রাস্তার লড়াইয়ের কয়েকটি দিক

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৪, ১২:৪৪ এএম

তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়েছে পাকিস্তানও। লড়াইয়ে নেমেছে ভারতের কলকাতা। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণরা অধিকার আদায়ে রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। ইতিমধ্যে সফল হয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে শ্রীলঙ্কায়ও সফল হয়েছিল তরুণরা। আফ্রিকার কিছু দেশেও সাফল্য ধরা দিয়েছে। র্বতমানে বিক্ষোভ চলছে ভারতের কলকাতায় এবং পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে। সেখানেও তারা সফল হবে বলেই ধারণা। পাকিস্তানের গবেষক ও লেখক ড. নিয়াজ মুর্তজা দ্য ডন-এ লিখেছেন, কার্নেগি গ্লোবাল প্রোটেস্ট ট্র্যাকার ২০১৭ সাল থেকে ১৪৭টি দেশে ৭০০-রও বেশি রাস্তার বিক্ষোভের তালিকা করেছে। রাস্তার প্রতিবাদগুলো এখন শাসনের বিরোধিতা এবং পতনের প্রধান উপায় হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বব্যাপী রাস্তার প্রতিবাদগুলো কী অর্জন করে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। ৭০০-র বেশি বিক্ষোভের প্রায় দুই- তৃতীয়াংশের ফলে কোনো নীতি বা শাসনের পরিবর্তন হয়নি। প্রায় অর্ধেক বিক্ষোভ এক সপ্তাহ বা তার কম স্থায়ী হয়। অসংগঠিত গোষ্ঠীর নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্ত কিছু প্রতিবাদ দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ছাড়াই শেষ হয়ে যায়।

তিনি বলছেন, বাংলাদেশ এবং আগে শ্রীলঙ্কায় যে বিস্ময়কর বিক্ষোভ ঘৃণিত শাসনের পতন ঘটিয়েছে, তা অনেক পাকিস্তানিকে ঈর্ষান্বিত করেছে যে কেন আমরা একই কাজ করতে পারি না। কিন্তু আমরাই সম্ভবত প্রথম আঞ্চলিক রাষ্ট্র ছিলাম যারা দুবার তা করেছিল ১৯৬৯ সালে বিক্ষোভ আইয়ুব খানের শাসনের পতন ঘটিয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলি ভুট্টোর সরকারেরও পতন ঘটে বিক্ষোভের মাধ্যমে।

রাস্তার বিক্ষোভ জিয়াউল হক এবং পারভেজ মুশাররফকে দুর্বল করে দিয়েছিল এবং যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে তাদের পতন ঘটায়।

বিক্ষোভ বাড়ছে

বিশ্ব জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, কাছাকাছি সময়ে আফ্রিকার দেশ কেনিয়া থেকে শুরু করে এশিয়ার ভারতেও বিক্ষোভ চলছে। কয়েক মাস আগে গবেষকরা বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। জার্মানিতে কৃষকরা এ বছর তুমুল বিক্ষোভ করেছেন। ইউরোপের দেশ বেলজিয়াম থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার ভারতে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ হয়েছে। প্যারিসে অলিম্পিক আয়োজনেও প্রতিবাদ দেখা গেছে। গবেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অবিচার, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আরও নানা কারণে ২০০৬-২০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে অনেক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখা গেছে। বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব বিক্ষোভে কী ভূমিকা রেখেছে তা নিয়েও কথা বলেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, ১৯৬০-এর দশককেও ছাড়িয়ে গেছে সাম্প্রতিক দেড় দশকের বিক্ষোভের মাত্রা। তবে এসব প্রতিবাদ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন কতটা সাধন করতে পারে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন গবেষকরা। তাদের প্রতিবেদনে জানা যায়, স্বল্প মেয়াদে হলেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ জনমত, নীতি এবং রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

পতন ও পরে

ড. নিয়াজ মুর্তজা বলছেন, এত বিপুল সংখ্যায় বিক্ষোভের মধ্যে ১০টিরও কম সরকার পতন ঘটেছে এবং মিডিয়া তাদের বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি বলছেন, ইরানের বিক্ষোভ একটি গণপন্থি ব্যবস্থার দিকে পরিচালিত করেনি। কিছু রাষ্ট্র, আরব বসন্ত হয়েছিল যেখানে, যেমন লিবিয়া ও ইয়েমেন ব্যর্থ হয়েছিল। আবার মিসরে দ্রুতই স্বৈরাচার ফিরে আসে। এভাবে রাস্তার প্রতিবাদ সর্বোত্তমভাবে স্বৈরাচারীদের পতন ঘটাতে পারে কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না। তিনি বলছেন, প্রতিবাদে নেতৃত্বদানকারীদের শক্তিশালী সমতাবাদী এজেন্ডা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতাসহ টেকসই সামাজিক বা রাজনৈতিক রূপান্তরের সক্ষমতা থাকতে হবে। তিনি বলছেন, স্বৈরাচারের পাথর ভাঙার পর সেটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এসব টুকরোকে আবার সাজিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছেনি বা হাতুড়ি। সেই দক্ষতাও আন্দোলনকারীদের থাকতে হবে। ফলে যদি শুধু রাস্তার আন্দোলনে বিজয় ছিনিয়ে এনে আবার ফিরে যেতে হয় আগের অবস্থায়, তাহলে বিক্ষোভের কোনো মূল্য থাকে না।

তিনি বলছেন, এটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের কি তার (শেখ হাসিনার শাসন) চেয়ে ভালো করার কোনো স্পষ্ট এজেন্ডা আছে? এটি লক্ষণীয় যে তারা

প্রাথমিকভাবে চাকরির কোটার এক দফা এজেন্ডা দিয়ে শুরু করেছিল, যা হাসিনা বাতিল করেছিলেন কিন্তু আদালত পুনর্বহাল করেছিল। সুতরাং, প্রতিবাদ শুরু করার সময়, তারা অদ্ভুতভাবে তার স্বৈরাচারী ক্রিয়াকলাপের দিকে খুব কম ফোকাস করেছিল। এ ছাড়া তারা নির্বাচনে কারচুপি, মিডিয়া এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউন নিয়ে চুপ ছিল। ধীরে ধীরে তারা তাদের এজেন্ডা প্রসারিত করেছে কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ দৃষ্টি এখনো অস্পষ্ট। আওয়ামী লীগ ছিল বাম দিকে ঝুঁকে থাকা দল, যা সময়ের সঙ্গে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ নেই এমন অবস্থায় আরও ডানপান্থ রাজনীতির উত্থান ঘটতে পারে, যদি না ছাত্ররা দ্রুত একটি উদার বিকল্প প্রদান করে।

নতুন প্রজন্ম

দেখা গেছে নতুন প্রজন্মই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে বর্তমান সময়ে। যাদের জেন-জি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশে তারা সফলও হয়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকার দেশগুলোতেও এ প্রজন্ম রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে তৎপর। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জেনারেশন জেড বিক্ষোভ করে। কেনিয়ার সংসদে একটি আর্থিক বিলের প্রস্তাব আনার পর দেশটির তরুণরা বিদ্রোহ শুরু করে। অনেকটা বাংলাদেশের মতো সেখানে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। জেনারেশন জেড নামে পরিচিত তরুণ এ প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা হারাতে বসেছে দেশটির সরকার। একইভাবে নাইজেরিয়ায়ও চলছে বিক্ষোভ। যদিও নানা ধরনের অদল-বদলের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে কেনিয়ার সরকার। তবে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বিদ্রোহে হতাহত, সংঘাত মোকাবিলা করে কেনিয়ার বর্তমান সরকার টিকতে পারবে না বলে ধারণা। ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে, দেশটির জাতীয় বাজেটের ঘাটতি কমাতে কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে নতুন ওই বিল ঘোষণা হয়। যার মাধ্যমে জনগণের ওপর বেশ কিছু নতুন কর বসানো হয়। আর এতে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে কেনিয়ার তরুণরা। তাদের বক্তব্য নতুন করের চাপ সরাসরি তাদের ওপর এসে পড়বে। আর সে কারণেই তারা প্রতিবাদ শুরু করেছে। সেই আন্দোলনই সহিংস হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টে আক্রমণ চালায়। আগুন লাগানোর চেষ্টা হয় পার্লামেন্টের একাংশে। পুলিশ পাল্টা গুলি ছোড়ে। তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের মতোই একটি বিল সংস্কারের আন্দোলনে পরে তারা হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনে সরকারের পতন দাবি করে।

গণবিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনী

রাস্তায় ক্রমাগত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়া, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে রাস্তায় টিকে থাকা এসব আন্দোলনের অন্যতম শর্ত বলে প্রতীয়মান। তবে কিছু গবেষণা বলছে, শুধু রাস্তার বিক্ষোভ নয়, গণআন্দোলন সফল করতে ভূমিকা রাখে নিরাপত্তা বাহিনীও। ‘মাস প্রটেস্ট, সিকিউরিটি-এলিট ডেফিকশন অ্যান রেভল্যুশন’ নামে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক শাসন এমনকি তীব্র গণবিক্ষোভের থেকেও টিকে থাকতে পারে যতক্ষণ না নিরাপত্তা বাহিনী (আন্দোলন দমনে) বিরত থাকে। তারা বলছে, তাদের অভিজ্ঞতা এবং তত্ত্ব দেখিয়েছে যে অভ্যুত্থান সফল হয় অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষত্যাগের মাধ্যমে। অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনী নিজেরা ক্ষমতা দখল না করে গণবিক্ষোভের পক্ষে অবস্থান নিলে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে।

গবেষণাটি আরও বলছে, তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনী শাসকের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করার ফলে অভ্যুত্থান সাফল্য পায়। তবে সেটি সরাসরি নাও হতে পারে। কৌশলেও নিরাপত্তা বাহিনী তাদের পক্ষ ত্যাগ করতে পারে। অথবা তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে পারে। বছর দুই আগে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যে কোনো স্বৈরাচারী শাসনের ক্ষমতার ভিত্তি হলো তার নিরাপত্তা বাহিনী। যতক্ষণ পর্যন্ত এর সদস্যরা গণবিক্ষোভের মধ্যেও সরকারের অনুগত থাকে, ততক্ষণ একটি শাসনব্যবস্থা খুব কমই ভেঙে পড়ে। কারণ প্রতিবাদী নাগরিকদের প্রায় সবসময়ই কর্র্তৃত্ববাদী সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শারীরিক উপায়ের অভাব থাকে। সুতরাং, গণবিক্ষোভের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে যদি গণবিক্ষোভের মাধ্যমে অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনী পক্ষ ত্যাগ করে। গবেষকরা যুক্তি দেন যে, সামরিক বাহিনী বিক্ষোভকারী জনগণকে দমন করবে তখন, যখন সরকার সামরিক সম্পদ বৃদ্ধির জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেবে। এর ফলে সরকারের পক্ষে সামরিক শক্তির অবস্থান বৃদ্ধি পায়। রাস্তার লড়াইয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য ব্যবস্থার অবস্থানের মাধ্যমে কেবল একটি অভ্যুত্থান সফল হতে পারে। যে আলোচনা আমরা উপযুক্ত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখতে পাই। শ্রীলঙ্কায় যেমন হয়েছিল। বিশ্বের ইতিহাসে যা বারবারই দেখা গেছে। যেমন, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক বিক্ষোভের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটে। এ ছাড়া বলা যায়, ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে গ্রিসের ছাত্রদের বিক্ষোভের কথা। দেশটির অসাধু সামরিক কর্মকর্তারা ১৯৬৭ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে ছাত্ররা পরে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যার ফল ওই সামরিক সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। শুধু সামরিক নয়, সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের দেশ চেকোস্লোভাকিয়ায় ১৯৮৯ সালের ১৭ নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে জড়ো হয় ছাত্ররা। ওই বিক্ষোভে হামলা চালায় দাঙ্গা পুলিশ। এ ঘটনার পর ওই বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করে। যার ফলে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেওয়া এসব বিক্ষোভে অনেক মিল আছে। যেমন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখেও বিদ্রোহে অটল থাকা, সবশেষে জনতার সম্পৃক্ততা এবং সরকার ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত