বহুপুষ্পিকায় সিঁদুরে মৌটুসি

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

ওকে প্রথম দেখি রংপুর শহরে, রেল স্টেশনের কাছে (রবার্টসগঞ্জে, ভায়রার বাসায়। জলপাইয়ের ওপর সিঁদুরে লাল রঙের সরু দেহের পাখিটি অ্যালামন্ডা ফুলের ভেতর তার লম্বা বাঁকা ঠোঁটখানা ঢুকিয়ে নির্যাস নিচ্ছিল। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বরের ঘটনা এটি। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন বছরেরও বেশি সময়। প্রাণিচিকিৎসার ওপর অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে যোগ দিতে ময়মনসিংস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই ২০১৪ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি। পরদিন সম্মেলনের বিকেলের সেশন শেষে ক্যামেরা হাতে উদ্ভিদ উদ্যানে ঢুকলাম। ছাত্রজীবনে এখানে প্রচুর সময় কাটিয়েছি। প্রচুর পাখি দেখেছি। বাগানে ঢুকেই পুরনো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল!

সহকর্মী অধ্যাপক জীবনকে নিয়ে ফুলে ফুলে শোভিত উদ্যানে হাঁটতে হাঁটতে শেষ প্রান্তে চলে এলাম। এখানে চার থেকে পাঁচটা পার্বতী বা বহু পুষ্পিকা ফুল গাছ একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। পুরো গাছ আগুনে লাল ফুলে ছেয়ে আছে। গাছের কাছাকাছি আসতেই থমকে দাঁড়ালাম। গাছে ছোট ছোট পাখির মেলা যেন! সবাই ফুলের নির্যাস পানে ব্যস্ত। নীলটুনি, মৌটুসি, শে^তাক্ষী ও ফুলের রঙে রাঙানো অর্থাৎ সিঁদুরে রঙের এক প্রজাতির পাখি। এর মধ্যে সিঁদুরে-রঙা পাখির সংখ্যাই বেশি। সব মিলিয়ে গোটা বিশেক। কোনো কোনোটা মাঝেমধ্যে পাশের বড় গাছটায় খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার ফুলের নির্যাস পান করতে আসছে। অন্যরা উড়ে দূরে চলে যাচ্ছে ও কিছুক্ষণ পর আবার আসছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল, মন ভরে উঠল। দেড় ঘণ্টা ওখানে ওদের কার্যকলাপ দেখলাম। অসংখ্য ছবি তুললাম। রংপুর ও ময়মনসিংহে দেখা সুন্দর পাখিগুলো এ দেশের অন্যতম সুন্দর পাখি সিঁদুরে বা সিঁদুরে-লাল মৌটুসি। ইংরেজি নাম Crimson/Yellwo-backed/Scarlet-throated/Scarlet-breasted Sunbird)। নেকটারিনিডি গোত্রভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aethopyga siparaja|। সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখিটিকে বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।

সিঁদুরে মৌটুসির পুরুষটি এ দেশের সুন্দরতম পাখিগুলোর একটি। লম্বায় পুরুষ প্রায় ১৫ ও স্ত্রী ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ প্রায় ৮ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে বেশ পার্থক্য থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের গলা, বুক ও বুকের দুপাশ উজ্জ্বল লাল। ঠোঁটের গোড়া থেকে গলার দুপাশে গোঁফের মতো ধাতব নীলচে-সবুজ ডোরা রয়েছে। মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ। রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ও গোঁফ চকচক করতে থাকে। পিঠ কালচে গাঢ় লাল বা মেরুন লাল। কোমরের পালক হলুদ। লেজের লম্বা পালক সবুজ যার আগার বাইরের দিকটা সাদা। পেট ও পায়ুর পালক হলদে-জলপাই। ডানার গোড়া লালচে-জলপাই ও বাকি অংশ গাঢ় জলপাই। স্ত্রীর দেহের উপরটা জলপাই-সবুজ ও নিচটা হলদে-জলপাই। লেজ গোলাকার ও অগ্রভাগ সাদা। গলা ও বুকের উজ্জ্বল লাল আভা ছাড়া অপাপ্ত বয়স্ক পুরুষ দেখতে স্ত্রী পাখির মতোই। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে পা, আঙুল, নখ ও বাঁকানো ঠোঁটটি কালচে-বাদামি।

এরা মূলত বনের পাখি। এদেশের চিরসবুজ বন, পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাদাবনে বিচরণ করে। তবে অনেকসময় গ্রাম ও শহরতলীর সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। এদের জিহ্বা নলাকার যা নলাকার ফুলের নির্যাস পান করার জন্য উপযোগী। ফুলের নির্যাস ছাড়াও পোকামাকড় খেতে পারে। ছানাদের মাকড়সার ছোট ছোট বাচ্চা খাওয়ায়। সাধারণত একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। অনেক সময় অন্য প্রজাতির নীলটুনি-মৌাটুসির দলেও দেখা যায়। তীব্র স্বরে ‘চি --- চিই --- চিই’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী-পুরুষ মিলে ছোট গাছ বা ঝোপঝাড়ের ঝুলন্ত সরু ডালে শিকড় বা চিকন আঁশ দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বানায়। বাসা নীলটুনির থেকে লম্বা ও চাপা এবং দেখতে খোসা ছাড়ানো পাকা ধুন্দল এর মতো। এরপর স্ত্রী শৈবাল ও মাকড়সার জাল দিয়ে বাসার উপরে আবরণ বা লাইনিং দেয়। বাসা বানানো হলে স্ত্রী তাতে দুই থকে তিনটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে যাদের চওড়া প্রান্তে গোলাপি বা লালচে ছিট থাকে। স্ত্রী একাই তা দিয়ে ১৪-১৫ দিনে ছানা তোলে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই ছানাদের খাওয়ায় ও লালনপালন করে। ছানারা ২২-২৩ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ২-৮ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত