ওসমানীর মূল্যায়ন জরুরি   

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫৪ এএম

জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার সন্তানদের একজন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ওসমানীকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সুনামগঞ্জ জেলার জমিদার মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন ওসমানী। পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মা ছিলেন জুবেদা খাতুন। জেনারেল ওসমানীর পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল বর্তমান সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নে। প্রথমে তিনি আসামের গুয়াহাটির ‘কটনস্ স্কুল অব আসাম’ এবং পরে ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ১৯৩৮ সালে গ্র্যাজুয়েশন করেন। তারপর আলীগড়ে ইউওটিসি (ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর) কোর্সে অংশ নেন ওসমানী। সেখানে সার্জেন্ট পদবি পান। ইউওটিসি কোর্সে তার সামরিক প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে কোর্স প্রশিক্ষক লর্ড উইলিয়ানস তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেন। ১৯৩৯ সালে একজন ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন দেরাদুনের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে।

১৯৪০ সালে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে সামরিক জীবন শুরু হয় জেনারেল ওসমানীর। ১৯৪২ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি মেজর পদবি লাভ করেন। সে সময় মেজর ইয়াহিয়া খান, মেজর টিক্কা খান ও মেজর এএকে নিয়াজীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, পরবর্তীকালে এরাই মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর প্রবল প্রতিপক্ষ ছিলেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে ওসমানী একজন মেজর হিসেবে তৎকালীন বার্মায় (বর্তমানে মিয়ানমার) রণাঙ্গনের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ওসমানী লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে নবগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার ক্যারিয়ারে নানা উত্থান-পতন ঘটে যখন তিনি বাঙালি অফিসারদের নিয়োগ ও চিকিৎসা ইস্যুতে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হওয়া সত্ত্বেও রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত এবং পদত্যাগে বাধ্য হওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে সিনিয়র বাঙালি অফিসার মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদের চিকিৎসা ইস্যুতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল আইয়ুব খানের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় ওসমানীর। এই ঘটনা তার সামরিক জীবনকে প্রভাবিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়। তার পরিচিতি হয়ে যায় একজন ইস্পাতকঠিন ও জেদি অফিসার হিসেবে।

১৯৬১ সালে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান ওসমানী। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্নেল ও ডিডিএমও হিসেবে তিনি অবসরে যান পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সিলেট জেলার বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর ওসমানী আর পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির এমএনএ পদে থাকতে চাননি। কারণ, তখন নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশ প্রাদেশিক সরকারের সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন এবং এর পাশাপাশি বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেসের তৎকালীন কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার জেনারেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রতিটি কাজই দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করেন তিনি। তার সুচিন্তিত রণকৌশলের ফসল হিসেবে যুদ্ধ শুরুর ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ওসমানী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৭২ সালে পূর্ণাঙ্গ জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহণের পর জেনারেল ওসমানীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের মন্ত্রিসভায় জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ও বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও মন্ত্রী হন জেনারেল ওসমানী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের মন্ত্রিসভায় তাকে ডাক, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন, জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ও বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন জেনারেল ওসমানী। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত আরেক এমপি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এবং ওসমানী দুজনই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিলোপ সাধনের প্রতিবাদ জানান এবং আওয়ামী লীগ থেকে ১৯৭৪ সালের মে মাসে পদত্যাগ করেন।

১৯৭৪ সালে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রতিবাদে সংসদ ও দল থেকে পদত্যাগ করে তিনি দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ জনতা পার্টি এবং তিনি সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেনারেল ওসমানী পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গণ ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওসমানী জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে ওসমানী তার প্রতিবাদ জানান। এরপরই তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৮৩ সালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে জেনারেল ওসমানীর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। পরবর্তী সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি খরচে তাকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস সুসংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল।  সময় এসেছে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে জেনারেল ওসমানীকে প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার। তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই তার জীবন-ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা করতে হবে।

লেখক :  সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত