কুমিল্লায় গরুর বাসস্থান ও খাবার নিয়ে বিপাকে খামারিরা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৩২ পিএম

কুমিল্লার সদর রসুলপুর ট্রেন স্টেশনের প্লাটফর্মে গরুকে পানির সঙ্গে বুশি খাওয়াচ্ছেন ৪৫ বছর বয়সী এক যুবক। চোখে মুখে তার রাজ্যের হতাশা। কাছে গিয়ে জানতে চাইলেই চোখ ছলছল করে ওঠে তার। তিনি জানালেন, তার নাম আরিফ। বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামে।

গ্রামে পানি আসার খবর পেয়ে খামারের গরু ও নিজ পরিবারকে নিয়ে পড়ছেন বিপাকে। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। তাই জীবন বাঁচাতে গত রবিবার মা বাবাসহ পরিবারের সব সদস্যকে রসুলপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় দিয়ে আসেন। আর তিনি নিজে গরু নিয়ে আসছেন সদর রসুলপুর রেল স্টেশন। তার সঙ্গে আব্দুর রশীদ নামের এক খামারিও ১২টি গরু নিয়ে আসছেন ওই স্টেশনে। স্টেশনের অদূরে পশ্চিম দিকে তার বাড়ি।

গরু নিয়ে আশ্রয় নেয়া মো. আরিফ বলেন, ‘আমি আসলাম রেল স্টেশনে আর পরিবারকে রেখে আসছি আশ্রয়কেন্দ্রে। আমার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ১৬০টি গরু রয়েছে। বন্যার পনিতে পুরো এলাকা ডুবে গেছে। আমার খামারের ভেতরে বুকসমান পানি। সে জন্য গরুগুলোকে নিয়ে রেলস্টেশনে থাকতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় গরুর বাসস্থান ও খাবার নিয়ে বিপাকে পড়েছি। বাজারে এক বস্তা (৫০ কেজি) খড়ের দাম ৫৮০ টাকা। কাঁচা ঘাস তো পাওয়া যায় না। কাঁচা ঘাস না পেয়ে খাল-বিল, ডোবা-নালা থেকে কচুরিপানা কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াতে বাধ্য হয়েছি।’

এ বিষয়ে সদর রসুলপুর রেলওয়ে স্টেশনের সহকারি স্টেশন মাস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ’গোমতীর বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় বন্যার পানি বাড়তে থাকলে এলাকার লোকজন শত শত গরু নিয়ে স্টেশনে এসে উঠেছে। পরে আমরা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা বলে গরু রাখার জন্য স্টেশন ছেড়ে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তানজিলা ফেরদৌসী লিমা বলেন, ‘বন্যার পানিতে প্রথম দিকে কিছুটা ঝুঁকি ছিল। আমরা সার্বক্ষণিক মনিটর করছি। আপাতত গবাদিপশুর তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। বন্যার পনিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গো-চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় কাঁচা ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছে। বন্যা আসার আগে খামারিদের নিয়ে বৈঠক করে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। খামারিদের খড়, ফিট, সাইলেস ও শুকনো খাদ্য সংগ্রহ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকশ খামারিকে গরু, মহিষ ও ছাগলের জন্য বিনামূল্যে খড়, ফিট, সাইলেস, শুকনো খাদ্য ও ওষুধ বিতরণ করেছি।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বন্যায় ১৪টি উপজেলায় কৃষিখাতের পাশাপাশি ৩০৮ কোটি টাকা প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে জেলাজুড়ে ৪ হাজার ২১৩টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ লাখ ৯ হাজার ৯১৪টি বিভিন্ন শ্রেণির গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার বাজার মূল্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত গরুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ৬২২টি, ১৬টি মহিষ, ৩০ হাজার ৮৯২টি ছাগল, ৬৯৩টি ভেড়া। মারা গেছে ৩৫টি গরু, তিনটি মহিষ, ১৭১টি ছাগল, এবং সাতটি ভেড়া।

হাঁস-মুরগির মধ্যে ২ হাজার ২১৮টি খামারে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৯টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজার মূল্যে যা ৩৯ কোটি টাকা। এসবের মধ্যে ২১ লাখ ৭ হাজার ৩৫৩টি মুরগী, ৩১ হাজার ৬৯৩টি হাঁস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৩৪২টি মুরগী এবং ২ হাজার ১৬০টি হাঁস। প্লাবিত হয়েছে ২ হাজার ১ দশমিক ৫ একর চারণভূমি। খাদ্যের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩ টন পশুপাখির দানাদার খাদ্য বিনষ্ট হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৫৯ কোটি টাকা। ৫৫ হাজার ৪৩৪ টন পশুপাখির খড় বিনষ্ট হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৮৯ কোটি টাকার বেশি।

এছাড়াও ৫৮ হাজার ৭৫১ টন ঘাস বিনষ্ট হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৭০ কোটি টাকা। মৃত পশুপাখিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়াও জেলায় বন্যায় আহত ১ হাজার ৫০০টি গবাদিপশুকে এবং ১১ হাজার হাঁস-মুরগিকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুমিল্লায় বন্যায় প্রাণিসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। আমরা একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি। বন্যার পানি নেমে গেলে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে পরবর্তীতে জানানো হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত