কে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১১:৪৫ এএম

শেখ মোহাম্মদ আসলাম। একসময় সুইডেন ছিলেন বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন সুইডেন আসলাম নামে। তেজগাঁও এলাকার এই শীর্ষ সন্ত্রাসী একসময় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগৎ কাঁপাতেন।

১৯৮৬ সালে তিনি অপরাধ জগতে যুক্ত হন। ওই বছর পূর্ব রাজাবাজারে স্কুলের সামনে কিশোর শাকিলকে গুলি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তারপর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যাকা-সহ নানা অপরাধের তথ্য বের হয়ে আসে। এরই মধ্যে নিজেকে রক্ষা করতে সুইডেন চলে যান। বছর পাঁচেক ওই দেশে থেকে আবার ফিরে আসেন দেশে। তারপর সুইডেন শব্দটি নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। 

১৯৯৬-১৯৯৬ সালে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আলোচিত অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার বেশির ভাগ ঘটনার পেছনের জড়িত থাকতো তার নাম। কিন্তু তার নাম বারবার আসার পরও ব্যক্তি আসলামকে কখনো দেখা যেত না। ছদ্মবেশেই ঘুরে বেড়াতেন তিনি। পরে থাকতেন বুলেট প্রুপ জ্যাকেট।

১৯৯৭ সালে যুবলীগ নেতা গালিবকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন সুইডেন আসলাম। তখন সবার সামনে চলে আসে আসলামের আসল পরিচয়। গ্রেপ্তার সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় পছন্দের বুলেট প্রুফ জ্যাকেটও। আটক হওয়ার পরও তার নিয়ন্ত্রণ ছিলো অপরাধ জগৎ। জেলখানাতে বসেই চালা পিচ্চি হান্নানের সহযোগিতায় সব কিছু চালাতেন তিনি।

আসলামের উত্থান মূলত ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে। শুরুতে নিজের বেড়ে ওটা এলাকা ইন্দিরা রোডেই ছিল তার আধিপত্য। ১৯৮৭ সালে মায়ের সামনে কিশোর শাকিলকে খুন করার অভিযোগে ব্যাপক আলোচনায় আসেন সুইডেন আসলাম।

সেই সময় জাতীয় তরুণ পার্টির রানা গ্রুপ কারওয়ান বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকার অপরাধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করত। রানা গ্রুপের একজন ক্যাডার ছিলেন পিচ্চি হান্নান। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ১৯৯০ সালের পর রানা গ্রুপের সঙ্গে সুইডেন আসলাম গ্রুপের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। রানার ক্যাডার বাহিনী বেশ শক্তিশালী ছিল। দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা পাল্টা-হামলার ঘটনা ঘটত নিয়মিত। দুই গ্রুপের হামলা পাল্টা-হামলার মধ্যে ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলিতে অনেকেই হতাহত হয়েছিলেন।

 ১৯৯৬ সালের দিকে পিচ্চি হান্নানকে নিজদলে নেন আসলাম। এরপর আসলাম  হান্নানকে দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের সুপারস্টার হোটেলের সামনে রানাকে খুন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পরই কারওয়ান বাজার, ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ শেরেবাংলা নগর এলাকা আসলামের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে । পরে হান্নানের হাতে কারওয়ান বাজার, তেজতুরি বাজারের নিয়ন্ত্রণ দেন আসলাম।

জানা যায়, কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলীয় এলাকায় আড়ৎমালিক, গার্মেন্টস মালিক, জায়গা কেনা-বেঁচাসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীসহ অনেকের কাছ থেকে হান্নান কিংবা তার বাহিনী চাঁদা তুলতেও জেলে বসেই সেই টাকার ভাগ পেতেন আসলাম। মাদক চোরাকারবার, কন্ট্রাক্ট কিলিং, অর্থের বিনিময়ে জমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সুইডেন আসলামের জড়িত থাকার তথ্যও শোনা যায়।

জানা যায়, কারাগারে থেকেই হান্নানের সহায়তায় অপরাধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন আসলাম। জেলখানার ভেতরেও তিনি একাধিকবার মারামারি করে আলোচিত হন। কারাগারে তার সেল থেকে দুটি মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়। এসব ফোন দিয়ে তিনি কারাগারের বাইরে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এমনকি যারা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, তাদেরসহ মামলার সাক্ষীদের হুমকিও দিতেন। এসব কারণে নানা সময়ে কয়েকবার তার কারাগার পরিবর্তনও করা হয়।

পরবর্তীতে ২০০০ সালের পর পিচ্চি হান্নানের নামও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে হান্নান নিজেই শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলে। এরপর তিনি সুইডেন আসলামের নাম বাদ দিয়ে নিজের আধিপত্য বাড়াতে থাকেন। এক পর্যায়ে হান্নান নিজের নামে সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করেন।

আসলামের ঘনিষ্ঠদের অনেকে জানান ২০১০ সালের পর তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারতেন। কিন্তু 'ক্রসফায়ারের' ভয়ে তিনি সেভাবে জামিনের চেষ্টাও করেননি।

বিভিন্ন সময়ে সুইডেন আসলামের নামে ২২টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে নয়টিই হত্যা মামলা বলে জানা গেছে। অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরসহ কয়েকটি মামলায় সাজাও হয়েছিল তার।

মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে দীর্ঘ ২৭ বছর পর কারাগার থেকে বের হন। ২৭ বছর পর মুক্তি পাওয়া শীর্ষ এই সন্ত্রাসীর বয়স এখন ৬২ বছর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত