মহান আল্লাহ মানুষের ধন-সম্পদ, বিদ্যা-বুদ্ধি, ক্ষমতা, বংশ, রূপ-লাবণ্য দেখেন না। তিনি দেখেন নামাজ-রোজা পালনের পর কোন মানবপ্রেমিক বান্দা তার সাধ্যানুযায়ী জনসেবা ও মানবতার কল্যাণ সাধন করেছে। তাই প্রত্যেক মানুষেরই মানবতাবোধ এবং উদারনৈতিক মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীতে বসবাস করে। একে অন্যের সহযোগিতা ছাড়া মানুষ একদিনও চলতে পারে না। তাই সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি ঐতিহ্যে সামাজিক কল্যাণের ধারণাকে প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে সামাজিক সেবা চর্চার বিষয়টিকে উৎসাহিত এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলমানের ধর্মীয় জীবন অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায় যদি তিনি মানবকল্যাণে অংশগ্রহণ না করেন। সমাজকল্যাণ সম্পর্কে কোরআনের এই আয়াতটি উল্লেখ করা হয়, ‘আর সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে। বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ইমান আনবে আল্লাহর ওপর, কেয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসুলদের ওপর। আর সম্পদ ব্যয় করবে তারই মহব্বতে আত্মীয়স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। আর যারা নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে, যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, তারাই হলো পরহেজগার। (সুরা বাকারা ১৭৭) একইভাবে ইসলাম ধর্মে মাতা-পিতা, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অসুস্থ, বৃদ্ধ এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকদের প্রতি দায়িত্বের কথা নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে।
অন্য কোনো নিয়তে মানবসেবা নয়, বরং ইসলামের ফরজ দায়িত্ব হিসেবে করা চাই। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি যেমন শরিয়তে ফরজ, মানবসেবাও ফরজ। এ ফরজ আদায়ের নিয়তে মানবসেবা করতে হবে। যার সম্পদ আছে, সে সম্পদ দিয়ে মানুষের সেবা করবে। যার বুদ্ধি আছে, সে বুদ্ধি দিয়ে মানুষের সেবা করবে। যার শক্তি আছে, সে শক্তি দিয়ে মানুষের সেবা করবে। যার যতটুকু সাধ্য আছে, সেভাবে সে মানুষের সেবা করবে। মানবপ্রেম ও মানবসেবার বিষয়টি খাটো করে দেখার উপায় নেই, বরং এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ইসলামে মানবপ্রেমকে ইমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ সে অন্য মুসলমানের জন্য তা ভালো না বাসবে, যা নিজের জন্য ভালোবাসে। (সহিহ বুখারি)
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেল, নিজের জন্য আমরা যা ভালোবাসি, অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসতে হবে। নিজের জন্য যেমন চাই, অপরের জন্য যদি সেটা না চাই, তাহলে আমাদের ইমান পূর্ণাঙ্গ হবে না। আর মানবপ্রেম জান্নাতি হওয়ার লক্ষণ। জান্নাতিদের আলোচনায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা দাহর ৮-৯)
মানুষ কামনা করে তার নিজের উন্নতি হোক, তার ধন-সম্পদ হোক, তার সুখ-শান্তি হোক, তার ছেলে-মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হোক, তার ছেলে-মেয়েদের ভালো ঘরে বিয়ে হোক। প্রত্যেকে চায়, আমি যেন ভালো চাকরি পাই, আমি যেন ভালো পদ-পদবি পাই, আমি যেন ইজ্জত-সম্মান পাই ইত্যাদি। আমরা প্রত্যেকে নিজের জন্য এগুলো ভালোবাসি। অতএব অন্যের জন্যও এগুলো ভালোবাসতে হবে। আমি নিজের জন্য বিপদাপদ চাই না। তাই অন্যের জন্যও বিপদাপদ চাইতে পারব না। নিজের জন্য নিরাপত্তা চাই। তাই অন্যের জন্যও বিপদাপদ চাইতে পারব না। নিজের জন্য নিরাপত্তা চাই। তাই অন্যের জন্যও নিরাপত্তা চাইতে হবে। আমার মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য যেমন চেষ্টা করি, অন্যের জন্যও তেমন চেষ্টা করতে হবে। আমার কামনা হলো, অনাহারে যেন না থাকি। অতএব অন্যের জন্যও তা চাইতে হবে। এক কথায়, সবাইকে নিজের মতো করে দেখতে হবে। সবার জন্য নিজের মতো করে চাইতে হবে। সবাইকে নিজের মতো করে ভাবতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা অনেক বড় ব্যাপার। এমনকি এটাকে ইসলামের অঙ্গ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এমন না হতে পারলে আমরা মুমিন নই। রাসুল (সা.) বলেছেন, দয়াময় আল্লাহ দয়ালুদের দয়া করেন। তোমরা জমিনবাসীদের ওপর দয়া করো, তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করবেন। (জামে তিরমিজি)
মানবপ্রেম ও মানবসেবা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অনেক ফজিলতের কাজ। মানবসেবার একটি ফজিলত হলো, এর দ্বারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ শুধু তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (মুসনাদে আহমদ) নেক আমলের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত থাকলেই মুক্তি পাওয়া যাবে। আল্লাহর রহমত লাভের সবচেয়ে সহজ পথ হলো, তার সৃষ্টির প্রতি সহযোগিতা ও উপকারের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের বেশি উপকার করে। তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নেক আমল হলো, কোনো মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ দেওয়া, তার দুঃখ-কষ্ট দূর করা, তার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া, তার ক্ষুধা দূর করা। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ) মানবসেবার উপকার সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, মানবকল্যাণমুখী কাজ বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে। গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ নির্বাপিত করে। রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় আয়ু বৃদ্ধি পায়। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)
