সেল্ফ সেন্সর বা নিজে নিজে নিয়ন্ত্রিত না হতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে। এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মন-মনন আগে থেকেই পরিষ্কার তথা ইতিবাচক। তার ওপর স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কথা বলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সেন্সর বোর্ড পুনর্গঠন এবং সাইবার সিকিউরিটি আইন পুনর্বিবেচনার কথাও বলেছেন। নিজের ছবি কম প্রচারের জন্য গণমাধ্যমকে অনুরোধও করেন নাহিদ ইসলাম। শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের অন্যতম প্রধান আহ্বানও ছিল তার বন্দনা না করা, বিশেষ করে তার ছবি দিয়ে বৈজ্ঞাপনিক কায়কারবার না করার, যা আগের জমানায় চলেছে হরদম।
বিভিন্ন মহলের কাছে তার এ বার্তা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য। আর সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার। সাংবাদিকদের দিক ঠিক করার একটি মোক্ষম বার্তা ও সুযোগও। একটি দেশে গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তার উল্লেখযোগ্য সূচক হলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। কিন্তু, এই স্বাধীন থাকার চেয়ে নিজেকে অধীনস্ত করে গোটা পেশাটিকে কলঙ্কিত করার একটি বাতিক সময়ে সময়ে দেখতে হয়েছে। ভুগতেও হয়েছে। তারা সংখ্যায় বেশি নয়, তবে, শক্তিতে বলীয়ান। ধারে-ভারে মারাত্মক। তাত্ত্বিক বা পুঁথিগতভাবে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। ইংরেজিতে ফোর্থ স্টেট। সেই অবস্থাটা বরবাদ করে গোটা গণমাধ্যমকে কলঙ্কিত করে নিজ তেলে তেলতেলে হওয়া গুটিকতক সাংবাদিকের দুষ্কর্ম আমাদের দেখতে হয়েছে। সরকারের নানা আইন ও বিধির বেড়াজালকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগোয়ান এই জীবেরা গোটা সাংবাদিক মহলকে দিকহারা করেছেন। সাংবাদিক নামের সঙ্গেই ‘দিক’ শব্দটা রয়েছে। সাংবাদিকদের এই ‘দিকটাও’ তারা কলঙ্কিত করেছেন। যার অনিবার্য পরিণতিতে সাংবাদিক পেশাটিই সমাজের নানা স্তরে বাঁকা চোখের শিকার। গালমন্দ শোনার পাত্র।
সরকার বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর রাজনীতিক বা কিছু আমলার গা ঢাকা দেওয়ার সঙ্গে মানুষ পরিচিত। এবার সেখানে যোগ হয়েছে সাংবাদিকদের এদিক-ওদিক চম্পট দেওয়া। পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য তা কত বেদনার, জানেন কেবল ভুক্তভোগীরা। এমনিতেই পেশাটি শারীরিক-মানসিকভাবে চরম ঝুঁকির। তার ওপর এ পেশায় একবার জড়িয়ে গেলে আর ফেরার উপায় থাকে না। অন্য কোনো কাজে তারা আর মানানসই হতে পারেন না। তার ওপর আইনি যন্ত্রণা ও অমর্যাদার বিষয় রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারগুলোর বর্ণনার এক জায়গায় ৩৯ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের (খ) ধারায় যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। কিন্তু প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর মতো ধারা নিয়ে ছিল আপত্তি। যেখানে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলের ক্ষমতা ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। ১৯৯১ সালে সেই ক্ষমতা রহিত করে যুগান্তকারী এক উদ্যোগ নেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। সাংবাদিকদের খবরের সূত্র প্রকাশে চাপ দেওয়ার আইনও বাতিল হয়। ১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টে সংবাদপত্রের বিষয়ে দুটি কালো বিধিও বাতিল হয়।
এ ছাড়া সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য অনুমতির জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার রীতিও কিছুটা শিথিল হয়। আইন করা হয় ডেপুটি কমিশনার যদি কাউকে ৬০ দিনের মধ্যে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি না দেন, তাহলে সেটি প্রেস কাউন্সিলে আসবে এবং কাউন্সিল যা সিদ্ধান্ত দেবে, সেটিই মেনে নিতে হবে। এর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আপিল চলবে না। গণআন্দোলনে এরশাদ পতনের পর ওই পদক্ষেপটি যে সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমে যুক্তদের জন্য কত সম্মান ও মর্যাদার, সেই বোধ ক’জনের এসেছিল? বিশেষ করে বিগত সরকারের সময় নানান আইন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপানো হয়েছে। দলান্ধতার মশগুলে তা বেমালুম ভুলে সরকারের স্তুতি-বন্দনায় মত্ত থেকেছেন অভিভাবকের আসন গেড়ে বসা সাংবাদিকরা। প্রায় ৩৪ বছর পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের আবারও মান-ইজ্জতের দিকে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এখন সাংবাদিকরা এদিকে-ওদিকে না গিয়ে কোনদিকে কেবলামুখী হবেন, এটা তাদেরই বিষয়। নতুন কোনো রাজনৈতিক গলিতেই ঢুকবেন না নিজেদের জাতে তুলবেন?
সাংবাদিকতার নামে মোটাতাজা হওয়া দলকানা ছাড়া সবারই জানা, গত দশকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ক্যাজুয়ালটির শিকার ছিল গণমাধ্যম। রক্তক্ষয়ী জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্যায়ে মুক্ত সাংবাদিকতা চর্চার সুযোগ এসেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যেহেতু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখতে উদ্যোগী হতে পারেননি, তারা এখন কোন মুখে পেশাদার হবেন এমন ইতস্ততের মধ্যেও চাইলে কাজটি অন্তত শুরু করতে পারেন। পুরো দোষ কোনো সরকার বা মহলকে না দিয়ে নিজের কাছেও কিছু রাখা চাই। ভুল শিকার করে কান ধরে উঠবসের দরকার করে না। একটু আত্মসমালোচনাই যথেষ্ট। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাষ্ট্র পরিচালনার মতোই মিডিয়াকে করায়ত্ত করে ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারোট আপ্রোচ’ (লাঠির সঙ্গে গাজর)’ আখেরে নিস্তার দিতে পারেনি। একটি গোষ্ঠীকে হালুয়া-রুটিতে রেখে বাকিদের ভয় দেখিয়ে শেষতক চুপ রাখা যায়নি।
যার জেরে এই শাসন-তোষণ কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখা যায়নি। অনুগতরা শেষদিকে পালানোর গলি খুঁজেছেন। ক্ষমতার বড় ভাইরা পালানোর সময় তাদের নিয়েও যাননি। হিজ হিজ-হুজ হুজে যার যার মতো যে যেখানে পেরেছেন আপনা প্রাণ বাঁচিয়েছেন। অথচ তারা রাষ্ট্রের চতুর্থ খাম্বা। এই খাম্বা বা স্তম্ভের অপমানের ভাগিদার হতে হয়েছে মাঠে কাজ করা পেশাদার সাংবাদিকদেরও। লাজ-শরমে প্রিজারভেটিব মাখা চম্পটওয়ালাদের কথা আলাদা। তাদের বাঁচতে পেরেই সন্তুষ্টি। বিষয়টি গোটা পেশার জন্য একটি ধাক্কা। এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার রাস্তা করে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা, তথ্য উপদেষ্টাসহ সরকারের শীর্ষে আসীনরা। এখন সুযোগটি নেওয়ার পর্ব। বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতার সদ্ব্যবহারের সক্ষমতা ও সৎসাহসে ঘাটতির মধ্যেও পেশাদার-কমিটেড সাংবাদিকরা তা অন্তত শুরুটা করতে পারেন।
রাষ্ট্র মেরামতের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যম পুনর্গঠন ও মানবসম্পদের গুণগত মানের পরিবর্তন না এনে উপায় নেই। শুরু হলে গণমাধ্যমের উন্নয়ন ও গবেষণাসংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকায় আসবে, সেই আশা ও বাস্তবতা অত্যন্ত বিদ্যমান। খাঁচায় পোষা পাখির মতো বেসরকারি গণমাধ্যম নতুন পাওয়া স্বাধীনতা ভোগ করতে গিয়ে শুরুতে একটু আধটু আছাড় খেলেও পরে অবশ্যই দাঁড়াবে। দিক খুঁজে নেবে। পেশাদারিত্ব হারানো গণমাধ্যমের যুগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের মধ্যে সাংবাদিকদের সেই সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। নৈতিকতা হারানোর পাশাপাশি পাঠক বা দর্শক হারানো মিডিয়া রাজস্ব আয়ের সংকটে ভুগছে। ‘এসো নিজে করি’ অনুশীলনের মতো তাদের নিজে নিজে ঘুরে দাঁড়ানোর মুরোদ নেই। তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সরকার ও অংশীজনের উদ্যোগ দরকার। নইলে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে তাদের মধ্যে গিরগিটির রঙ বদলানোর কসরতের শঙ্কা থাকবে। টানা ১৫-১৬ বছরের অভ্যাস-চর্চার একটি বিষয়ও আছে।
গিরগিটি রঙ বদলায় আত্মরক্ষায়, মানুষ রঙ বদলায় কেবল স্বার্থরক্ষায়ই নয়, অনেকে অভ্যাসেও রঙ বদলায়। এখানেই ভয়। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশে অনেক কিছু সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্যই গণমাধ্যমকে প্রাধান্য দিতেই হবে। নইলে অন্যসব সংস্কার ব্যর্থ হতে সময় লাগবে না। স্বশাসিত পেশা ও ব্যবস্থা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতাকে মর্যাদায় ফেরাতে না পারলে, রাজনীতির চোরাগলি থেকে রক্ষা করতে না পারলে গিরগিটির মতো রঙ পাল্টানোর বিমারি কোনোদিন সারবে না। চাটুকারিতা, মোসাহেবি, তোষামোদি, স্তাবকতা, পদলেহন একটাও সাংবাদিকের কাজ নয়। পেটে ভাত না থাকলেও নামে তারা ‘মহান’। এই মহত্ত্ব কীভাবে নানা মহলে আদাব-সালামে ক্ষয় হয়, নানান ভাইয়ের খাস কামরায় হাত কচলানিতে বরবাদ হয় তা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। কারণে-অকারণে এমনিতেই সাংবাদিকদের তেলবাদিক-চাম্বাদিকসহ কত গালমন্দ হজম করতে হয়। আলু, পট্লো, ডাঁটা, ঝিঙা, পুঁইশাক বাদ দিয়ে বেগুনবাদিকও যোগ হয়েছে তাদের সঙ্গে। এটা নিয়তি, নাকি একের পাপে বাদবাকি সাংবাদিকদের নিপাতনে সিদ্ধ হওয়া প্রশ্নটি আর নিষ্পত্তিহীন রাখা যায় না।
এমন অবস্থায় আর এদিক-ওদিক নয়, নিজের দিক এখন সাংবাদিকদের খুঁজতেই হবে। সামনের দিনগুলো উজ্জ্বল হোক। এর আগে দরকার নিয়ত করা। অনেক হয়েছে। আর নয় প্লিজ। না দুস্থ, না অসুস্থ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংবাদিকদের সংবিধান কর্র্তৃক স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। আর অধিকার মানে মর্যাদা। কোনো দল বা পক্ষের কাছে মাথা নুইয়ে, হাত চুলকিয়ে নিজেকে দলীয় কর্মী বা চাকর-নফরে পর্যবসিত করার নোংরা পথে হাঁটা যার যার বিষয়। তা মোটেই সাংবাদিক বা সাংবাদিকতার বিষয় নয়। চাটুকারিতা না করার নসিহত তো এবার রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায় থেকেই এসেছে। দেওয়া হয়েছে মর্যাদার আশ্বাসও।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
