স্বাস্থ্য ছিল স্বাচিপে বন্দি

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ০৮:১৩ এএম

আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই পদে আসীন হওয়ার পর নিয়োগ-বাণিজ্য, যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক হন। তার অনিয়ম, দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে গেলে সে খবর একসময় স্বাস্থ্য খাত পেরিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছায়। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলে। বাধ্য হয়ে সরকার তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

স্বাচিপের আরেক প্রভাবশালী নেতা অধ্যাপক ডা. সভাপতি জামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে গত ২৭ জুন রাতে রাতে দলবল নিয়ে রাজধানী উত্তরার শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ দখল করতে যান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধার মুখে ব্যর্থ হন। শুধু এই দুজন চিকিৎসক নেতাই নন, স্বাচিপের এমন আরও অনেক নেতাই ছিলেন, যারা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল ২০০৯ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে দিনে দিনে স্বাস্থ্য খাতের সব প্রতিষ্ঠানে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান করেন স্বাচিপ নেতারা। গেল ১৫ বছরের বেশি সময় স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করেছেন তারা। স্বাস্থ্য খাতের সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, কেনাকাটা, বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণসহ সব ক্ষেত্রেই স্বাচিপের হস্তক্ষেপ ছিল অতিমাত্রায়। এমনকি তাদের থাবা বিস্তৃত ছিল বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতেও। সরকার স্বাস্থ্য খাত পরিচালনা করলেও স্বাচিপ নেতাদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল দুরূহ। এক কথায় স্বাস্থ্য খাত ছিল স্বাচিপ নেতাদের হাতের মুঠোয়। তবে সংগঠনের নেতাদের মধ্যে বিরোধ এবং আমলাদের প্রভাব বাড়ায় ২০১৮ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য খাতে স্বাচিপের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমতে থাকে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও মালামাল ক্রয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাচিপের আধিপত্য খর্ব হয়।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি হাসপাতালের শীর্ষ পদগুলোয় নিজেদের পছন্দের লোক বসাতে স্বাচিপ নেতাদের হস্তক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ক্ষেত্রে মেধা বা যোগ্যতা যাচাই করা হয়নি বরং বিবেচনা করা হতো যে প্রতিষ্ঠানের হাল ধরবেন তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন কি না বা স্বাচিপের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না অথবা স্বাচিপ বা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নেতাদের তদবির ছিল কি না। নিয়োগ ও তদবিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় স্বাচিপ ও বিএমএ নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। স্বাস্থ্য খাতের প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাই এই দুই শীর্ষ সংগঠনের নেতাদের দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন। বিএমএ চিকিৎসকদের সংগঠন হলেও তা পুরোপুরি আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি একটি হাসপাতালের পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির বিষয় এলে ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো। প্রতিটি নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বাচিপ ও বিএমএ তালিকা দিয়ে জোরালো তদবির চালাত। তাদের তালিকার বাইরে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সমস্যা ছিল। এক গ্রুপ যে তালিকা দিত, অন্য গ্রুপ তা মানত না। এ নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের কাছে নালিশ জানালে তিনি নিজেই অসহায়ত্বের কথা জানাতেন।’

চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ পর্যন্ত সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএসএমএমইউ) অন্য যেকোনো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে উপাচার্যরা নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের সবাই স্বাচিপ, বিএমএ বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ সময় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার কিংবা অন্য কোনো শীর্ষ পদে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। এমনকি নির্দলীয় চিকিৎসকদেরও এসব পদে বসার নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। একইভাবে ২০০৯ সালের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যে সাতজন মহাপরিচালক দায়িত্ব পালন করেন, তারাও স্বাচিপ কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও সিভিল সার্জন হিসেবে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের ৯০ শতাংশ স্বাচিপের সদস্য কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতি-ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যন্ত রাজনীতির কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল।

স্বাচিপের বর্তমান কমিটিতে থাকা একাধিক নেতার বিরুদ্ধে বড় বড় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ডা. সোহেল মাহমুদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা এবং ধর্ষণের শিকার এক নারীর স্বাস্থ্য প্রতিবেদন পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সহসভাপতি ডা. আবু রায়হান ও সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. জাবেদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যের কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। ডা. জাবেদ হাসপাতালের বদলি-বাণিজ্য চালাতে একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।

স্বাস্থ্য খাতের রাজনীতিকীকরণের বড় প্রমাণ মেলে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ ও কর্মজীবনের স্বাচিপের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। ড্যাবের চিকিৎসকদের আন্দোলনের মুখে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক টিটো মিয়া এবং দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক বায়েজিদ খুরশীদ রিয়াজ ও অধ্যাপক কামরুল হাসান মিলনকে। এর মধ্যে কামরুল হাসান স্বাচিপের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অন্য দুজনও স্বাচিপের সক্রিয় নেতা।

স্বাচিপের একজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের তালিকাভুক্ত সদস্য ১৫ হাজার। তবে ২৫ হাজারের বেশি চিকিৎসক স্বাচিপের সঙ্গে জড়িত। কারণ ২০১৫ সালের পর নতুন করে সদস্য করা হয়নি কাউকে। ২০২২ সালে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করায় তা আর করা সম্ভব হয়নি।

স্বাচিপের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিকিৎসকদের তালিকায় আছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হক, অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান, অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ, অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া, অধ্যাপক ডা. বদিউজ্জামান ডাবলু, অধ্যাপক জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও অধ্যাপক কামরুল হাসান মিলন। এর মধ্যে অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান সংগঠনে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৩-১৪ সাল পর্যন্ত মহাসচিব এবং ২০১৫-২২ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন।

সংগঠনটির আরেক প্রভাবশালী নেতা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর তার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের আমল থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাচিপ। স্বাচিপ সভাপতি হিসেবে ভূমিকার কারণেই তিনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তার আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাপক হারে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি নিয়ম না মেনে অসংখ্য নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দেন, বাড়িয়েছেন মেডিকেলের আসন। গণমাধ্যমে তার স্ত্রী ও সন্তানের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।

স্বাচিপের আরেক প্রভাবশালী নেতা অধ্যাপক এমএ আজিজ ২০১৪ থেকে ২০০২২ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে স্বাচিপে তার অনুসারীর সংখ্যা বেশি।

জানা গেছে, ২০০৩ সালে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হককে স্বাচিপের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। এ কারণে তখন সংগঠনে মহাসচিবসহ অন্যান্য পদে নির্বাচন হয়। ওই সময় মহাসচিব পদে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু, তৎকালীন মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান, বিএমএর যুগ্ম মহাসচিব ডা. এমএ আজিজ ও ইউনুস আলী সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে ইকবাল আর্সলান বিজয়ী হন। পরে অধ্যাপক রুহুল হক ও অধ্যাপক ইকবাল আর্সলানের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রায় ১১ বছর দায়িত্ব পালন করে। মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে কমিটি গঠন না করায় চিকিৎসক মহলে নতুন নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। এরপর ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার নির্দেশে স্বাচিপের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সালান এবং মহাসচিব হিসেবে অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ নির্বাচিত হন। এই কমিটি ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে।

২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাচিপের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। ওই বছরের কমিটিতে পছন্দের পদ পেতে অনেকেই বহু দৌড়ঝাঁপ করেন। তখন সভাপতি ও মহাসচিব পদে অনেকের নাম আলোচনায় ছিল। এর মধ্যে সভাপতি পদে আলোচনায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া, স্বাচিপের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এমএ আজিজ। আর মহাসচিব পদে আলোচনায় ছিলেন স্বাচিপের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু ইউসুফ ফকির, বিএসএমএমইউর সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলোজি বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. শাহরিয়ার নবী শাকিল এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান মিলন। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও মহাসচিব হিসেবে অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান মিলনের নাম ঘোষণা করেন। বর্তমান কমিটির আগামী বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত