কারফিউতে বিপদে ৮১% ইন্টারনেট বন্ধে ৭১

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৪, ০৭:৩৫ এএম

জুলাই মাস উত্তপ্ত ছিল ছাত্র আন্দোলনে। মধ্য জুলাই থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার কারফিউ জারি করে, বন্ধ করে দেয় ইন্টারনেট। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার আগে তার সরকারের এমন জনস্বার্থবিরোধী নানা পদক্ষেপে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে সাধারণ মানুষ।

আওয়ামী লীগ সরকারের ওইসব পদক্ষেপে দেশের মানুষ কী ধরনের ক্ষতিতে পড়েছে, তা নিয়ে গত ২১ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি)। বাংলাদেশ বিষয়ে করা ডব্লিউএফপির ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত জুলাই মাসে কারফিউ জারির কারণে ৮১ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার চরম বিপাকে পড়তে হয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৭১ শতাংশ পরিবার। কয়েক বছর ধরে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঋণ করে খাবার জোগাড় করতে হচ্ছে। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে সরকারের পদক্ষেপে মানুষ আরও চাপে পড়েছে। ঋণ করে খাবার কেনা মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, বিগত সরকারের পদক্ষেপে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে দেশের ৪৮ শতাংশ মানুষকে ঋণ করে খাবার খেতে হচ্ছে। গত ডিসেম্বর ঋণ করে খাবার কেনা মানুষের সংখ্যা ছিল ৪০ শতাংশ।

জাতিসংঘের এ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশব্যাপী অস্থিরতা, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা এবং সর্বশেষ কারফিউর কারণে তারা এ ধরনের ক্ষতির শিকার হন। কারণ বাড়ি থেকে পেশা চালানো যায় না। জুলাই মাসে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা গড়ে দ্বিগুণ ছিল। জরিপ করা পরিবারের প্রায় অর্ধেককেই ঋণ করে খাবার কিনতে হয়েছিল বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি।

ডব্লিউএফপি এ জরিপটি খুব দ্রুত চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে তাদের প্রতিবেদনে। টেলিফোনে এ জরিপ চালানো ২৭০টি পরিবারের মধ্যে, ৪৪ শতাংশের পেশা দৈনিক শ্রমিক (কৃষি এবং অকৃষি উভয়), রাজমিস্ত্রি, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, পোশাকশ্রমিক, ছোট খুচরা বিক্রেতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইত্যাদি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও কয়েক মাস থাকতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ঠেকাতে বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা ইতিবাচক।

গত মাসে ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে কারফিউ জারির কারণে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের বিপদই ছিল নজিরবিহীন। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন বলছে, এ সময় ৪৫ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে।

জুলাই মাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি ছিল ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার বিষয়টি। এ কারণে ৭১ শতাংশ মানুষ বিপাকে পড়েছে। কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ৫২ শতাংশ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। ভয়ে বাজারেই যেতে পারেনি ৫৪ শতাংশ পরিবার।

গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে কিছু ভালো কাজের উদাহরণ থাকলেও শেষ কয়েক বছরে আর্থিক খাতে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল বেশি। চর দখলের মতো ব্যাংক দখল করায় ব্যাংক খাতের অনিয়ম, লুটপাট হয়েছে বহু গুণ। দেখা দিয়েছিল তারল্যসংকট। মুদ্রা পাচারের মতো বড় ঘটনাও ঘটেছে। শেষে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভসংকট। ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ নেমে আসে ১২ বিলিয়ন ডলারে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৪ শতাংশের বেশি হয়েছে।

আর্থিক খাতের এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গড়ে দশটি পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার পর্যাপ্ত খাবারের সামর্থ্য রাখে না বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপির এই প্রতিবেদন। জরিপে প্রায় দশটি নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে পাঁচটি একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

কয়েক মাস আগেও ডব্লিউএফপি জরিপ করে জানিয়েছিল বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ পরিবার ঋণ করে খাবার খায়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এত বেশি লুটপাট আর আর্থিক অনিয়মের কারণে জুলাইয়ে এসে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে। সংস্থাটির জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ৪৮ শতাংশ পরিবার ঋণ করে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। তা ছাড়া ২২ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছে, ২২ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে, ১৫ শতাংশ পরিবার বাধ্য হয়ে তাদের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে ও ২১ শতাংশ ধার নিয়ে চলতে হয়েছে।

খাদ্যসংকটে পড়া এসব মানুষের দীর্ঘ মেয়াদে উত্তরণের উপায় কী এমন প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেদনে কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মানুষের কী প্রভাব পড়েছে, তা এসেছে। আমাদের পুঞ্জীভূত যে সমস্যা, সেটির প্রতিফলন আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই বাড়ছিল, জুলাইতে এসে তা ১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেটিও যোগ হয়েছে।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ইন্টারনেট আবার সচল হয়েছে, অর্থনীতিও চলমান হয়েছে, যদিও বন্যায় আবার সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা প্রতিবন্ধকতা হবে। আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আবার বাড়ার দিকেই থাকবে। স্থান, কাল হিসেবে কিছু কিছু স্থানে আরও বেশি মূল্যস্ফীতি হতে পারে।

এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় নিয়ে পরামর্শ দিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এগুলো আমাদের অবশ্যই সামাল দিতে হবে। বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে ওইসব অঞ্চলের জন্য খাদ্য মজুদ থেকে খাদ্য বের করা, ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যেসব সহায়তা সেগুলো দিতে হবে। আমাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে যে অব্যবস্থাপনা ছিল, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এগুলো করলে মনে হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতি আমরা কিছুটা সামাল দিতে পারব।’

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও কিছুদিন থাকবে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘এত কিছুর পরও আমাদের মূল্যস্ফীতির চাপ আরও কিছুদিন থাকবে। তবে সমস্যা জানার জন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানা প্রয়োজন। সঠিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন আমাদের দেশে সমস্যাও ছিল। দীর্ঘদিন আমাদের উৎপাদন কত, সরবরাহ কত, মজুদ কত ইত্যাদির সঠিক তথ্য ছিল না।’

সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, চাঁদাবাজি চিহ্নিত করার বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি বলেন, এগুলো করলে ক্রমান্বয়ে এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

জরিপে ৫০ শতাংশেরও বেশি পরিবার কারফিউর কারণে আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। জরিপের আগের ছয় দিনে আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটা বড় সমস্যা ছিল। এ ছাড়া দেশের সব নিম্ন আয়ের পরিবারের ৭৭ শতাংশ বিশেষভাবে আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা হওয়ায় ৮ বিভাগের ৩০ শতাংশ পরিবার খাবার কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে, কারণ তাদের আয় কমে গেছে। ফলে মাত্র ১২ শতাংশ পরিবারের তাদের নিয়মিত খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ছিল; ৮০ শতাংশের মাঝে মাঝে ছিল এবং বাকি ৮ শতাংশের সমীক্ষার আগে সাত দিনে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ছিল না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত