সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিলেটের ডোনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় স্থানীয়দের হাতে আটক হন। এরপর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। গত শনিবার ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে তোলা হয় সিলেটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ আদালতে।
প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর পর বিচারপতি মানিককে কিল-ঘুসি ও লাথি মারার ঘটনা ঘটে। জুতা, ডিম ও পানির বোতল ছুড়ে মারেন বিএনপি-জামায়াতের সমর্থকরা। গুরুতর আহত হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সেদিন রাতেই কারাগার থেকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক গণমাধ্যমকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারপতি মানিককে কোর্টে নেওয়ার পর অন্তত ১০০ জন মানুষ কোর্ট প্রাঙ্গণে তার ওপর হামলা চালায়। যারা আক্রমণ করেছিল তারা সবাই জামায়াত-বিএনপির কর্মী। দলীয় পদধারী কেউ নয়। আক্রমণকারীরা আইনজীবীও নয়।’
সাবেক এ বিচারপতির অবস্থা সম্পর্কে সিলেট ওসমানী মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া গত মঙ্গলবার বলেন, ‘তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল না। আঘাতও তেমন বড় ছিল না। বয়স বেশি হওয়ায় উনার সমস্যাটা বেশি মনে হচ্ছিল। চিকিৎসার জন্য একটি বোর্ড কাজ করছে। উনি মোটামুটি সুস্থ আছেন।’
এ ধরনের ঘটনা হতাশাজনক ও ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাপরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন মানবাধিকারকর্মী ও বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি পুরনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং মানুষের প্রতি এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এটি চলতে দেওয়া উচিত নয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের যে মূল চেতনা, তার বিপরীত অবস্থানে রয়েছে এগুলো।’
ঠিক সাত বছর আগে কুষ্টিয়ার আদালত প্রাঙ্গণে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবমাননার মামলায় জামিন পেয়ে বের হয়ে আসছিলেন ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। সে সময় কুষ্টিয়া জেলা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তুষার আহমেদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমর্থক অন্তত ১০০ জন আদালত কক্ষের বাইরে অবস্থান নেয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় তার মাথা ফেটে যায়।
সময় ও ক্ষমতা দুই-ই বদলেছে। শুধু বদলায়নি দৃশ্যপট। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া এসব ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা খুবই অনাকাক্সিক্ষত। যারা অভিযুক্ত হচ্ছেন বা অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার হয়ে আসছেন, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া জরুরি। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ যদি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে আদালতে না নিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও রেখে জুমের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি দেখাতে পারে। প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’
দুই সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণেও দেখা গেছে এমন নজিরবিহীন অপ্রীতিকর ঘটনা। বাদ যায়নি দলবাজ সাংবাদিকরাও। অনেকের পক্ষে লড়ার জন্য আইনজীবীদের বাধা দিচ্ছেন অন্য আইনজীবীরা। হামলার চেষ্টা, কিল-ঘুসি, ঝাড়– ও জুতা নিয়ে মিছিল এমনকি শাড়ির আঁচল ধরে টান দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত ১৪ আগস্ট ঢাকার একটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ড ও জামিনের শুনানিতে হাজির করা হয় গত আওয়ামী লীগ সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে। তার সঙ্গে হাজির করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বাধা ও হামলার শঙ্কায় তাদের পক্ষে লড়ার জন্য কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এমন অভিযোগ করেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। তবে দুজনকেই আইনজীবী ও জনতার রোষানলে পড়তে হয়। আদালতে তাদের আনা-নেওয়ার সময় দুজনের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন অসংখ্য আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ। পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই তাদের মারতে তেড়ে যান অনেকে। কেউ কেউ ডিম ছুড়ে মারেন তাদের ওপর।
অভিযুক্ত যত বড় অপরাধীই হোক, তার আইনি সহায়তা নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানে আছে। সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আইনবহির্ভূতভাবে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের দায়ে অভিযুক্ত আসামিও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজীবী পায়।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, ‘এটা সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। আইনজীবীরা কোনোভাবে বলতে পারে না যে অমুককে আইনগত সহায়তা দেওয়া যাবে না। যে অভিযোগেই অভিযুক্ত হোক না কেন, তাকে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া মেনেই বিচার করতে হবে। কারও সাংবিধানিক অধিকারকে কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না।’
ঢাকার আদালতগুলোতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আসছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগের বিষয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমার জানামতে বিএনপিপন্থি কোনো আইনজীবী এসবে যুক্ত নয়। আমাদের ফোরামের সব আইনজীবীর প্রতি নির্দেশনা দেওয়া আছে, যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করে। তারপরও যদি কেউ করে তাহলে তাকে বহিষ্কারসহ কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে।’
গত ২০ আগস্ট আদালতে হাজির করা হয় সাবেক সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি এবং সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়কে। তাদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটে। এজলাসে আসামির কাঠগড়ায় তাদের পাশাপাশি রাখা হয়। আরিফ খান জয় একপর্যায়ে কিছু বলতে চাইলে আইনজীবীরা তার দিকে তেড়ে যান। হাতকড়া পরানোর দাবি তোলেন। তাদের দাবির মুখে জয়ের হাতে হাতকড়া পরানো হয়। তবে দীপু মনিকে হাতকড়া পরানো হয়নি। শুনানিকালে তাদের পক্ষেও কোনো আইনজীবী ছিলেন না। বিমর্ষ দীপু মনি একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। রিমান্ডের আদেশের পর নামার সময় দীপু মনি সিঁড়িতে পড়ে যান। নিচে নামার সময় এক ব্যক্তি তার শাড়ির আঁচল ধরে টান দেয়। আরিফ খান জয় নামার সময় একজন আইনজীবী তাকে কিল-ঘুসি মারতে থাকেন। আদালত প্রাঙ্গণে শারীরিক আঘাত ও হেনস্তার শিকার হন একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা ও বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৩(২) ধারা অনুযায়ী একজন আসামি চাইলে আদালতে তার পক্ষে বক্তব্য দিতে পারেন।
ঢাকার বাইরে সিলেটে এমন একটি ঘটনা ঘটলেও ঢাকার নিম্ন আদালতগুলোতে এখন এ চিত্র প্রায় প্রতিদিনের। প্রশ্ন উঠছে, কোর্টে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তারা কি ব্যর্থ? ঢাকা মহানগর পুলিশের আদালতপাড়ার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট তৎপর। আমাদের সেই লোকবলও আছে। সঙ্গে আছে সেনাবাহিনী। আদালতপাড়া অনিরাপদ, বিষয়টা এমন নয়। মাঝেমধ্যে অতি উৎসাহী কেউ এমন কাজ করে।’
১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ২২৮ ধারামতে, এসব কার্যক্রম আদালত অবমাননার শামিল। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, ‘আদালত অবমাননা তো বটেই। আদালতের প্রতি অসম্মান তো অবশ্যই। সুপ্রিম কোর্টের কিন্তু এখতিয়ার আছে আদালত অবমাননার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার।’
এ প্রসঙ্গে গত বুধবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মত, আদালতে যাওয়ার সময়ে কখনো কাউকে আক্রমণ করা উচিত নয়, এটা সমর্থনযোগ্য নয়।’
