নারায়ণগঞ্জ থেকে ভবিষ্যতে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে পলিসি মেকিংয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে আমরা আরও বেশি নেতা দেখতে চাই। কারণ দিনশেষে সবকিছু নির্ধারিত হয় ওই সংসদ থেকে। আমরা আগামী দিনে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই। একদা প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ বিগত ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে।’ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জে পৌর স্টেডিয়াম মাঠে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন সারজিস আলম।
এদিন সকালে তিনি নারায়ণগঞ্জ আসেন। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হতাহত কয়েকজনের বাড়িতে গিয়েও সান্ত্বনা দেন।
এদিকে গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নিহত আরও অনেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। তারা ওইসব এলাকায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায়ও বক্তব্য দেন। তাদের মধ্যে রাঙ্গামাটির কর্মসূচিতে হাসনাত আবদুল্লাহ, সিলেটে হাসিব আল ইসলাম, কুড়িগ্রামে আবু সাইদ লিয়ন, তারিকুল ইসলাম ও মুনতাহিনা মেহজামিন মোহনাসহ ১২ জন, কিশোরগঞ্জে তৌফিক সিয়াম এবং কুমিল্লায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ অংশ নেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯টি প্রতিনিধিদল সারা দেশের জেলা ও বিভাগগুলো সফর করছেন। সমন্বয়করা জানান, গণ-অভ্যুত্থানে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষ সব জায়গা থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার দাবি ও প্রত্যাশার কারণে এ সফর। স্বৈরাচার পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশ, সেই নতুন বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও দাবিগুলো কী, সেগুলোর ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিচালনা করাই এ সফরের উদ্দেশ্য।
নারায়ণগঞ্জের সমাবেশে সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘এ নারায়ণগঞ্জে অল্পকিছু মানুষ বৃহৎ গোষ্ঠীকে জিম্মি করে গার্মেন্টস, অটোস্ট্যান্ড, মার্কেট থেকে চাঁদাবাজি করছে। ছাত্র-জনতা এসব অপকর্ম সমর্থন করে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকাররে আমলেও এসব চাঁদাবাজি হয়েছে। ১৬ বছর পর যদি মানুষ অন্য কোনো রূপে এসব কাজ করে, তাহলে সেটা গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে মøান করে দেবে। তবে আমরা ছাত্রসমাজ যখন প্রয়োজন হবে তখনই প্রয়োজনে আবারও মাঠে নামব। প্রয়োজন হলে শেখ হাসিনার মতো সেই ফ্যাসিস্টদের দেশছাড়া করব। আমরা কারও লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হব না। এজন্য আমাদের এখন থেকেই তরুণ ও ছাত্রসমাজকে যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। তাই আমাদের প্রধান কাজ হবে পড়াশোনা করা।’
এর আগে দুপুরে শহরের ইসদাইরে বাংলা ভবন কমিউনিটি সেন্টারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতের পরিবারের স্বজন ও আহতদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সারজিস আলম আহতদের উন্নত চিকিৎসার সহায়তার আশ্বাস দেন।
ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা হবে জানালেন আসিফ : অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে, মাথা নিচু করে নয়। কথা হবে মাথা উঁচু করে। কথা বলতে হবে সমুন্নত সম্মান দিয়ে। ভারত এত দিন একটি দলের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু এখন আর তা হবে না।’ গতকাল বিকেলে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘শুধু ১৬ বছর নয়, গত ৫৩ বছর ধরে এ দেশের ওপর শুধু জঞ্জাল জমা হয়েছে। আমরা খুব দ্রুত সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ৫৩ বছরের জঞ্জাল এক দিনে বা এক মাসে কীভাবে সমাধান করা যায়, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু ইতিমধ্যে আমরা কিছু পরিবর্তন দেখতে পেরেছি। ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা ফেসবুকে পোস্ট, গান-কবিতা করেও আমাদের জেলে যেতে হয়েছে। এখন আর র্যাব, ডিবি ও পুলিশ সদস্যরা ঘরের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে না। আমরা সবাই স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। সেটি সম্ভব হয়েছে একমাত্র আপনাদের জন্যই।’
মতবিনিময় সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, সুমাইয়া আক্তার, হামযা মাহবুব, জিয়া উদ্দিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
রাজনীতিসচেতন প্রজন্ম চান হাসনাত আবদুল্লাহ : গতকাল বিকেলে রাঙ্গামাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার “আই হেইট পলিটিকস” প্রজন্ম তৈরি করে জনগণকে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। আমরা সেই রাজনীতি অসচেতন প্রজন্ম চাই না। আমরা চাই বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতিসচেতন হিসেবে গড়ে উঠুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সব জনগণের রাজনীতি করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু পড়াশোনার মাধ্যমে প্রত্যেকটি ছাত্র নাগরিককে রাজনীতিসচেতন হয়ে গড়ে উঠতে হবে। যাতে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা তৈরি হয়।’ মতবিনিময় সভা শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ছাত্র-জনতার ঐক্য ধরে রাখতে গুরুত্বারোপ হাসিবের : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম বলেছেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে যারা নিহত ও আহত হয়েছেন, তাদের সব সময় স্মরণে রাখতে হবে। আন্দোলনে যারা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য ছাত্র-জনতার ঐক্য ধরে রাখতে হবে। সেই এক্যের মাধ্যমেই বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তুলতে হবে।’ আন্দোলন চলাকালে সিলেটে পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিক এটিএম তোরাবের পরিবারকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। হাসিব আল ইসলামের নেতৃত্বে সমন্বয়কদের একটি টিম গতকাল সিলেটে আসে। তারা সিলেট নগরীর যতরপুরে সাংবাদিক তোরাবের বাসায় গিয়ে তার মা ও স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
কুড়িগ্রাম সফরে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা সমন্বয়কদের : কুড়িগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছেন। গতকাল বিকেলে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে এ সভার আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এতে বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে কুড়িগ্রাম জেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার মতামত নেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা। এর আগে সকালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদ পরিবারের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা। পরে বিভন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনে কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন তারা।
সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের পক্ষে নন তৌফিক সিয়াম : কিশোরগঞ্জে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তৌফিক সিয়াম। তিনি বলেন, ‘যারা নির্বাচন দিতে তাগিদ দিচ্ছেন, তারা ১৬ বছর কোথায় ছিলেন? সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আপনারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় দিন। আমরা আর স্বৈরাচার সরকারের মতো রাতের ভোট চাই না। যত দিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তত দিন ভোট হবে না।’ গতকাল বিকেলে জেলা শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে এ মতবিনিময় সভা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট এবং সংশ্লিষ্ট জেলা অঞ্চলের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি।
