায় তরুণী চিকিৎসকের এলাকার মানুষজন। এক দোকানদার বলেন, “আমার বোনের জামাই ডাক্তার, কিন্তু দরকারে ওর সঙ্গেই কথা বলতাম।”
পাড়ার একজন নারী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “খুব ভাল ডায়াগনোসিস করত ও।”
ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বক্ষ-রোগ বিভাগ বা চেস্ট মেডিসিনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি ছিলেন ওই চিকিৎসক। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করছিলেন তিনি।
ওই চিকিৎসকের বাবা জানান, “আগে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল না মেয়ের। ও চেয়েছিল ফিজিক্স নিয়ে পড়তে। তবে একটা সময়ে বলে যে ফিজিক্স নিয়ে পড়ার থেকে ডাক্তারিতে চান্স পাওয়া অনেক সোজা। আমরা বলেছিলাম তুই যেমন ভাল বুঝিস, সেটাই কর।”
বর্তমানে তরুণী চিকিৎসকের বাড়ির গলির মুখে, গলির উল্টোদিকে, বাতি-স্তম্ভে কোথাও তার মুখঢাকা ছবির সামনে কিছু ফুল আর মোমবাতি, কোথাও টাঙ্গানো ব্যানার। সেখানে লেখা “আমরা আমাদের পাড়ার মেয়ের বিচার চাই।”
ওই গলি দিয়েই আটই আগস্ট সকাল আটটা ১০ মিনিটে হাসপাতালের ডিউটিতে বেরিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক, শেষ বারের মতো। একটানা ৩৬ ঘণ্টা ডিউটিতে থাকার কথা ছিল। তার মধ্যেই তাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় হাসপাতালেই।
“বিকেলে একবার ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল, রাত সওয়া ১১টা নাগাদ আরেকবার। সেটাই ওর সঙ্গে আমাদের শেষ কথা,” বলছিলেন ওই চিকিৎসকের বাবা।
প্রথমে চান্স পেয়েছিলেন ডেন্টালে
উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে ডাক্তারি-র প্রবেশিকা জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। মেডিক্যাল এন্ট্রান্স দিয়ে প্রথমবারে ডেন্টালে চান্স পেয়েছিল। পরের বার আবারও জয়েন্ট দিয়ে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পায় কল্যাণীতে।” জানাচ্ছিলেন ওই চিকিৎসকের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী।
এমবিবিএস পাশ করার পরে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে কাজ করেন তিনি। তারপর তিনি আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন স্নাতকোত্তর পড়তে।
“করোনার সময়ে ও (নিহত তরুণী) মধ্যমগ্রামের একটা হাসপাতালে কাজ করত। পুরো সময়টায় ও একদিনও ছুটি নেয়নি” জানান ওই প্রতিবেশী। এমনকি করোনার সময় নিজের জমানো লাখ খানেক টাকা বাবার ব্যবসা কারখানার কর্মীদের দিয়ে সাহায্য করেছিল সে, বলেন প্রতিবেশী।
‘পড়াশোনা নিয়েই থাকত ও’
ধর্ষণের শিকার ও খুন হওয়া ওই চিকিৎসকের প্রতিবেশী জানান, নিহত তরুণী চিকিৎসক পড়াশোনা নিয়ে থাকতে ভালবাসত। ওর পড়ার ঘরে মোটা মোটা সব ডাক্তারির বই, নোটস রয়েছে।
তার বাবা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই খুব নিয়ম মেনে চলত আমার মেয়ে। চিরকাল বাংলা মাধ্যমের সরকারি স্কুলে পড়েছে।“
“নাইন-টেন থেকেই কখন কোন সাবজেক্ট পড়বে, কী পড়বে, সব আগে থেকে ছক কষা থাকত ওর। পড়াশোনা নিয়েই থাকত, আর বিশেষ কোন আগ্রহ ছিল না,” বলছিলেন ওই চিকিৎসকের বাবা।
‘লড়াইটা মনে হচ্ছে জিতব’
মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চেয়ে যেভাবে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছে, তাতে মনের জোর পাচ্ছেন ওই চিকিৎসকের বাবা।
তিনি বলেন, “এখন কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। প্রথমদিকে প্রমাণ নষ্ট করার অনেক চেষ্টা হয়েছে, তার কিছু প্রুফ আমাদের কাছে আছে। ওইরকম একটা খবর পেয়ে আমরা কী তখন প্রমাণ রাখার চেষ্টা করব না কী মেয়ের কী অবস্থা সেদিকে মন দেব! কিন্তু বিচারাধীন বিষয় যেহেতু, তাই এর বেশি কিছু বলা যাবে না।”
মেয়ের ডিপার্ট্মেন্ট থেকে কোন সহযগিতা পাননি বলে অভিযোগ জানান তিনি। বলেন, “ওর ডিপার্টমেন্ট আমাদের সঙ্গে একদমই সহযোগিতা করে নি। কিন্তু এরকম যে একটা কিছু হতে যাচ্ছে, সেটা ও-ও আঁচ পায় নি, আমরাও কিছু বুঝি নি। হাসপাতালের ব্যাপারে বাড়িতে যেটুকু যা কথাবার্তা বলত, তাতে এরকম যে কিছু হতে পারে, সেটা বোঝাই যায় নি আগে।”
কিন্তু এখন তার মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চেয়ে যেভাবে মানুষ পথে নেমেছেন, তাতে মনোবল বেড়েছে ওই চিকিৎসকের পরিবারের, পাড়া-প্রতিবেশীদের। আবার সামাজিক মাধ্যমে অনেক ভুয়া কথাও ছড়ানো হচ্ছে, ছবি শেয়ার করা হচ্ছে, এগুলোও ব্যথিত করছে পরিবারকে, প্রতিবেশীদের।
“এত প্রতিবাদ, বিচারের দাবিতে সারা পৃথিবীতে মিছিল, এসব দেখে এখন আমাদের মনে হচ্ছে যে লড়াইটা হয়তো জিতব আমরা,” জানাচ্ছিলেন ওই চিকিৎসকের এক প্রতিবেশী।
সূত্র: বিবিসি বাংলা