ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর ও চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় সারা দেশে সব ধরনের চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা এই কর্মসূচিকে বলছেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। কেবল এবারই প্রথম নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের ধর্মঘটসহ নানা ধরনের কঠোর কর্মসূচিতে যেতে দেখা যায়। প্রায় প্রতি বছর রোগীর স্বজনদের সঙ্গে বিবাদ, চিকিৎসকদের ওপর হামলা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া কিংবা চিকিৎসকদের দাবি সরকার মেনে না নেওয়ার কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলনে নামেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। চিকিৎসা যেহেতু জীবন রক্ষাকারী সেবা, ফলে চিকিৎসা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করে বিকল্প উপায়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করা যায় কি না এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করেন, অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় চিকিৎসা ব্যতিক্রম। এই পেশার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত থাকে। ফলে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করাই এ সেবার মূল্য লক্ষ্য থাকে। চিকিৎসকদের ওপর হামলা হলে কিংবা রাষ্ট্র তাদের দাবি মেনে না নিলে তারা অবশ্যই আন্দোলন করবেন এবং বিচার চাইবেন। রাষ্ট্রের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধার কথা সবার আগে বিবেচনা করা ও অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু মানবসেবার এই মহৎ পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসকরাও যেন আন্দোলন করতে গিয়ে রোগীকে তার প্রাপ্য চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করেন এবং রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেন, সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
তারা মনে করেন, চিকিৎসকদের যেকোনো কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়ার আগে কতগুলো ধাপ মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারা শুরুতে লিখিতভাবে রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাদের দাবির কথা জানাতে পারেন। দাবি মানা না হলে চিকিৎসকরা কালো ব্যাজ ধারণ করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। প্রয়োজনে তারা এক ঘণ্টা করে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করে দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে পারেন। এরপরও যদি তাদের দাবি মানা না হয়, তাহলে চূড়ান্ত আন্দোলন হিসেবে ধর্মঘট শাটডাউনের মতো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচিতে যেতে পারেন।
গতকাল রবিবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সভাকক্ষে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আলোচনায় আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা কমপ্লিট শাটডাউনের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন আবদুল আহাদ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা নিজেদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকি। ফলে আন্দোলনের ঘোষণা দিই কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারি না। আমরা সবাই আগে রোগীদের কথা চিন্তা করি। আর বিভিন্ন সময় ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে সরকারগুলো। কেননা সরকার ধরেই নিয়েছে চিকিৎসকরা কঠোর আন্দোলনে যেতে পারবে না, ফলে বরাবরই তারা চিকিৎসকদের দাবির প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছে।
এদিকে চিকিৎসকদের আন্দোলনের কারণে হাসপাতালে দুর্ভোগে পড়েন সেবা নিতে আসা রোগীরা। তারা নতুন করে যেমন ভর্তি হতে পারেননি তেমনি হাসপাতালে ভর্তি থেকেও চিকিৎসকের চেহারা দেখেননি। আন্দোলনকারী কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, আন্দোলন কর্মসূচি যখন চলছিল তখনো তারা সিরিয়াস রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন বিবেকের জায়গা থেকে। ঢামেকের মতো জায়গায় যখন এক রাতে তিনবার হাসপাতালে ঢুকে হামলা চালানো হয় তখন আন্দোলনে যাওয়ার বিকল্প তাদের সামনে থাকে না। বছরের পর বছর ট্রেইনি ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা যে ভাতা পেয়ে আসছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। নানা মাধ্যমে জানানো ও আন্দোলনের পরও তাদের দাবি মানেনি সরকার। তারা দাবি করেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানানোর পরও সরকার তা করেনি। স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন থাকলে চিকিৎসকদের আন্দোলনে নামতে হতো না, এমনিতেই বিচার পেয়ে যেতেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক রোবেদ আমিন। তার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম চিকিৎসকরা কেন এমন কর্মসূচিতে গেলেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসকরা নানা সমস্যার মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। চিকিৎসার কর্ম পরিবেশ নেই, নিরাপত্তা নেই। চিকিৎসকরা মানুষের জীবন রক্ষার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করেন, এখন চিকিৎসালয়ে ঢুকে যদি সেই চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালানো হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অথচ এ রকম ঘটনা হাসপাতালে দিনের পর দিন ঘটছে। চিকিৎসকরা বিভিন্ন সময় লিখিতভাবে জানিয়েছেন কিন্তু তারা প্রতিকার পাননি, ফলে বাধ্য হয়ে এ রকম কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। যেকোনো দেশেই চিকিৎসার মতো জরুরি পেশা বন্ধ রাখার নিয়ম নেই। এটি চালু রাখতেই হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কমপ্লিট শাটডাউন কিংবা ধর্মঘটের বিকল্প কী হতে পারে চিকিৎসকদের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে নানা মহলে আমরা একটি দাবি জানিয়ে আসছি স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের। এই আইনে তিনটি বিষয় স্পষ্ট থাকবে। ১) যারা সেবা নেবে তাদের অধিকার রক্ষা করা হবে। যদি তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। ২) যারা সেবা দেবেন অর্থাৎ চিকিৎসক-নার্স ও সংশ্লিষ্ট সবার তাদের দায়দায়িত্ব আইনে নির্দিষ্ট করা থাকবে। যদি কোথাও তারা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে তাদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যদি তাদের অধিকার ভেঙে থাকেন, তাহলে তাদেরও আইনের মুখোমুখি করা হবে। ৩) সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল ও অন্যান্য দায়দায়িত্ব কী, তাও নিরূপণ করতে হবে। এই আইন না থাকার কারণে চিকিৎসক, রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে এক ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান থাকে।
ডা. লেলিন বলেন, চিকিৎসক যখন প্রতিকার পান না, তখন তারা ধর্মঘটের মতো কঠিন অবস্থানে যান। ধর্মঘটে যাওয়ার আগে কিছু নিয়ম মানতে হবে। তাদের দাবির কথা লিখিত জানাতে হবে। যেকোনো জরুরি খাতে হঠাৎ করে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া যাবে না। এখন পর্যন্ত দেশে যারা সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কেউ জনমুখী স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করেননি। ফলে চিকিৎসকরা বারবার ধর্মঘটের ডাক দিতে বাধ্য হন।
