ক্রিকেটেও বিপ্লবের রঙ

পাকিস্তান : ৪৪৮/৬ ও ১৪৬

বাংলাদেশ : ৫৬৫ ও ৩০/০

ফল : বাংলাদেশ ১০ উইকেটে জয়ী

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৪, ০৮:২২ এএম

মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে দেড় দশকের স্বৈরাচারী সরকারের পতন হবে আর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাবেন, এমনটা মাস দেড়েক আগে কেউ যেমন ভাবেনি; তেমনি পাঁচদিন আগে নাজমুল হোসেন শান্ত যখন

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১২-০ এর রেকর্ডটা বদলে ফেলার কথা বলেছিলেন তখনো অনেকেই ঠোঁট চেপে হেসেছিলেন। দেশের মাটিতেই বাংলাদেশ টেস্টে খাবি খেয়েছে শ্রীলঙ্কার মতো ক্ষয়িষ্ণু দলের সঙ্গে, আর প্রতিপক্ষ যখন পাকিস্তান তখন প্রত্যাশার পারদ তলানিতে। কিন্তু ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর এ যেন আসলেই এক নতুন বাংলাদেশ! এখানে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে আসে তরুণরা, দান করা ত্রাণসামগ্রীতে উপচে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, খুদে শিশুটিও খালি করে দেয় তার মাটির ব্যাংক। এই দেশের ক্রিকেট দলের তো এভাবেই খেলার কথা।

পাকিস্তানকে রাওয়ালপিন্ডিতে ১০ উইকেটে হারিয়ে ২ টেস্টের সিরিজের প্রথমটি জিতে ১-০তে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। 

আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে প্রথম জয় এবং বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় জয় (উইকেটের হিসেবে)... এমন অনেক বিশেষণই যোগ করা যাবে এই জয়ের সঙ্গে। তবে সি এল আর জেমসের সেই অমর বাক্য, ‘ক্রিকেট সম্পর্কে তারা কি জানে যারা শুধুই ক্রিকেট জানে’ মেনে বলতে হয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডির টেস্ট ম্যাচটা যেন ছোট পরিসরে জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনেরই প্রতিফলন। জীবনযুদ্ধের মতো টেস্ট ম্যাচেও একেকটা দিন শুরু হয় নতুন সম্ভাবনা আর আশঙ্কা নিয়ে। সব বাধা পেরিয়ে যেভাবে উপড়ে ফেলা গেছে স্বৈরাচারের সিংহাসন, অনেকটা একই ভাবে বাংলাদেশ দলও পাঁচটা সূর্যোদয়ের পর পেয়েছে অবিশ্বাস্য এক রোদ ঝলমলে দুপুরের দেখা। 

শুরুতেই বৃষ্টি, এরপর পাকিস্তানের টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানকে দ্রুত আউট করা গেলেও সাউদ শাকিল আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের দারুণ ব্যাটিংয়ে তাদের বড় সংগ্রহে পৌঁছে যাওয়া। শেষ বিকেলে জাকির আর সাদমানের প্রতিরোধের পরদিন আক্ষেপ আর অপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্ভাবনার হাতছানিতে শেষ হয় তৃতীয় দিনের খেলা। চতুর্থ দিনে মুশফিকুর রহিম আর মেহেদী হাসান মিরাজের অভাবনীয় জুটি বাংলাদেশকে পৌঁছে দেয় অলৌকিক এক জয়ের দ্বারপ্রান্তে। শেষ দিনে পেসারদের চমৎকার শুরুর পর সাকিব আল হাসান আর মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে চূর্ণ হয় পাকিস্তানের অহং আর জয়ের ক্যানভাসে শেষ তুলির টানটা দেন প্রথম প্রতিরোধের দুই নায়ক, জাকির আর সাদমান।

শেষদিনের সকালটা দুই তরফের জন্যই ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান একটা বড় জুটি গড়তে পারলে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ত বাংলাদেশ, কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টো। দিনের ১২তম ডেলিভারিতেই আউট হয়ে গেছেন পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদ। বিলেতে পড়ালেখা করা তুখোড় ইংরেজি বলা এই ব্যাটসম্যানের জয়ীর বেশে সংবাদ সম্মেলনে আসা আর হয়ে উঠল না, তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল সেই মুহূর্তেই। হাসান মাহমুদের স্টাম্পের বাইরের বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়েছিলেন, বলে আলতো ছোঁয়া লাগে ব্যাটের যেটা আম্পায়ার শুনতে পাননি। রিভিউয়ের আবেদন নিয়ে সফল অধিনায়ক শান্ত, বিদায় শান মাসুদের। দিনের শুরুতেই পেয়ে যাওয়া সাফল্যে বাড়ে আত্মবিশ্বাস, তাই বাবর আজম খানিকটা ভয় ধরালেও তরুণ নাহিদ রানা তাকে বেশি সময় দেন না। ২২ রানেই ভাঙেন বাবরের স্টাম্প। আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান সাউদ শাকিলকে মুদ্রার অপর পিঠটা দেখান সাকিব, আউট করে দেন শূন্য রানে। এরপর থিতু হয়ে যাওয়া আব্দুল্লাহ শফিককেও দেখান ফেরার পথ। লিড নেওয়ার আগেই ৫ উইকেট নেই পাকিস্তানের, জয়ের স্বপ্ন তখন বাস্তব হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের। গলার কাঁটা হয়ে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ানকেসহ লেজটা ছেঁটে ফেলেছেন মিরাজ, সঙ্গত দিয়েছেন সাকিবও। ব্যাট হাতে ৭৭ রানের পর বল হাতে ২১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে মিরাজের সব্যসাচী অবদান, সাকিব নিয়েছেন ৪৪ রানে ৩ উইকেট। পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৫.৫ ওভারে অলআউট মাত্র ১৪৬ রানে। লিড ৩০ রানের।

বাংলাদেশের টপ অর্ডার মানেই চায়ে ডোবানো বিস্কুটের মতোই ভঙ্গুর। এই ধারণাটা রাওয়ালপিন্ডিতে ভুল প্রমাণ করেছেন সাদমান আর জাকির মিলে। দ্বিতীয় ইনিংসেও তারাই শেষ করেছেন জয়ের আনুষ্ঠানিকতা। ৬.৩ ওভারে ৩০ রান তুলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের জয়। আগা সালমানের বলে প্যাডেল সুইপে বাউন্ডারি মেরে জাকির হাসান বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

একটু পেছন ফিরে তাকালেই দেখা যাবে, বাংলাদেশ দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারই সমর্থন দিয়ে গেছেন ছাত্র আন্দোলনকে। অধিনায়ক শান্ত ১৭ জুলাই তার অফিশিয়াল ফেসবুক পাতায় লিখেছিলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে চাই না সংঘাত আর যেন না হয় রক্তপাত। কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়, যে কোনো উপায়েই এই রক্তপাত বন্ধ হোক। আসুক শান্তি। আমরা সবাই মিলে আমাদের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’ রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগেও শান্ত সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘গত বেশ কয়েক দিন আমাদের খুবই কঠিন সময় গিয়েছে। খুবই দুঃখজনক। সবাই খুবই স্ট্রাগল করেছে। যেটা আমরা কেউই আশা করি না।’ কষ্টের দিনগুলো শেষে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো জয় এসেছে তার নেতৃত্বে, সেই জয় শান্ত উৎসর্গ করেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গ করা সেই মানুষদের উদ্দেশ্যেই, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এই জয়টা তাদের উৎসর্গ করেছি এবং তাদের জন্য দলের পক্ষ থেকে অনেক অনেক দোয়া। তাদের পরিবারের কঠিন সময় গেছে। আশা করি এই জয়টা দিয়ে তাদের মুখে একটু হলেও হাসি আসবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত