সেই ভিসি চক্রের থলিতে ১০০ কোটি

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৩২ এএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ ও তার পিএস ডা. রাসেলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া এই চক্রের বিরুদ্ধে পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার বাণিজ্য ও বিদেশ ভ্রমণের নামে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেছেন, বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ, তার পিএস ডা. রাসেল ও অন্যদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য করে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়, অবৈধভাবে পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ প্রদান ও বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন দুর্নীতিবাজ ভিসি দেখা যায়নি। তার সময়ে টাকা ছাড়া কোনো নিয়োগ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের নিয়ে তিনি এমন বলয় তৈরি করেছেন, যা ভেদ করা কঠিন। তার কথাই এখানে শেষ কথা ছিল। নিজের খেয়াল খুশিমতো কাজ করতেন। তিনি তার দুই ছেলে, ছেলের স্ত্রী, বোন, ভাগ্নিসহ বহু আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দিয়েছেন। তার ভাগ্নি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার ছাড়া কাজ করছেন। ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও ক্লাস নিলে ক্লাসপ্রতি ২ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। তিনি বিদেশে গেছেন বিদেশি সংস্থার টাকায়, অথচ দেশে ফিরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে সেই টাকা তুলেছেন। তার সিন্ডিকেট যেভাবে লুটপাট করেছে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবা ও শিক্ষার মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তারা আরও জানান, ভিসির দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী পিএস ডা. রাসেল ঘুষ নিয়ে চাকরি না দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে নিজ অফিসকক্ষে হেনস্তার শিকার হয়েছেন।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, বিএসএমএমইউ ভিসি পদে ২০২১ সালের ২৯ মার্চ অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অনুগত বিভিন্ন বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন। সেই চক্র গত তিন বছরে দুই হাজারের বেশি জনবল নিয়োগ দেন। তার সময়ে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে পদমর্যাদা অনুযায়ী জনপ্রতি ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি প্রদানে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। শুধু জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি পকেটস্থ করেছেন ভিসি ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তার শেষ কর্মদিবস ছিল ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ। ওইদিনও পাঁচজনের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করে যান তিনি।

ছেলে ও ছেলের স্ত্রীসহ ১০ জনকে চাকরি প্রদান : ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তার ছেলে ডা. তানভীর আহমেদ, হেড-নেক বিভাগের মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরি দেন। ছেলের স্ত্রী ডা. ফারহানা খানম ফারহাকে মেডিকেল অফিসার, ভাগ্নে এসএম বাহালু পিয়াসকে তৃতীয় শ্রেণি, ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী শারমিন আক্তারকে দ্বিতীয় শ্রেণি, ভাগ্নে লিয়াকত হোসেন ফকির, শ্যালিকার পুত্র এবং পিএসের ভাতিজাকে চাকরি দেন। এ ছাড়া ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ডা. হাসনাত সাইদুল ইসলাম ও ডা. নওরীন আনোয়ারকে মেডিকেল অফিসার পদে চাকরি দেন। ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ডা. সুমাইয়া ফাজরিন এবং ২ অক্টোবর ডা. সানজানা কামালকে মেডিকেল অফিসার পদে চাকরি দেন। এরপর ২০২২ সালের ২৩ মার্চ তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।

৩৭৪ কর্মচারীর স্থায়ীকরণ বাতিল করে ৫৫০ জন নিয়োগ : ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়ার দায়িত্ব পালনের শেষদিকে ২০২১ সালের ২২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ৬৪ ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১০ জনসহ ৩৭৪ জন অস্থায়ী কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণের আদেশ জারি করেন। এ আদেশ জারির কয়েক দিন পর ২৯ মার্চ বিএসএমএমইউর ভিসি পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি কর্মস্থলে যোগদানের পরই আগের ভিসির ৩৭৪ জন কর্মচারীর স্থায়ীকরণ আদেশ বাতিল করেন। পরে তাদের আবার পরীক্ষার নেওয়ার নামে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করে নিয়ে স্থায়ী নিয়োগপত্র দেন। তখন প্রায় ৫৫০ জনকে স্থায়ীকরণ করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবগত আছেন।

২০০ নার্স নিয়োগে অনিয়ম : ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে তিনজন প্রো-ভিসির মাধ্যমে তিনটি পৃথক নিয়োগ কমিটি করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তিনটি ভাইভা বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়। কিন্তু কমিটির কাছ থেকে ভাইভার রেজাল্ট না নিয়ে ভিসি তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে তালিকা করে ২০০ জনের স্থলে ৬৭০ জন নিয়োগ দেন। প্রতিজনের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবগত আছেন।

ছেলেকে অবৈধভাবে কোর্সে ভর্তির সুযোগ : সাবেক ভিসি শারফুদ্দিন আহমেদ তার ছেলে ডা. তানভীর আহমেদকে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি কোর্স সম্পন্ন করান। এক কোর্স শেষ হওয়ার দুই বছর পর কোর্স করার নিয়ম। অথচ চাকরি পাওয়ার দুই বছরে দুটি কোর্স লাভ করেছেন শুধু উপাচার্যের সন্তান হওয়ার কারণে। আর তার ছেলে ডা. তাজবীর আহমেদ শিক্ষা ছুটি নিয়ে পাঁচ বছর বিদেশে অবস্থান করছেন। ছুটি শেষ হওয়ায় আরও চার বছরের বিদেশে শিক্ষা ছুটি দিয়েছেন, যা নজিরবিহীন।

টেন্ডার ছাড়াই চলছে কাজ : সিন্ডিকেট সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইয়ার-ই-মাহবুবকে মিডিয়া সেলের প্রধান বানিয়ে প্রকাশনার মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়েছেন। ডা. ইয়ার-ই-মাহবুব পরশ প্রিন্টারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কাজের নামে এ টাকা আত্মসাৎ করেন। তার সমাবর্তনে ভুলভরা ম্যাগাজিন ও ব্যাগ ছাপিয়ে এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছাড়াই কনভোকেশন করে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সিন্ডিকেট সদস্য ডা. ফারুক মুন্সির বিরুদ্ধে শাহবাগ খানায় কিডনি চুরির মামলা চলছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যান্টিন, ক্যাফেটারিয়া, আউটসোর্সিং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন। টেন্ডারে কোনো ধরনের পিপিআর অনুসরণ না করে পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

মালয়েশিয়ার ভ্রমণের খরচ দাবি : বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি ডা. শারফুদ্দিন মালয়েশিয়ার ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির সঙ্গে এমইইউ স্বাক্ষর করতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মালয়েশিয়া গমণ করেন। তার যাতায়াতসহ সব খরচ মালয়েশিয়ান ইউনিভার্সিটি কর্র্তৃপক্ষ বহন করে। তিনি দেশে উড়োজাহাজ ভাড়ার ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৭ টাকা বিল প্রদানের জন্য উপস্থাপন করেন। বর্তমানে বিল প্রদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ক্লাসপ্রতি নিচ্ছেন ২ হাজার টাকা : বিএসএমএমইউর ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে অনারারি হিসেবে কোনো শিক্ষক একদিন ক্লাস নিলে তাদের সম্মানী হিসেবে অধ্যাপককে ২ হাজার, সহযোগী অধ্যাপককে ১ হাজার ৫০০, সহকারী অধ্যাপককে ১ হাজার টাকা প্রদান করা হয়ে থাকে। অথচ বিএসএমএমইউর নিজস্ব অধ্যাপক হয়েও তিনি ২০২২ সালের জুন মাসে চারটি এবং জুলাই মাসে দুটি ক্লাস করিয়ে ১২ হাজার টাকার বিল নিয়েছেন।

২০০৪ সালে পদোন্নতি পান, কিন্তু কার্যকর ২০০১ সাল থেকে : ডা. শারফুদিন মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি ডিপ্লোমা সনদ দিয়ে সহকারী অধ্যাপক হন। তিনি ২০০১ সালে সহকারী অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন। তখন তার এমএস ডিগ্রি ছিল না। পদোন্নতি ক্ষেত্রে এমএস ডিগ্রি অর্জনের সনদ থাকতে হবে। পরে ২০০৪ সালের ২৪ এপ্রিল ডা. শারফুদ্দিন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবার আবেদন করেন। আবেদনের পর ৯ নভেম্বর চারটি শর্তে তাকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে তার পদোন্নতি কার্যকর হবে। কিন্তু তৎকালীন ভিসির আদেশে পদোন্নতি ২০০১ সাল থেকে কার্যকর দেখানো হয়। তিনি ২০০১ সালের জুলাই থেকে সহযোগী অধ্যাপকের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত