বিশ্ব মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ভূখন্ড। এই ভূখন্ডে বসবাসকারী আমজনতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও সাধ, আত্মমর্যাদা বিকাশের অধিকার লাভের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত সুদীর্ঘ সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার জাগরণ এবং আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয়ের লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনন্য ঐক্য গঠনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবার, স্বাধীন আশায় পথচলার এবং আপন বুদ্ধিমতে চলবার ক্ষমতা লাভ করে।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এই অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেয় না, কিংবা নয় সহজপ্রাপ্যও। তাকে অর্জন করতে হয়, আদায় করে নিতে হয়। আবার অর্জন করার মতো সেই আত্মমর্যাদা রক্ষা করাও কঠিন। কেননা স্বাধীনতার শত্রুর অভাব নেই। স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় কে? আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায় না কে? বেশি দামে কেনা স্বাধীনতা কম দামে বিক্রির নজির যে নেই, তা তো নয়। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে এবং স্বৈরাচার সিন্ডিকেটের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, ইতিহাসের বহু পটপরিবর্তনে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে পরিপূর্ণভাবে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জন, তা বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে এই আন্দোলনের মাধ্যমে শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য, দুর্নীতি-দুঃশাসন, দেশের মর্যাদা ও অর্থনীতিকে বন্ধক রাখার বিরুদ্ধে অযুত আত্মত্যাগ হয়েছে, তার যৌক্তিকতা ভিন্ন অর্থে পর্যবসিত হতে পারে।
ব্যবসাবাণিজ্য এ দেশে আগমন হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আসা ইংরেজদের হাত ধরে। তাদের পূর্বে মগ ও পর্তুগিজরাও অবশ্য এসেছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনায় এরা পরস্পরের শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অত্যাচারী মগ ও পর্তুগিজদের দমনে ব্যর্থ প্রায় সমকালীন শাসকবর্গের সাহায্যে এগিয়ে আসে নৌযুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ইংরেজ বণিক। ক্রমে তারা অনুগ্রহ ভাজন হয়ে ওঠে সমকালীন বিলাসপ্রিয় উদাসীন শাসকবর্গের কাছে। আর সেই উদাসীনতার সুযোগেই রাজপ্রাসাদ-অভ্যন্তরে কূটনৈতিক প্রবেশ লাভ ঘটে ইংরেজদের। প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানকে হাত করে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে। পরবর্তী সময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যা এবং ক্রমে ক্রমে ভারত বর্ষের প্রায় গোটা অঞ্চল। মীর কাসেম খান, টিপু সুলতান প্রমুখ সমকালীন স্বাধীনচেতা রাজন্যবর্গ স্থানীয়ভাবে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাঙ্গা করেও ব্যর্থ হন। বলাবাহুল্য, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু সেখান থেকেই।
বিদেশ বিভুঁইয়ে সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টি করতে আনুকূল্য প্রদর্শনার্থে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই নীতির ফলে এদেশীয় স্বাধীনতাকামী জনগণের মধ্যে পৃথক পৃথক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয়। ব্রিটিশ শাসকের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে বৃহৎ দুটি সম্প্রদায়। হিন্দু জমিদাররা ইংরেজদের আনুগত্য পেতে থাকে, পক্ষান্তরে রাজ্য হারিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় দিন দিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেও ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বেশ কাজ করে। আরও দ্বিধাবিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয় উভয় সম্প্রদায়। এরপর স্যার সৈয়দ আহমদ, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারবাদী কর্মপ্রচেষ্টার ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলো পেয়ে ক্রমান্বয়ে চক্ষুষ্মান হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস। ভারত বর্ষের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে হিন্দু কর্তৃক পরিচালিত ও ভাবাদর্শ নির্মাণকারী এই প্ল্যাটফর্ম নিজ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ আসবে না দেখে ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম লীগ’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠন। বৃহৎ ভারতবর্ষের ব্যাপারে না গিয়ে শুধু এই বাংলাদেশ বিষয়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে প্রধান ঘটনা স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ।
১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রসমূহ গঠনের প্রস্তাবকে’ উপচিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতায়, পূর্ব বঙ্গবাসীদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সহস্রাধিক মাইল ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে একীভূত হয় এবং পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এটা যে পূর্ববঙ্গের প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছিল না বরং উপনিবেশবাদের হস্তান্তর মাত্র তা পূর্ব বঙ্গবাসী ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, যখন বোঝা যায় তাদের মাতৃভাষা ও আবহমান সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত আসছে। এটা বোঝা গিয়েছিল যে, এর ফলে তাদের আত্মপরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তারা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং বিভ্রান্তি কেটে যায়। তারা বুঝতে পারে, স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয়নি। তারা তাদের সচেতনতার পরিচয় দেয় ১৯৫৪-এর নির্বাচনে, ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে। এত দিনে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়। পূর্বপাকিস্তানকে একসময় তারা ব্যবহার করেছিল ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের স্বার্থে, সেই আন্দোলনের অন্যতম উদগাতা ছিল পূর্ব পাকিস্তানিরা। একইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরোধও তেমনি তাদের প্রথমে স্বাধিকার এবং পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে শুরু হয় চূড়ান্ত পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ। সুদীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর তার বিজয় সুনিশ্চিত হয়। এই বিজয় দিবস ৯ মাসের কিংবা ২৫ বছরের সংগ্রামের বিজয় নয় পূর্ববঙ্গবাসীদের স্বাধীন মনোবৃত্তির, সুদীর্ঘকালের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষার বিজয়। আবার সেই মুক্তি ও স্বাধীনতা লাভের ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে ৩৬ দিনের মরণপণ আন্দোলনের মাধ্যমে শোষণ-বঞ্চনা বিভেদ বৈষম্যের অবসান ঘটাতে, স্বৈরাচার অবসানের পর বিজয়।
প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন কবীর তার ‘বাংলার কাব্যে’ লিখেছেন, ‘বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব বাংলার নিসর্গ হৃদয় তাকে ভাবুক করেছে বটে, কিন্তু উদাসী করেনি। দিগন্তপ্রসারী প্রান্তরের অভাব সেখানে নেই কিন্তু সে প্রান্তরেও রয়েছে অহরহ বিস্ময়ের চঞ্চল লীলা। পদ্মা যমুনা মেঘনার অবিরাম স্রোতধারার নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনের ধ্বংস।’ পূর্ব বাংলায় নিসর্গ নন্দনকাননেই শুধু পরিণত করেনি তাদের (বাংলাদেশের জনগণকে) করেছে পরিশ্রমী, সাহসী-শান্ত-সুজন, আত্মবিশ্বাসী, ভাবুক, চিন্তাশীল, আবেগময় ও ঔৎসুক্যপ্রবণ। তাদের রয়েছে নিজস্ব নামে দেশ সৃষ্টির ইতিহাস, ঐতিহ্য, চলন বলন, শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। দৈহিক গড়ন গঠনে আবেগ অনুভূতিতে, রগে রক্তে তারা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় হতে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেও তারা পৃথক ভিন্ন প্রকৃতির। জাতিগত ভাবাদর্শে, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশে জাতীয়তাবোধে অন্যান্য রাষ্ট্র ও অঞ্চলে বসবাসকারী স্বধর্মী ও স্বভাষীদের থেকেও তারা স্বতন্ত্র প্রকৃতির। বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয়। তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিজেরাই অর্জন করতে জানে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় জনগণের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সচেতনতা জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়ে সমুন্নত করেছে।
সম্প্রতি স্বৈরাচারের পলায়ন পরিস্থিতিতে বাঙালির জাতীয় জীবনে যে নবদিগন্তের সূচনা হয়, তাতে সীমাহীন শোষণ ও সুদীর্ঘকালের অবজ্ঞায় নিষ্পেষিত ঔপনিবেশিক জীবনযাত্রা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং তারা নিজেদের নিয়মে চলার, নিজে পায়ে দাঁড়াবার, বাঁচবার এবং বিকশিত হওয়ার অধিকার পেয়েছে। বাংলাদেশি বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায়,
সাংস্কৃতিক সংকীর্তায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে এখন নিজেরাই নিজেদের প্রশাসনের সুযোগ লাভ এবং উন্নতি ও অবনতির নিয়ন্তা, সফলতা ও ব্যর্থতার বিধায়ক। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অবজ্ঞার ফলে ধ্বংসপ্রায় অর্থনৈতিক জীবনকে চাঙ্গা করার দায়িত্ব তাদেরই। সমাজ জীবন থেকে বন্ধ্যানীতি কুসংস্কার আর অপয়া ভাবধারাকে অপসারিত করে জাতিসত্তার বিকাশ ঘটানোর, জাগ্রত জাতি সভায় বাংলাদেশের অবস্থান ও গৌরবকে আরও ঐশ্বর্যম-িত করতে পারার মূল্যবোধ এ দেশবাসীকেই লালন করতে হবে। ২৪-এর আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশে সেই মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধকালীন একাগ্রতা, আত্মত্যাগের সুমহান সংকল্প নিশ্চয়ই একই ভূমিকা পালন করবে এবং এই বিজয়কে অর্থবহ করে তুলতে সহায়তা করবে। কোনোক্রমেই এসব মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়ে বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়া, দায়িত্বহীনতা, অলসতা, একে অন্যের দোষারোপের অবয়বে নিজেদের বিলীন করে দেওয়ার প্রবণতা যেন দেখা না দেয়। আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশ একাগ্রতার পরিচয় দিতে যেন পিছপা না হয়। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেন না যায়। ক্ষেত্রবিশেষে চারিত্রিক অধঃপতন ও ন্যায়নীতিনির্ভর মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণ থেকে উৎসারিত দুর্নীতি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মপ্রয়াস মন্থর করে দেয়। অদূরদর্শী পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিঘœ ও বিভ্রাট সৃষ্টি হওয়ার বিষয়গুলো সচেতনভাবে দৃষ্টি দেওয়ার অবকাশও তৈরি হয়েছে। সেখানে সবাইকে সুশৃঙ্খল, সংস্কারে ধৈর্যধারণ, গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সবাইর দায়িত্বশীল হওয়া কিন্তু সময়ের দাবি।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান
