মূলধারার সংবাদমাধ্যমে উপেক্ষিত জার্মানির অতি ডানরা। তবে বিকল্প সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
জেনারেশন জেড বা জেন-জি দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্বকে। একের পর এক গণতান্ত্রিক ও জনমুখী আন্দোলনের মাধ্যমে তারা পুরো ব্যবস্থাকে হটিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বকে নতুন সম্ভাবনার দ্বারে নিয়ে আসছে তারা। তবে সব জেনারেশন জেডের অবস্থা এমন নয়, যেমন জার্মানিতে। সেখানে চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে জার্মানি জেন-জি। এই চরম ডানপন্থিরা শুধু অভিবাসনবিরোধী নয়। তারা উগ্র এবং নিজেদের মতাদর্শের বাইরে কাউকে সহ্য করতে পারে না। তাদের কেউ কেউ নাৎসিবাদের পক্ষে সক্রিয়। যাদের একজন ম্যাক্সিমিলিয়ান ক্রাহ। যিনি জার্মানির অ্যাসেন্ড্যান্ট অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) পার্টির সদস্য। তিনি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টেরও একজন সদস্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অনেক ফলোয়ার। সম্প্রতি তিনি একটি ভিডিওতে বলেছেন, ‘আমরা যদি একটি ভবিষ্যৎ পেতে চাই, যদি আমরা আমাদের বৃদ্ধ বয়সে যত্ন নিতে চাই এবং নিরাপদ থাকতে চাই, তাহলে আমাদের সন্তান দরকার, নিজেদের সন্তান। কারণ অভিবাসীরা বয়স্ক ইউরোপীয়দের যত্ন নেবে না।’ তার এ মন্তব্য বর্ণবাদী বা বিদ্বেষপূর্ণ। তিনি খাঁটি জার্মান রক্ত চান। দুজন খাঁটি জার্মানের মিলনের ফলে আরেকজন খাঁটি জার্মান জন্ম নেবে। যারা ভবিষ্যৎ জার্মানির দেখভাল করবে, সঙ্গে মা-বাবারও। কিন্তু যদি একজন জার্মান ও আরেকজন অভিবাসীর সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে সে কখনো বৃদ্ধ জার্মান মা-বাবার দেখভাল করবে না।
রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নাৎসিবাদের পক্ষে মন্তব্যের জন্য ক্রাহ সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তিনি জার্মানির চরম ডানপন্থিদের একজন, যারা সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা উপভোগ করেছেন। দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে বলছে, ওই ভিডিও একটি উদাহরণ মাত্র। তাদের ভাষ্যে, জার্মানির মূল ধারার সংবাদমাধ্যম বছরের পর বছর ধরে অভিবাসনবিরোধী এএফডিকে উপেক্ষা করে আসছে। তারা ভেবেছিল, সংবাদ প্রকাশ না পেলে জনমনে চরমপন্থিদের ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করবে। তবে টিকটক এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে চরমপন্থিরা জার্মানদের কাছে পৌঁছানোর মওকা পেয়ে গেছে।
নতুন প্ল্যাটফর্ম
দ্য টেলিগ্রাফ জানাচ্ছে, নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে উপেক্ষিত হলেও সামাজিক মাধ্যম কাজে লাগিয়ে ক্রাহ বা তার দল এএফডি সরাসরি সমর্থকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিধিনিষেধ থেকে তারা এভাবে নিজের স্বাধীন মাধ্যম খুঁজে নিয়েছে। আর তাদের এ তৎপরতা শক্তিশালী ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। দলটি গত সপ্তাহে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো রাজ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। তারা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছে। এক জরিপ অনুসারে, ওই অঞ্চলের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৩৮ শতাংশ ওই দলকে ভোট দিয়েছে। যাদের মধ্যে তরুণদের ভোট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দ্য টেলিগ্রাফ জানাচ্ছে, ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সী জার্মানদের অর্ধেকেরও বেশি সংবাদ এবং রাজনীতির আপডেটের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। যারা নিয়মিত টিকটক ব্যবহার কারে। এএফডির শীর্ষ প্রার্থী বিয়ন হাকার টিকটকে এক লাখের বেশি ফলোয়ার রয়েছে। যিনি জেনেশুনে একটি নাৎসি স্লোগান ব্যবহারের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক ভিডিওতে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রবাসীদের সম্পর্কে কথা বলতে হবে। যারা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে একমত নয়, তাদের অবশ্যই আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
টিকটক
সমালোচকরা সতর্ক করেছেন, টিকটক চরমপন্থি মতামতকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিকাশের অনুমতি দিচ্ছে। হেন্ড্রিক জর্নার বলেছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যে অনেক তরুণ-তরুণী সাংবাদিকদের থেকে তাদের তথ্য নেয় না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নেয়। এর মাধ্যমে তারা অপপ্রচারের শিকার হয়ে নিজেদের হেয় করছে। টিকটকে ক্রাহর ৬০ হাজারের বেশি ফলোয়ার রয়েছে এবং তার ভিডিওগুলো ছয় লাখেরও বেশি বার লাইক করা হয়েছে। এপ্রিল মাসে তিনি জনসাধারণের নজরে আসেন, যখন প্রসিকিউটররা দাবি করে যে ক্রাহ চীন এবং রাশিয়া উভয়ের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। তার সহকারীকে বেইজিংয়ের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ক্রাহ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসব ঘটনায় এএফডি ক্রাহকে দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। যদিও এসব অভিযোগের কারণে টিকটকে তার জনপ্রিয়তা কমেনি। একই দলের অন্যান্য প্রার্থীরও জনপ্রিয়তা রয়েছে টিকটকে। তাদের নেতা অ্যালিস উইডেল এবং চেয়ারম্যান উলরিচ সিগমুন্ডের যথাক্রমে তিন লাখ ৩০ হাজার এবং সাড়ে চার লাখ ফলোয়ার রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অলিভার লেম্বকে বলেন, টিকটকে এএফডি এখনো তার নিজস্ব কর্মী এবং মতাদর্শ প্রচারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির দুর্দান্ত সাফল্যে অবদান রাখছে টিকটক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ বছরের ইইউ নির্বাচনের দৌড়ে টিকটক এএফডিকে বেশি প্রচার করছে। ব্যবহারকারীরা অন্য দল অনুসন্ধান করতে গেলেও এএফডি তাদের সামনে চলে আসে। যদিও টিকটকের এক মুখপাত্র বলেছেন, আমরা নির্বাচনের সময় ভুল তথ্য এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে দৃঢ় নীতি প্রয়োগ করি এবং আমাদের লোকেদের নির্ভরযোগ্য তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করি। এটি দাবি করা সম্পূর্ণ মিথ্যা যে টিকটক রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী কাউকে সমর্থন করে না।
মোকাবিলা
টিকটকসহ সামাজিক মাধ্যমে এএফডির সাফল্য চ্যান্সেলর স্কোলজের জন্য একটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। তার সরকার সতর্ক করেছে যে, অতি ডানপন্থা জার্মান সমাজের সবচেয়ে বড় হুমকি। বেশ কয়েকটি রাজ্য এএফডিকে একটি চরমপন্থি সংগঠন হিসেবে মনোনীত করেছে, দেশীয় নিরাপত্তা পরিষেবাগুলো এটিকে পর্যবেক্ষণে রাখছে। ২০১৭ সালে জার্মানি একটি নতুন নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট প্রবর্তন করে, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ঘৃণাত্মক বক্তব্য অপসারণে আর তা না হলে মোটা জরিমানার ঝুঁকিতে বাধ্য করে। তবে বাকস্বাধীনতার প্রচারকদের বিরোধিতার মুখে পড়ে এ আইন। এই বিরোধিতা আংশিক জয় পায় যখন জার্মান আদালত রায় দেয় যে, নতুন আইন ইইউ বিধি লঙ্ঘন করেছে। তবে চটজলতি বছরের জুলাই মাসে সরকার চরমপন্থি ম্যাগাজিন কমপ্যাক্টকে নিষিদ্ধ করে। যে ম্যাগাজিনটি ইহুদি, মুসলিম এবং বিদেশিদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচার করে আসছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য প্রধান দলগুলোর উচিত টিকটকসহ সামাজিক মাধ্যমের অ্যাপগুলোতে তাদের উপস্থিতি বাড়ানো। যাতে নিশ্চিত করা যায় যে, এসব সামাজিক মাধ্যম শুধু অতি-ডান দৃষ্টিভঙ্গির একটি চেম্বার হয়ে না থাকে। অধ্যাপক লেম্বকে বলেন, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জড়তা বিস্ময়কর। লক্ষ্য হতে হবে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টা পাবলিক ক্ষেত্র গড়ে তোলা, শুধু সুশীল সমাজের দিক থেকে নয়, দলীয় রাজনৈতিক দিক থেকেও জরুরি। জার্মান ট্যাবলয়েড দ্য বিল্ডের প্রকাশক অ্যাক্সেল স্প্রিংগারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ডপফনার গত বছরের একটি মতামতে লেখেন, সমস্যা সম্পর্কে কথা না বলা সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রকৃতপক্ষে যখন সমস্যাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়, তখন কেবল সমস্যাকেই শক্তিশালী করে।
এএফডি
বিবিসি কয়েক বছর আগের প্রতিবেদনে বলা হয়, এএফডির কো-চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার গৌল্যান্ড ‘বিদেশিদের আক্রমণের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেছেন এবং দলটি খোলাখুলিভাবে ইসলাম ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে। তারা ইসলামকে জার্মান সমাজের জন্য ‘বিজাতীয়’ হিসেবে দেখে। পার্টির কিছু বক্তব্যকে নাৎসি ধাঁচের বলে মনে হয়। এএফডির সঙ্গে মিল আছে ফ্রান্সের অতি-ডান জাতীয় ফ্রন্ট এবং অস্ট্রিয়ার অতি-ডান ফ্রিডম পার্টি, গির্ট ওয়াইল্ডার্সের জনপ্রিয় ইসলামবিরোধী ডাচ ফ্রিডম পার্টি। ২০১৭ সালে অতি-ডানপন্থি দল এএফডি প্রকাশ্যে ইসলামবিরোধী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রকাশ ঘটায়। তখন জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১৩ শতাংশ রাষ্ট্রপতি ভোট জিতেছিল তারা। পরের বছর এটি খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটদের পর জার্মানির দ্বিতীয় জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এএফডির উত্থানের পর জার্মান এমপ্লয়িস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএ) প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এএফডির উত্থানে একটা বিষয় স্পষ্ট, জার্মানি এখন দিশায় চলেছে, তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন ও তাদের আস্থা কমছে। তিনি ডানপন্থিদের প্রতি মানুষের ঝোঁকের জন্য আংশিকভাবে চ্যান্সেলর শলৎজের নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, শলৎজের নেতৃত্বাধীন তিন দলের জোটকে তাদের নীতি বদলাতে হবে। জার্মান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চের প্রেসিডেন্ট মার্সেল ফ্রাটশারও বলেছেন, এএফডি বাণিজ্যিক সুরক্ষা, অভিবাসন কমানোর নীতি নিয়ে চলতে চায়। এতে অনেক কোম্পানি চলে যেতে পারে। দক্ষ শ্রমিকরা পূর্ব জার্মানির প্রতি উৎসাহ হারাতে পারেন। এর প্রভাব ওখানকার অর্থনীতিতে পড়বে। তরুণ ও দক্ষ নাগরিকরা ওই দুই রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারেন, যেখানে তাদের কদর বেশি হবে। বিবিসি বলছে, এখন জার্মানি আরও একটি রাজনৈতিক শকওয়েভের জন্য প্রস্তুত, কারণ জরিপগুলো পরামর্শ দেয় যে এএফডি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ব্র্যান্ডেনবার্গ রাজ্যের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোটও নিতে পারে। পোলিশ সীমান্তের কাছে, জামলিটজ এবং ক্লেইন ডুবেনের দুটি ছোট গ্রামে, অতি ডানপন্থিদের সমর্থন বেড়েছে। প্রাক্তন রক্ষণশীল (সিডিইউ) ভোটার ইঙ্গলফ বলেন, যখন তিনি কমিউনিস্ট জার্মানিতে বেড়ে ওঠা বালক ছিলেন তখন মান আরও ভালো ছিল। তিনি জার্মানির সমতল অর্থনীতির পাশাপাশি অভিবাসন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এই গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে ডানপন্থি দাঙ্গাকে ‘গৃহযুদ্ধের মতো অবস্থার’ সঙ্গে তুলনা করেন। এএফডি মাত্র সাত বছর ধরে বিদ্যমান এবং এর নেতৃত্ব নিয়মিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এর সবচেয়ে পরিচিত ব্যক্তিরা হলেন সহ-নেতা আলেকজান্ডার গৌল্যান্ড, পার্লামেন্ট গ্রুপের নেতা অ্যালিস ওয়েইডেল এবং বিজর্ন হকে, এর পূর্বাঞ্চলীয় কেন্দ্রস্থলে দলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
