লাইসেন্স বাতিল হওয়া ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র ও পুলিশের স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে শুরু হয়েছে যৌথবাহিনীর অভিযান। গত মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানের কার্যক্রম প্রথম দিন তেমন একটা দৃশ্যমান ছিল না। দেশের কয়েকটি স্থানে ছোটখাটো অভিযান চললেও রাজধানী ঢাকার কোথাও অভিযানের দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে দু-এক দিনের মধ্যে পুরোদমে এই যৌথ অভিযান শুরু হবে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, আইনের আওতায় আনতে আটটি মেট্রোপলিটন এলাকা ও ৬৪ জেলার অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তির নামের তালিকা এরই মধ্যে যৌথবাহিনীর কাছে রয়েছে। যে তালিকায় রয়েছে অস্ত্র কারবারি, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজনকে গুলি চালিয়ে হত্যা মামলার আসামি, মাদক কারবারি, তালিকাভুক্ত দুর্নীতিবাজ, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর ও পৌরসভার মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, বিতর্কিত ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং বিগত সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী আমলাদের নাম। তালিকাটি নিয়ে প্রায় পনেরো দিন ধরে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তা ছাড়া পুলিশের স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যারা আগ্নেয়াস্ত্র লুট করেছে, তাদের চিহ্নিত করতে বিভিন্ন স্থান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত ১২টার (বুধবার) পর যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চালানোর কথা থাকলেও ধীর গতিতে তা চালানো হয়েছে। কিছু স্থানে অভিযান চালানো হয়। তবে বড় ধরনের কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে পুরোদমে অভিযান শুরু হবে। ইতিমধ্যে অপরাধীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। ওই তালিকায় অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তির নাম আছে। প্রায় সবারই ছবিসহ ঠিকানা দেওয়া আছে তালিকায়।’ পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অস্ত্রবাজ, শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকদের যারা হত্যা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে হয়রানি করা হবে না। যারা অভিযানে থাকবেন, তাদের নানা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশের স্থাপনায় যারা হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে ভবনের আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অস্ত্র থানায় দিয়ে এলেও বেশিরভাগই জমা দেয়নি। এখনো ২ হাজার ৬৬টি অস্ত্র ও ৩ লাখের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চায়নিজ রাইফেল, এসএমজি, পিস্তল, শটগান, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ও গ্যাসগান রয়েছে। ৬ লাখ ৬ হাজার ৭৪২টি গুলি, বিভিন্ন ধরনের টিয়ার গ্যাস, গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড লুট হয়েছিল। তার মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার ৬৬০টি গুলি, প্রায় ৯ হাজার টিয়ার গ্যাস, আড়াই হাজার সাউন্ড গ্রেনেডসহ অন্যান্য গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়নি। এসব উদ্ধার করতে না পারলে আমরা ঝুঁকির মধ্যে থাকব। আমাদের আশঙ্কা, ওইসব আগ্নেয়াস্ত্র পেশাদার অপরাধীদের কাছে চলে গেছে। যেভাবেই হোক অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণার পর শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্বস্তি। অনেকে বিষয়টি দেখছেন ‘নিরাপত্তাহীনতা’র বড় শঙ্কা হিসেবেও। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে অনেক থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্ত হয়েছে। ভস্মীভূত ও ধ্বংস হয়েছে পুলিশের অনেক স্থাপনা। এখনো পুরো সক্ষমতায় ফেরেনি পুলিশে। আবার মামলার আসামি হওয়ায় অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পুলিশের টহল ও তল্লাশি কার্যক্রমও কম। থমকে আছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার কার্যক্রম। অনেক থানা ও ফাঁড়ির অস্ত্রাগার লুট এবং ধ্বংস হওয়ায় বৈধ অস্ত্র রাখার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। ১৫ বছর ধরে যারা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন, তাদের তালিকা আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওইসব অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে বেশিরভাগ অস্ত্রই জমা পড়েনি।
১৬ জুলাই থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। দুর্বৃত্তরা বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন, মেট্রো রেলস্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু ভবন, বিভিন্ন থানা, পুলিশ ফাঁড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙচুর করে আগুন দিয়ে লুটপাট চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রাণ হারান কয়েকশ মানুষ। আবার দুর্বৃত্তদের হামলায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। তাদের হত্যা ও থানা-ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে শত শত আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। আন্দোলনের সময় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের অনেকে বৈধ ও অবৈধ অস্ত্রও ব্যবহার করেছেন। তারাও ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে। যাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতা, জেলা-উপজেলার নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাও আসামি হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে যৌথ অভিযানের জন্য পুলিশ একটি তালিকা তৈরি করেছে। ওই তালিকায় ১০ হাজার ব্যক্তির নাম আছে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যেসব ব্যক্তিকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ অস্ত্র জমা হয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ যারা জমা দেননি, তাদের অস্ত্র অবৈধ হয়ে গেছে। এখন কারও কাছে ২০০৯ সালের পরের লাইসেন্স করা অস্ত্র-গুলি পাওয়া গেলে অস্ত্র আইনে মামলা হবে। এর মধ্যে যেসব অস্ত্র দিয়ে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি ও হামলার অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় তাদেরও নাম আছে। অস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, আমলা, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন পেশার লোকজন ও সাংবাদিক রয়েছেন। তালিকাটি ইমিগ্রেশনে পাঠানো হয়েছে। তারা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। যৌথ অভিযানটি হচ্ছে জেলা, উপজেলা ও শহরভিত্তিক। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান সমন্বয় করছেন। মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনাররা সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় এই অভিযান পরিচালনা করছেন। সার্বিক সহযোগিতা করছে সশস্ত্র বাহিনী। উপকূলীয় এলাকায় সহযোগিতায় আছে কোস্ট গার্ড। সীমান্তবর্তী জেলাসহ সব জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদার আলোকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিজিবি সদস্য রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক আনসার সদস্যও কাজ করছেন। কয়েক দিনের মধ্যে অভিযান জোরালো করা হবে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ৫০ হাজার ৩১০টি। তার মধ্যে ব্যক্তিগত অস্ত্র ৪৫ হাজার ২২৬টি। বাকি অস্ত্রগুলো বিভিন্ন আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স করা। এসব অস্ত্রের মধ্যে পিস্তল ৪ হাজার ৬৮৩টি, রিভলবার ২ হাজার ৪৩টি, একনলা বন্দুক ২০ হাজার ৮০৯টি, দোনলা বন্দুক ১০ হাজার ৭১৯টি, শটগান ৫ হাজার ৪৪৪টি, রাইফেল ১ হাজার ৭০৬টি এবং অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ৪ হাজার ৬টি। এসব অস্ত্রের ১০ হাজার ২১৫টি রয়েছে রাজনীতিবিদদের কাছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে রয়েছে ৭ হাজার ২১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। বিএনপির নেতাকর্মীর কাছে ২ হাজার ৫৮৭টি এবং অন্যান্য দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নামে রয়েছে ৭৯টি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের মধ্যে যারা জমা দেননি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব অস্ত্র জমা দেওয়ার তারিখ শেষ হয়ে গেছে। ওইসব অস্ত্র উদ্ধার করতে যৌথবাহিনী কাজ করছে। যারা অস্ত্র জমা দেননি, তাদের নামে থানায় মামলা হবে। পুলিশের স্থাপনা থেকেও অস্ত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রবাজসহ বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও এপিএসদের নামও রয়েছে যৌথবাহিনীর তালিকায়। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরবাণিজ্য, অবৈধ দখলসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মাদক কারবারিদেরও ধরার চেষ্টা চলছে।
