ধ্বংসস্তূপ দেখে মনে হতে পারে যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এক জনপদ। অধিকাংশ বাড়িঘরেই কোনো আসবাব নেই। খুলে নেওয়া হয়েছে ঘরের চাল, দরজা-জানালা। নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে নলকূপ, শৌচাগার। সন্ত্রাসীরা দিনের পর দিন লুট করে নিয়ে গেছে কৃষক পরিবারগুলোর বিপদের সম্বল গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি। কেটে নিয়েছে ফলদ, বনজ, এমনকি ফুলগাছও; ভেঙে ফেলেছে দালানের ছাদ।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিএনপি সমর্থক অধ্যুষিত চরগড়গড়ি পশ্চিমপাড়া গ্রামের চিত্র এটি। দেড়শ পরিবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় গ্রামছাড়া হওয়ার প্রায় চার মাস পর ক্ষমতার পালাবদলে গত ৫ আগস্ট ফিরে তাদের বাড়িঘর এমন অবস্থায়ই পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের হামলা-মারপিট থেকে প্রাণ বাঁচাতে ও মামলার হয়রানি এড়াতে পরিবারসহ ছাড়তে হয় ভিটেমাটি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাড়ি ফিরলেও সন্ত্রাসীদের তা-ব ও লুটপাটে তারা নিঃস্ব, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও কেবলই ধ্বংসস্তূপ।
ভুক্তভোগীরা জানান, সাহাপুর ইউনিয়নের বিএনপি সমর্থক অধ্যুষিত চরগড়গড়ি পশ্চিমপাড়ার ভোটারদের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। কিন্তু পছন্দের প্রার্থী না থাকায় ও বিএনপির ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাননি গ্রামটির অধিকাংশ মানুষ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সন্ত্রাসী বাহিনী জোরপূর্বক কেটে নেয় গ্রামবাসীর ফসল, দখলে নেয় জমি। এসব নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত ১৯ এপ্রিল সন্ত্রাসীরা গ্রামে হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে গুরুতর জখম করলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে নিহত হন ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা খায়রুল। সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ধারাবাহিক হামলা-লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ অভিযোগ না নিলেও, খায়রুল হত্যা মামলায় আসামি করা হয় নিরপরাধ অধিকাংশ গ্রামবাসীকে। মামলায় হয়রানির ভয় ও সন্ত্রাসীদের হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে ভিটেমাটি ছাড়েন তারা। এরপর থেকে গত প্রায় চার মাসে একে একে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি, দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়।
সরেজমিন গত ২৪ আগস্ট চরগড়গড়ি পশ্চিমপাড়া গ্রামে গিয়ে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সন্ত্রাসীদের তান্ডবের চিহ্ন চোখে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গ্রামে ফিরে সাজানো সংসারের কিছুই খুঁজে পাননি তারা। এই ভরা বর্ষায় আকাশের নিচে কাটছে দিন। বসতভিটা হারানো দোয়াত প্রামাণিক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা না শোনায় তারা পরিকল্পিতভাবে গ্রামে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালামের নির্দেশে সাহাপুর ইউপির সদস্য মিলন, মহিলা সদস্য রূপভান লক্ষ্মীকু-া ইউপির সদস্য আসাদুল, তরিকুল, যুবলীগ নেতা জহুরুলের নেতৃত্বে আমাদের লোকজনকে হত্যার উদ্দেশে হামলা করলে আমরা প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করি। এতে সংঘর্ষে খায়রুল মারা যান। এরপর থেকে তাদের লোকজন আমাদের বাড়িঘর থেকে সবাইকে মারধর করে বের করে দেয়। লুটে নেয় বাড়ির সবকিছু। আমরা এখন নিঃস্ব, পথের ফকির।’
হামলায় আহত ইসাহাক প্রামাণিক বলেন, ‘গ্রামে আমার সঙ্গে কারও বিরোধ নেই। কিন্তু তারা বিনা কারণে আমার হাত কেটে পঙ্গু করে দিয়েছে। আমার ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে গেছে। আমাদের কোনোদিনই বাড়ি ফিরতে দেবে না বলেও হুমকি দিয়েছিল তারা। আমরা এর বিচার চাই।’
কলেজ শিক্ষার্থী শামীম হোসেন বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা কেবল লুটপাট করেই ক্ষান্ত হয়নি। গ্রামের শিক্ষার্থীরা যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে, সেখানে গিয়েও আমাদের ওপর হামলা করে পরীক্ষা দিতে দেয়নি। নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর কেউ এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছে। তারা আমাদের মামলাও নেয়নি।’ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘চরগড়গড়ি পশ্চিমপাড়ার মানুষের একটাই অপরাধ তারা বিএনপির সমর্থক। যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। নতুন সরকারের কাছে আমি এই নৃশংসতার বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।’
এদিকে, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতারা এখন এলাকাছাড়া। অনেক খোঁজ করে পাওয়া গেল হামলায় অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ও সাহাপুর ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিলন প্রামাণিককে। লুটপাটের ঘটনা স্বীকার করলেও ‘কিছুই করার ছিল না’ দাবি এই জনপ্রতিনিধির। তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন হামলাকারীরা সশস্ত্র অবস্থায় এসেছিল। আমি তাদের নিষেধ করলে তারা আমাকেই হত্যা করত। তাই প্রতিরোধ করতে পারিনি। তবে হামলা, লুটপাটে আমি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই।’
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি। এ বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
