বিতর্কিতদের রেখেই শুদ্ধি অভিযান

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ০১:২৭ এএম

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার দাপুটে আমলা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেই হয়েছেন বদলি অথবা বরখাস্ত, কারও বাতিল হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে ক্রীড়াঙ্গনেও। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ঘোষণা দিয়েছে বিগত সময়ের আর্থিক নিরীক্ষার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে গঠন করা হয়েছে সার্চ কমিটি। তবে এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে জোবায়েদুর রহমান রানার নাম জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু বিতর্কের।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তার ছত্রচ্ছায়ায় ক্রিকেট বোর্ডে হয়েছে অনেক দুর্নীতি, যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার ও সংগঠকরা। নতুন করে বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া ফারুক আহমেদ তার প্রথম বোর্ড সভাতেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট করেছেন নিজের অবস্থান, ‘কিছু দুর্নীতি যে হয়েছে, এটা আমরা সবাই জানি। এটা অস্বীকার করতে পারব না। দুর্নীতি যদি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই দুর্নীতি দমন কমিশন সেখানে হস্তক্ষেপ করবে। তবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, দুর্নীতি হয়েছে কি না বা কতটুকু বা কী মাত্রায় হয়েছে, এটা খুঁজে বের করা।’ শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দিন রাতে বিসিবি অফিসে কতিপয় ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করে এবং অনেক নথি সরিয়ে ফেলে, যার প্রমাণ মেলে সিসিটিভির ফুটেজে। অথচ সাংবাদিকদের কাছে ব্যাপারটি পুরোপুরি অস্বীকার করেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী। বিসিবির হিসাবরক্ষকের স্ত্রী কর্মরত একটি বেসরকারি ব্যাংকে, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির সেই ব্যাংকে বিসিবি মেয়াদি তহবিল হিসেবে জমা রেখেছে মোটা টাকা। এই সব ব্যক্তিকে স্বপদে বহাল রেখে কীভাবে বিসিবিকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে এ প্রসঙ্গে ফারুক বলেছেন, ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ১২ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। পদের কারণেই তাকে অনেক কিছুতে সই করতে হয়।’ ফারুক আশ্বাস দিয়েছেন সময় পেলে আস্তে আস্তে সবকিছুই ঠিক করবেন এবং প্রমাণসাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেবেন।

শুধু ক্রিকেট বোর্ডেই নয়, দেশের অন্যান্য খেলার জাতীয় সংগঠনগুলোতেও হয়েছে হরিলুট। ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণের বদলে ভবন নির্মাণ আর বিদেশ ভ্রমণের দিকেই ছিল কর্তাদের মূল আগ্রহ। যার ফল, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের লাগাতার ব্যর্থতা। ২৯ আগস্ট যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে বিদ্যমান ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশন বা বোর্ড বা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপনের জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দুই মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় জোবায়েদুর রহমান রানাকে। তাকে ঘিরে বিতর্ক আছে ক্রীড়াঙ্গনে, তাই কাজ শুরুর আগেই প্রশ্নের মুখে সার্চ কমিটি।

 ২০০৮ থেকে ২০১০ বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রানা। এরপর ২০১২ থেকে ২০১৬ দ্বিতীয় মেয়াদে ছিলেন একই দায়িত্বে। ২০১৫ সালে রানা সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় চারজন অপরিচিত ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ায় একটি আসরে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। মাসুদ আলম, মীর আহসান আলী, কমিল উদ্দিন ফুয়াদ ও মো. শাহজালাল নামে এই চারজনকে সিডনি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য পাঠায় ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন। তবে এই চারজনকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে খোদ ওয়ার্ল্ড ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন (বিডব্লিউএফ)। তাদের ওয়েবসাইটে চারজনের নাম উল্লেখ করে জানায়, এরা কেউই ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় না। এদের মধ্য দিয়ে মানব পাচারের শঙ্কা প্রবল এবং এই সফরে কোচ ও ম্যানেজার হিসেবে কাদের পাঠানো হয়েছে সে তথ্যও জানতে চায় বিডব্লিউএফ। এর বাইরেও সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় বেশিরভাগ সময় বিদেশে অবস্থান করা, দায়িত্ব ছাড়ার সময় সব নথি গায়েব করে ফেলার অভিযোগ ছিল রানার বিরুদ্ধে। ব্যাডমিন্টনের সবশেষ কমিটিতেও সহসভাপতি হিসেবে আছেন রানা।

সার্চ কমিটির আরেক সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ বুলবুল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এ ছাড়া এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন সাবেক হকি খেলোয়াড় এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ইমরোজ আহমেদ। দেশ রূপান্তরকে মেজর ইমরোজ বলেন, ‘আমাদের আহ্বায়ক বিদেশে আছেন। উনি ঠিক কোথায় আছেন, আমি জানি না। উনি দেশে এলেই আমরা প্রথম বৈঠক করব। না বসলে বুঝতে পারব না কীভাবে এগোব।’ মাত্র দুই মাসের সময়সীমা এবং আহ্বায়কের দেশের বাইরে থাকায় এখনো কাজ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে ইমরোজ বলেন, ‘প্রয়োজন হলে মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।’ সার্চ কমিটির আরও দুই সদস্য প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব এবং সাবেক ক্রীড়া সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও ক্রীড়া সাংবাদিক মন্টু কায়ছার।

শুদ্ধি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২৭ আগস্ট ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক জারি করা এক নির্বাহী আদেশে সব বিভাগ, জেলা, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা ভেঙে দিয়ে ৭ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছে। এই সব আহ্বায়ক কমিটির প্রধান থাকবেন বিভাগ, জেলা ও উপজেলার প্রধান সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি কাজের ধীরগতি, লালফিতার দৌরত্ম্য এবং সর্বোপরি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি মনোযোগের অভাবে যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে থেকেছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গন। এ ছাড়া বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুসারী এবং মদদপুষ্ট। তাই তাদের প্রধান করে গঠিত কমিটি কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত